পুলিশের ডায়েরি
লেগুনা হেলপারের ছদ্মবেশে
- ফ্লাইওভারের ওপর পড়ে ছিল একটি মৃতদেহ। এটা ছিল একটি হত্যাকাণ্ড। আর এক পুলিশ সদস্যের অসাধারণ দক্ষতায় ভেদ হয় রহস্য।

আঁকা : সোহানুর রহমান
জানুয়ারির এক কনকনে শীতের সকাল। কুয়াশার হালকা চাদরে মুড়ি দিয়ে আছে ঢাকা শহর। ঠিক সেই মুহূর্তে ঢাকার বুক চিরে একটা মর্মান্তিক সংবাদের জন্ম হলো— যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তার ঠিক মাথার ওপর, ফ্লাইওভারের নির্জন পিচঢালা রাস্তায় পড়ে আছে একটা লাশ।
ধীরে ধীরে উৎসুক মানুষের ভিড় জমতে শুরু করল। খবরের সূত্র ধরে দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায় যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। পুলিশি প্রক্রিয়া মেনে লাশটি সুরতহাল শেষে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে। শুরুতে সবাই ভেবেই নিয়েছিল— শীতের সকালে অসচেতনভাবে রাস্তা পার হতে গিয়ে হয়তো কোনো দ্রুতগামী গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছেন এই পথচারী।
কিন্তু সব হিসাব বদলে গেল ২৪ ঘণ্টা পর।
২২ জানুয়ারি ২০২২, সকাল পৌনে ৬টায় যে লাশের দেখা মিলেছিল, তার বিচার চেয়ে পরদিনই থানায় উপস্থিত হন নিহত ব্যক্তির ছেলে। বাবার আকস্মিক এবং রহস্যজনক মৃত্যুকে সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে মানতে নারাজ তিনি। যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা হলো একটি হত্যা মামলা। তদন্তের ভার পড়ল যাত্রাবাড়ী থানার এসআই বিলাল আল আজাদের ওপর।
ঘটনার ক্লু বলতে তখন পুলিশের হাতে শুধু একটি জিনিস—ফ্লাইওভারের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ। তদন্ত কর্মকর্তা বিলাল আল আজাদ পুলিশের টিম নিয়ে বসে গেলেন মনিটরের সামনে। গভীর রাতের আবছা আলো আর সিসিটিভির অস্পষ্ট লেন্সের কারণে কোনো গাড়ির নম্বর প্লেটই ঠিকমতো পড়া যাচ্ছিল না। তখনই এক ফ্রেমের এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে এসআই বিলালের তীক্ষ্ণ চোখ আটকে গেল।
একটি চলন্ত লেগুনা। অন্ধকার চিরে দ্রুতগতিতে পার হয়ে যাচ্ছে ফ্লাইওভারের ওই সুনির্দিষ্ট অংশটি। গাড়ির নম্বর বা ভেতরের মানুষের চেহারা বোঝার কোনো উপায় নেই। তবে লেগুনাটির পেছনে একটি অদ্ভুত এবং ক্ষুদ্র বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ল। যাত্রী ওঠার সিঁড়ি বা পাদানিটিতে জ্বলজ্বল করছে গাঢ় লাল রঙের আলো বা পটি।
এই সুবিশাল শহরের যান্ত্রিক জটলা আর হাজারো লেগুনার ভিড়ে ওই একটি নির্দিষ্ট ‘লাল রঙের পাদানি’ওয়ালা লেগুনা খুঁজে বের করা যেন খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার চেয়েও কঠিন। কিন্তু ক্লু তো এটাই!
এসআই বিলাল আল আজাদ এক মারাত্মক ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন। নিজের নাম, পোশাক এবং অফিসিয়াল পরিচয় একপাশে সরিয়ে রেখে লেগুনা হেলপারের ছদ্মবেশ ধারণ করবেন। গায়ে ময়লা, ধুলোমাখা শার্ট আর ট্রাউজার চাপিয়ে বিলাল নেমে পড়লেন ঢাকার রাস্তায়। টানা চার দিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টি-ধুলো গায়ে মেখে, দিন-রাত এক করে এক স্টপ থেকে আরেক স্টপে ঘুরতে লাগলেন ছদ্মবেশী বিলাল। যাত্রাবাড়ী থেকে চিটাগং রোড, কখনো পোস্তগোলা, কখনো নিউ মার্কেট, আবার কখনো শহরের সীমানা ছাড়িয়ে নারায়ণগঞ্জ। বিলালের চোখ শুধুই খুঁজে চলে অন্যান্য লেগুনার পেছনটা— কোথায় সেই লাল পাদানি?
৩০০টির বেশি লেগুনা তল্লাশি করেও সেই কাঙ্ক্ষিত লাল পাদানির লেগুনাটির কোনো হদিস মিলছিল না। তখনই তার প্রখর পুলিশি মস্তিষ্ক অন্যভাবে চিন্তা করতে শুরু করল। একটা গাড়ি দিয়ে যদি এত বড় হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে, তবে অপরাধীরা কি সেটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবে রাস্তায় যাত্রী তুলবে?
