জিলিয়ানের মানবসেবার পাঁচ যুগ

হাসপাতালে জিলিয়ান মার্গারেট রোজ। ছবি: আগামীর সময়
প্রায় পাঁচ যুগ ধরে মেহেরপুরবাসীকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন ব্রিটেনের নাগরিক জিলিয়ান মার্গারেট রোজ। জেলার মানুষের মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ এই নার্স। মানুষকে সেবা দিয়ে মন কেড়েছেন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ৮০ বছরের কুমারী জিলিয়ান জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাতে চান মানুষের সেবায়, হতে চান বাংলাদেশের নাগরিক, সমাহিত হতে চান মেহেরপুরের মাটিতে।
১৯৩৯ সালে দক্ষিণ ইংল্যান্ডে জন্ম নেন জিলিয়ান। ছোটবেলায় বাবাকে হারান। খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য ১৯৬৪ সালে আসেন বরিশালে। কয়েক বছর পর ফিরে গেলেও বাংলাদেশের মানুষের টানে ১৯৭৪ সালে আবার ফিরে আসেন।
ব্রিটেনে নার্স হিসেবে শিক্ষা গ্রহণ করে প্রথমে খুলনা এবং পরে মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার বল্লভপুর গ্রামে চার্চ অব বাংলাদেশ পরিচালিত মিশন হাসপাতালে যোগ দেন। হাসপাতাল থেকে কোনো বেতন নেননি তিনি। বাংলাদেশের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা। বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারায় বেশ খুশি জিলিয়ান। যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন বাংলাদেশের মানুষকে তিনি সেবা দিয়ে যেতে চান।
জিলিয়ান নিজ উদ্যোগে হাসপাতালের পাশে গড়ে তুলেছেন একটি বৃদ্ধাশ্রম। হাসপাতাল চত্বরে প্রতিষ্ঠা করেছেন নার্সিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। জীবনযাপন একেবারে সাদাসিধে। বিভিন্ন দাতা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে যে অর্থ পান, তা ব্যয় করেন এই হাসপাতালের রোগীদের সেবায়। এ ছাড়া ব্রিটেনের সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া ভাতার টাকাও তাদের পেছনে ব্যয় করেন।
জিলিয়ান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘২০১৭ সালে পরিবার ও স্বজনদের চাপাচাপিতে দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য মনস্থির করেছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশের প্রকৃতি, মানুষ ও মাটির ভালোবাসায় ফিরে যেতে মন চায়নি।’
তিনি আরও জানালেন, সরকার যদি তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়, তাহলে তার সম্মান বাড়বে। যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন এভাবে সেবা দিয়ে যাবেন। রোজের ভাষায়, ‘পৃথিবীতে এসেছি সেবা দিতে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য কেউ কিছু করে না। তাই আমি একটি বৃদ্ধাশ্রম খুলেছি। এখানে অন্তত ১৫ জন বৃদ্ধ আছেন।’
‘আমি ১৯৬৪ সালে এ দেশে আসি। পরে মালয়েশিয়ায় চলে যাই। সেখান থেকে আবার ব্রিটেনে ফিরে যাই। ১৯৭৪ সালে মানুষকে সেবা দিতে চলে আসি খুলনায়। খুলনার গ্রামাঞ্চলে বেশ কয়েক বছর সেবা দিয়ে ১৯৮১ সালে বল্লভপুর মিশন হাসপাতালে যোগ দিই’— বলছিলেন জিলিয়ান।
‘কোনো কোনো মানুষের মধ্যে মানবিক গুণাবলি নেই। তাদের মধ্যে মানবিক গুণাবলি গড়তে সহায়তা করি। মানবিক গুণাবলির অধিকারী হতে পারলেই মানুষ হওয়া যায়’— যোগ করেন তিনি।
বল্লভপুর মিশন হাসপাতালের সিনিয়র নার্স নীলসুরি সরিন জানালেন, রাত-দিন তিনি মানুষকে সেবা দেন। নিজের জন্য কিছু করেন না। কোনো অহংকার নেই। সাদাসিধে পোশাক পরেন, নিরামিষ খান। তার কাছ থেকে মানুষ হয়ে ওঠার গুণাবলি কিছুটা অর্জন করতে পেরেছি। তার দীর্ঘায়ু কামনা করি।’
জিলিয়ান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে ২০১৮ সালে আবেদন করেছেন।
মুজিবনগর উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বাবুল মল্লিক জানালেন, সেবা দিয়ে তিনি জেলার মানুষের মন জয় করেছেন। জেলার মানুষও তাকে আপন করে হৃদয়ে জায়গা দিয়েছেন।
মেহেরপুর জেলা প্রেস ক্লাব সভাপতি তোজাম্মেল আযম মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষকে সেবিকা হিসেবে জীবন উৎসর্গকারী জিলিয়ানকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিয়ে সম্মানিত করা উচিত।
মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী আগামীর সময়কে জানালেন, বাংলাদেশকে যে মানুষটি এত ভালোবেসেছেন, নিশ্চয়ই বাংলাদেশও তাকে ভালোবাসবে। আমরাও তাকে ভালোবাসি, বাংলাদেশের মানুষ মনে করি। জিলিয়ানের কাজে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়। তার নাগরিকত্বের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।




