নিদারাবাদ হত্যারহস্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার হরষপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম নিদারাবাদ। বাংলাদেশের অপরাধ ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর গল্প লুকিয়ে রয়েছে এই নামের ভেতরে। লিখেছেন ইশতিয়াক হাসান
আব্বুর চাকরি সূত্রে তখন থাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। নানাবাড়ি হবিগঞ্জের মাধবপুরে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তঘেঁষা এলাকা মাধবপুর। যেতে হতো কখনো ট্রেনে, কখনো বর্ষায় ফুলে ওঠা জলপথে নৌকায়। বর্ষাকালে তিতাসের ঘাট থেকে নৌকা ছাড়ত সরাসরি। ১৯৮৯ সালের কথা। বড় খালা মারা গেছেন। আব্বুর ছাত্ররা আমাদের নৌকায় তুলে দিলেন। বয়স খুব কম, তবু সে যাত্রার কিছু ছবি আজও কুয়াশার মতো ভাসে মাথায়। চারদিকে থইথই জল। মাঝেমধ্যে শুশুক হঠাৎ পানি ভেদ করে লাফিয়ে উঠছে।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি মনে গেঁথে রয়েছে এক ভয়ংকর মুহূর্ত। নৌকা থেকে নামার পর কিংবা যাত্রার শেষ দিকের একটি ঘটনা। নৌকার মাঝি হঠাৎ বৈঠা থামিয়ে বিলের মাঝখানে আঙুল তুলে বলেছিলেন, ‘এই জায়গায় ড্রামে লাশ পাইছিল...।’
তারপর একটু থেমে আরও নিচু গলায় বলেছিলেন, ‘টুকরো টুকরো করা ছিল ছয়টা লাশ।’
সেই বিলের নাম ধুপাজুড়ি। আর সেই গ্রামের নাম, নিদারাবাদ।
১৯৮৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। বিকালের আলো তখন ফিকে হয়ে আসছে। নিদারাবাদ গ্রামের স্কুলশিক্ষক আবুল মোবারক প্রতিদিনের মতো নৌকায় বাড়ি ফিরছিলেন। ধুপাজুড়ি বিল পেরোনোর সময় হঠাৎ খেয়াল করলেন, পানির ওপর তেলতেলে কিছু ভাসছে। সঙ্গে উৎকট দুর্গন্ধ। তিনি মাঝিকে নৌকা একটু ঘুরিয়ে নিতে বললেন।
ঠিক তখনই নৌকার নিচে শক্ত কিছুর সঙ্গে ধাক্কা লাগে। মাঝির বৈঠায় খটখট শব্দ হয়। বৈঠা দিয়ে পানির নিচে খোঁচা দিতেই ধীরে ধীরে ভেসে উঠল একটি ড্রাম। ড্রামের মুখ শক্ত করে আটকানো। চারদিকে পচা গন্ধ। বহু মানুষ জড়ো হলো বিলের পাড়ে।
একপর্যায়ে ড্রামের মুখ খোলা হলো। মুহূর্তেই চারপাশ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। ড্রামের ভেতরে মানুষের লাশ। একটি নয়, তিনটি। শুরু হলো আরও খোঁজ। কিছু দূরে পাওয়া গেল আরেকটি ড্রাম। সেখানেও টুকরো টুকরো তিনটি দেহ। মোট ছয়টি লাশ। শনাক্ত হতে বেশি সময় লাগেনি। ওগুলো ছিল নিদারাবাদ গ্রামের শশাঙ্ক দেবনাথের স্ত্রী বিরজাবালা এবং তার পাঁচ সন্তানের দেহাবশেষ।
বিরজাবালা দেবনাথ, মেয়ে নিয়তি বালা, প্রণতি বালা, ছেলে সুভাষ দেবনাথ, পাঁচ বছরের সুপ্রসন্ন দেবনাথ সুমন এবং মাত্র দুই বছরের সুজন দেবনাথ। প্রতিটি দেহ কয়েক টুকরো করা ছিল।