এবার বিভিন্ন স্ট্যান্ডে ঘুরে ঘুরে অলসভাবে বসে থাকা গাড়ি খুঁজতে থাকলেন। এক ড্রাইভারের সঙ্গে আলাপকালে হঠাৎই মিলল এক অমূল্য তথ্য। কদমতলীর ভুলুর গ্যারেজে নাকি একটা লেগুনা নষ্ট হয়ে পড়ে আছে কয়েক দিন ধরে, আর তার চালকও নাকি অসুস্থ হয়ে গ্রামে চলে গেছে!
খবরটি পাওয়ামাত্র কালবিলম্ব না করে কদমতলীর ভুলুর গ্যারেজে পৌঁছালেন। গ্যারেজের আবছা অন্ধকারে, ধুলোর আস্তরণ জমে থাকা একটি লেগুনার দিকে এগোতেই ছদ্মবেশী পুলিশের চোখ জোড়া আনন্দে চকচক করে উঠল। গাড়িটির পেছনে সগর্বে শোভা পাচ্ছে সেই লাল রঙের পাদানি!
২৪ জানুয়ারি ২০২২। লাল পাদানির লেগুনার চালক ফরহাদের সন্ধানে পুলিশ ছুটল মাদারীপুরের এক অজপাড়াগাঁয়ে। কিন্তু সেখানে গিয়ে আবারও এক ধাক্কা! ফরহাদকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং কল ডিটেইলস (CDR) বিশ্লেষণ করে পুলিশ নিশ্চিত হলো— ঘটনার আগের দিন, অর্থাৎ ২১ জানুয়ারি ফরহাদ গাড়িটি ঢাকায় রেখে গ্রামে চলে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ, হত্যাকাণ্ডের সময় অন্য কেউ ছিল ওই লেগুনার স্টিয়ারিংয়ে।
বিলাল আবারও ফিরে এলেন কদমতলীর ভুলুর গ্যারেজে, সেই পুরনো হেলপারের ছদ্মবেশে। গ্যারেজের লোকজনের সঙ্গে মিশে গিয়ে বের করে আনলেন আসল কালপ্রিটদের নাম। ২২ জানুয়ারি রাতে গাড়িটি চালিয়েছিল মঞ্জুর নামের এক ড্রাইভার আর হেলপার হিসেবে ছিল আবদুর রহমান। বিলাল আল আজাদ এবার তার সহকর্মীদের নিয়ে পুরো ঢাকা জুড়ে এক অদৃশ্য জাল বিছালেন। এক পর্যায়ে খবর এলো, হেলপার রহমান এখন বাসের হেলপারি করা শুরু করেছে। খুব সতর্কতার সঙ্গে অভিযান চালিয়ে রহমানকে আটক করল পুলিশ। কঠোর নজরে রেখে তাকে দিয়েই চষে ফেলা হতে লাগল ঢাকার বিভিন্ন বাস ও লেগুনাস্ট্যান্ড। অবশেষে সাইনবোর্ড বাসস্ট্যান্ডের কোলাহলের মধ্যে কাকতালীয়ভাবেই চোখ পড়ে মঞ্জুর ড্রাইভারের ওপরে। আটক হয় মঞ্জুর। মঞ্জুর আর রহমানকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করতেই বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। তাদের দেওয়া স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় জড়িত আরও দুই সহযোগী রিপন আর রুবেলকে।
২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ চার দিন ধরে চলা এক চরম উত্তেজনাকর ছদ্মবেশী অপারেশনের সফল সমাপ্তি ঘটে।
চার আসামিকে মুখোমুখি দাঁড় করাতেই উন্মোচিত হলো সেই কুখ্যাত রাতের নির্মম সত্য। ফ্লাইওভারের ওপর পাওয়া অচেনা লাশটি আসলে ছিল মহির উদ্দিন নামের এক সাধারণ মাছ বিক্রেতার।
ঘটনার রাতে সাদ্দাম মার্কেট এলাকা থেকে মাছ কেনার টাকা নিয়ে লেগুনায় উঠেছিলেন মহির। চলন্ত লেগুনায় তার গতিবিধি দেখে লোভ সামলাতে পারেনি চালক মঞ্জুর, হেলপার রহমান এবং তাদের দুই সহযোগী রিপন ও রুবেল। তারা ধরে নিয়েছিল, মাছ ব্যবসায়ী মহিরের কাছে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা আছে। যাত্রীবাহী লেগুনাটি যখন ফ্লাইওভারের নির্জন অংশে ওঠে, তখন তারা সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে মহিরের ওপর। মহির প্রাণপণে চিৎকার ও বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু টাকার লোভে অন্ধ চার ঘাতক তাকে মারধর করে এবং চলন্ত লেগুনা থেকে সজোরে নিচে ছুড়ে ফেলে দেয়। ফ্লাইওভারের শক্ত পিচে মাথা থেঁতলে গিয়ে মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় একটি নিরপরাধ জীবন।
এত বড় একটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে, একটি নিরীহ পরিবারকে ধ্বংস করে তারা মহিরের পকেট থেকে পেয়েছিল মাত্র ৫ হাজার ৯০০ টাকা!
আসামিদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে আদালতে পূর্ণাঙ্গ চার্জশিট দাখিল করে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। বর্তমানে ঘাতকদের বিচারকাজ চলছে দেশের বিজ্ঞ আদালতে।



