হামিংবার্ড নাকি প্যারাশুট

অলংকরণ করেছেন রজত
কোটি কোটি বছর আগে আকাশে চক্কর দিয়ে বেড়াত অতি ক্ষুদ্র এক প্রজাতির ডাইনোসর। নাম ছিল ‘মাইক্রোর্যাপ্টর’ বা ‘পুঁচকে শিকারি’। ওদের কথা লিখেছেন অলকানন্দা রায়
অনেক অনেক দিন আগের কথা। তখন পৃথিবীটা আজকের মতো ছিল না। বড় বড় সব ডাইনোসর দাপিয়ে বেড়াত চারদিকে। কেউ পাহাড়ে, কেউ পানিতে, কেউ আবার বিশাল খোলা মাঠে। আমি অবশ্য অত বড় ছিলাম না। আমার নাম মাইক্রোর্যাপ্টর। তোমরা চাইলে আমাকে চিক্কু নামেও ডাকতে পারো।
ভাবছ, ‘বাব্বা! কী ভারী নাম রে!’ নামটা ভারী হলে কী হবে, আমি বেশ হালকাপাতলা ছিলাম। আর একদম ছোট্ট। কত ছোট, জানো? তোমাদের বাড়ির আদুরে বিড়ালটার মতোই ছোট! লম্বায় মাত্র এক ফুট। তার মানে, তোমার পড়ার টেবিলের চেয়েও ছোট! আর ওজন? মাত্র দুই পাউন্ড। মানে এক কেজির চেয়েও কম। বলতে পারো, তোমার পানির বোতলের চেয়েও হালকা! তাহলে এবার বলো তো, চিক্কু নামটি আমার সঙ্গে মানিয়েছে কি না?
আমার কিন্তু ছিল বড় বড় দুই পায়ের বদলে চার-চারটি পা। প্রতিটি পায়ে সুচালো নখ। সেই নখের ভেলকিতে বড় বড় গাছের ডালে তরতর করে উঠে যেতে পারতাম।
একদিন দুপুরবেলা আমার খুব খিদে পেয়েছিল। আমি বসে ছিলাম এক মস্ত বড় গাছের একেবারে মগডালে। পেটটা গুড়গুড় করছিল। চারদিকে তাকালাম। একটু দূরেই দেখতে পেলাম, সুন্দর একটি পোকা ভনভন করে উড়ছে। লোভে আমার চোখ দুটো চকচক করে উঠল। কিন্তু পোকাটা তো অন্য গাছের ডালে। ওখানে যাব কী করে? আমার তো আর পাখিদের মতো বড় বড় ডানা ছিল না। কিন্তু বুদ্ধি ছিল ভরপুর। আর ছিল এক গোপন জাদুর ডানা! জানো তো, আমার শুধু হাতেই নয়, পা দুটিতেও ছিল পালকযুক্ত ছোট ছোট ডানা। এক্কেবারে ওড়ার সুপারস্টার যাকে বলে!
আমি গাছের মগডাল থেকে দিলাম এক মস্ত বড় লাফ।
‘আআআআআআ....!’ মুহূর্তেই মনে হলো, এই বুঝি ধপাস করে পড়ে যাব নিচে। কিন্তু না, সময়মতো চার-চারটি ডানা মেলে দিলাম। আর অমনি জাদু! বাতাস ভেসে ভেসে, ঝাঁপ দিয়ে নিচের দিকে নামতে থাকলাম। মোটেই পড়ে গেলাম না। তোমরা যেটিকে প্যারাশুট বলো, আমার সেই ঝাঁপ দিয়ে উড়তে থাকা ছিল প্যারাশুটের মতো করেই। তাই আমাকে পৃথিবীর শুরুর দিকের প্যারাশুট ডাইনোসর নামে ডাকতেই পারো।
আমি পোকাটার দিকে এগোতে থাকলাম। বোকা ওই পোকা কিছু বোঝার আগেই, আমার ছোট ছোট দাঁত দিয়ে খপ করে ধরে ফেললাম ওকে। তারপর? তারপর আমার ডানাগুলোকে কাজে লাগিয়ে, দিক পরিবর্তন করে, একেবারে সাবলীলভাবে নিচের আরেকটি গাছের ডালে গিয়ে বসলাম। আর কুড়মুড় করে খেয়ে ফেললাম পোকাটাকে। ওই পোকার জন্য তোমাদের খুব মায়া হচ্ছে? আমারও মায়া হয়েছিল, মনও খারাপ হয়েছিল একটু। কিন্তু কী করব, বলো? পোকামাকড়ই যে ছিল আমার খাবার।
আমি দেখতে কেমন ছিলাম, জানো? খুব সুন্দর! আমাদের গায়ের রঙ ছিল উজ্জ্বল কালো; অনেকটা আজকালকার কাকের মতো। কিন্তু পালকের ওপর যখন সূর্যের আলো পড়ত, তখন তা চিকচিক করত। মনে হতো আমার গায়ে যেন নীল-সবুজ রঙের জাদু ছড়িয়ে আছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, আমার লেজটা ছিল শরীরের প্রায় অর্ধেকের সমান লম্বা। লেজের শেষে পালকের একটি সুন্দর পাখা, যা ওড়ার সময় বাতাসে দিক বদলাতে সাহায্য করত। বলতে পারো, আমরা ছিলাম আশ্চর্য সুন্দর এক গ্লাইডার।
বিজ্ঞানীরা বলেন, সেই যে মস্ত বড় গ্রহাণু এসে পৃথিবীর সব বড় বড় ডাইনোসরকে নিয়ে গেল, আমার পরিবারও সেদিন পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমরা পুরোপুরি হারিয়ে যাইনি। আমার দূর সম্পর্কের মামাতো ভাইয়েরা এখনো তোমাদের সঙ্গে আছে। জানো তারা কারা? চারপাশের সব রঙিন পাখি! টিয়া, ময়ূর, হামিংবার্ড— এরা কিন্তু আমাদেরই আত্মীয়।