রহস্যের শুরু আসলে আরও দুই বছর আগে। ১৯৮৭ সালের ১৬ অক্টোবর। কুয়াশাভেজা ভোর। মুড়ির মোয়া বিক্রি করে সংসার চালানো শশাঙ্ক দেবনাথকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় পাশের পাঁচগাঁও গ্রামের কসাই তাজুল ইসলাম। শশাঙ্ককে বলা হয়েছিল, সীমান্তের ওপারে আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করাতে নিয়ে যাওয়া হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবেন; কিন্তু আর ফেরেননি তিনি। দিন যায়, মাস যায়, শশাঙ্কের খোঁজ মেলে না। তার স্ত্রী বিরজাবালা থানায় অপহরণের মামলা করেন। সন্দেহের তালিকায় ছিল তাজুল ইসলামের নামও। কারণ, শশাঙ্কের সামান্য জমিজমার ওপর অনেক দিন ধরেই নজর ছিল তার। এদিকে তাজুল ধীরে ধীরে শশাঙ্কের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়। এমনকি বিরজাবালা তাকে ‘ধর্মবাবা’ বলেও ডাকতেন। সে সুযোগে পরিবারের জমিজমার সব জেনে নেন তিনি। পরে জাল কাগজ তৈরি করে সম্পত্তি দখলের পরিকল্পনা শুরু করেন।
তার ভাষ্যমতে, শশাঙ্ককে প্রথমে মাধবপুরের নিজনগর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গভীর রাতে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর লাশ সীমান্তের কাছাকাছি একটি পরিত্যক্ত কূপে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় মামলা। বিরজাবালা মামলা তুলে নেননি। বরং আদালতে ধীরে ধীরে তাজুলদের বিরুদ্ধে প্রমাণ শক্ত হতে থাকে। তখন তাজুল বুঝে যান, শুধু শশাঙ্ককে মেরে লাভ হয়নি। পুরো পরিবার বেঁচে থাকলে একদিন না একদিন সব বেরিয়ে আসবে। সিদ্ধান্ত নেন, পুরো পরিবারকে শেষ করে দেওয়ার।
১৯৮৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাত। নিদারাবাদ গ্রাম তখন গভীর ঘুমে। ঠিক তখনই নৌকায় করে আসে ৩০-৪০ জনের একদল সশস্ত্র লোক। নেতৃত্বে তাজুল ইসলাম। তাদের হাতে ছিল রামদা, বল্লম, লাঠি, টর্চলাইট। সঙ্গে আনা হয়েছিল দুটি বড় ড্রাম, চুন আর লবণ। জানালার লোহার রড ভেঙে তারা ঢুকে পড়ে শশাঙ্কের বাড়িতে। ঘুমন্ত বিরজাবালা ও শিশুদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা হয়। তারপর বিরজাবালা ও পাঁচ সন্তানকে তুলে নেওয়া হয় নৌকায়।
পরে আদালতে জবানবন্দিতে তাজুল স্বীকার করেছিলেন, বিলের মাঝখানে নৌকা থামিয়ে একে একে হত্যা করা হয় সবাইকে। রামদার কোপে দেহ টুকরো করা হয়। এরপর খণ্ডিত দেহগুলো ড্রামে ভরে চুন ও লবণ ঢেলে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। পরে রক্তমাখা নৌকাও ধুয়ে ফেলা হয়।
সবশেষে শুরু হয় আরেক নাটক। গ্রামে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, বিরজাবালা সন্তানদের নিয়ে ভারতে চলে গেছেন।
লাশ উদ্ধারের পর পুরো এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়। ঘটনাস্থলে ভিড় দেখতে এসেছিলেন তাজুলের বোনজামাই হাবিবুর রহমানও। তার আচরণে সন্দেহ হলে গ্রামবাসী তাকে ধরে ফেলে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে ভয়ংকর সত্য। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থানায় করা হয় মামলা। পুলিশ তদন্ত শেষে ৩৮ জনকে অভিযুক্ত করে দেয় চার্জশিট।
১৯৯০ সালের জুনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জজ আদালত ৯ জনের ফাঁসি, ২৭ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২ জনকে খালাস দেন। পরে উচ্চ আদালত মূল হোতা তাজুল ইসলাম ও বাদশা মিয়ার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। আরও কয়েকজনের যাবজ্জীবন সাজা বহাল থাকে।
১৯৯৩ সালের ১১ আগস্ট রাত ২টা ১ মিনিটে কুমিল্লা কারাগারে তাজুল ও বাদশার ফাঁসি কার্যকর হয়।




