সম্রাজ্ঞীর মুকুট চুরির পর

ল্যুভরে হাজারো পর্যটকের উপস্থিতিতে সম্রাজ্ঞী ইউজেনির মুকুট লুট করতে হানা দেয় চোরেরা। লিখেছেন আখলাকুজ্জামান অনিক
ল্যুভর জাদুঘরের ‘গ্যালারি অব অ্যাপোলো’ মূলত ফরাসি রাজপরিবারের শত শত বছরের রাজকীয় অলংকারের ভাণ্ডার। জাঁকজমকপূর্ণ এ কক্ষেই জ্বলজ্বল করছিল সম্রাজ্ঞী ইউজেনির ঐতিহাসিক মুকুট। ১৮৫৫ সালের প্যারিস ওয়ার্ল্ড এক্সপো উপলক্ষে ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন প্রিয়তমা স্ত্রীর জন্য ভালোবাসার স্মারক হিসেবে এটি তৈরি করিয়েছিলেন। ১ হাজার ৩৫৪টি নিখুঁত হীরা, ৫৬টি বিরল পান্না এবং ৮টি খাঁটি সোনার ঈগল পাখি দিয়ে অলংকৃত মুকুটটি ছিল ফরাসি রত্নশিল্পের অতুলনীয় বিস্ময়।
রবিবার সকাল সাড়ে ৯টা। অ্যাপোলো গ্যালারির নিচে এসে থামল আসবাবপত্র বহনের একটি পুরনো ট্রাক। তার ওপর বসানো যান্ত্রিক হাইড্রোলিক সিঁড়ি। নির্মাণশ্রমিকদের পোশাক আর হলুদ রঙের উজ্জ্বল হাই ভিস জ্যাকেট পরা চারজন মুখোশধারী নেমে এলো ট্রাক থেকে। নিরাপত্তারক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দুজন দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল গ্যালারির প্রথমতলার বারান্দায়। তাদের হাতে ব্যাটারিচালিত আধুনিক ইলেকট্রিক ডিস্ক কাটার। প্যানেল ও জানালার কাচ নিমেষেই গুঁড়িয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল চোরের দল।
চোরের হাত থেকে ফসকে সশব্দে নিচে আছড়ে পড়ে দুমড়ানো-মুচড়ানো সম্রাজ্ঞী ইউজেনির অমূল্য মুকুট
হাতে ভারী কাটার ও গ্রাইন্ডার দেখে নিরস্ত্র প্রহরীরা নিরাপত্তার খাতিরে সরে যেতে বাধ্য হলেন। ৯টা ৩৪ মিনিটে গ্যালারিতে প্রবেশ করে সোজা রাজকীয় অলংকার রাখা ধাতব ও বুলেটপ্রুফ গ্লাসের প্রদর্শনী বাক্সের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় মুখোশধারীরা। তাদের মূল নজর ছিল সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের স্ত্রী সম্রাজ্ঞী ইউজেনির মুকুটের দিকে। হাইস্পিড বৈদ্যুতিক গ্রাইন্ডার দিয়ে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে প্রদর্শনীর বুলেটপ্রুফ কাচে একটি সংকীর্ণ ছিদ্র তৈরি করা হয়।
এরপরই ঘটে সেই রোমহর্ষক কাণ্ড। তাড়াহুড়ো করে সরু সেই ছিদ্র দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সম্রাজ্ঞী ইউজেনির ভারী মুকুটটি টেনে বের করতে যায় চোরেরা। ধাতব ও কাচের তীব্র ঘর্ষণে দুমড়ে-মুচড়ে যায় মুকুটের রাজকীয় ফ্রেম। ১ হাজার ৩৫৪টি হীরার ঝলকানি আর পান্নার উজ্জ্বলতায় মোড়ানো মুকুটটি কোনোমতে বাইরে এনে তারা ব্যাগে পুরে।
রাজপরিবারের আরও সাতটি অত্যন্ত মূল্যবান অলংকার হাতিয়ে নিয়ে মেকানিক্যাল সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নিচে নেমে আসে চোরেরা। নিচে তৈরি রাখা ইয়ামাহা টি-ম্যাক্স স্কুটারে চড়ে চম্পট দেওয়াই ছিল পরিকল্পনা। কিন্তু নিচে নেমে স্কুটারে ওঠার তাড়াহুড়োর মুহূর্তেই ঘটে মারাত্মক দুর্ঘটনা। চোরের হাত থেকে ফসকে সশব্দে নিচে আছড়ে পড়ে দুমড়ানো-মুচড়ানো সম্রাজ্ঞী ইউজেনির অমূল্য মুকুটটি! পেছনে ততক্ষণে অ্যালার্ম বাজতে শুরু করেছে, নিরাপত্তারক্ষীদের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। নিচে পড়ে যাওয়া বিকৃত মুকুটটি আর কুড়িয়ে নেওয়ার সময় ছিল না চোরদের। কোটি ডলারের সম্পদ মাটিতে ফেলেই ঘণ্টায় ১০০ মাইলেরও বেশি গতিসম্পন্ন স্কুটারে চেপে হাওয়ায় মিলিয়ে যায় চোরচক্র। ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ ও ল্যুভর কর্তৃপক্ষের দল। অ্যাপোলো গ্যালারির ঠিক বাইরের চত্বরে পাথর ও বালুর ওপর পড়ে থাকতে দেখা যায় সম্রাজ্ঞীর ক্ষতবিক্ষত মুকুটটি। খসে পড়ার আঘাতে মুকুটের সোনার আটটি ঈগল পাখির একটি সম্পূর্ণ নিখোঁজ হয়ে গেছে এবং ফ্রেম থেকে খুলে পড়েছে ১০টি ছোট হীরা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মুকুটের আসল আকর্ষণ-সবকটি ৫৬টি পান্না এবং অধিকাংশ দামি হীরা অলৌকিকভাবে সম্পূর্ণ অক্ষত থেকে যায়!
চোরেরা কোটি ডলারের অলংকার লুট করে নিয়ে গেলেও সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের ভালোবাসার চিহ্নটি ফরাসি মাটিতেই রয়ে গেল। তবে পুলিশ দ্রুত অভিযান শুরু করে প্যারিসের বিমানবন্দর ও শহরতলি থেকে মূল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে।







