গ্রিনউইচের নকল হীরা!

এআই ছবি
বিংশ শতাব্দীর শেষ সময়ে। নতুন সহস্রাব্দকে বরণ করে নিতে তখন উৎসবের আমেজে মেতে উঠেছে গোটা বিশ্ব। লন্ডনের টেমস নদীর তীরে গ্রিনউইচের বিশাল মিলেনিয়াম ডোমও পরিণত হয়েছে মানুষের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রে। আর সেই প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ ও মূল্যবান কিছু হীরা। তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ২০৩ ক্যারেটের ‘মিলেনিয়াম স্টার’। সঙ্গে ছিল আরও বেশ কিছু বিরল নীল হীরা। সব মিলিয়ে রত্নগুলোর মূল্য ২০ থেকে ৩৫ কোটি পাউন্ড বলে বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন বিপুল সম্পদ যেখানে এক জায়গায়, সেখানে অপরাধীদের নজর পড়বে না— তা কী হয়? এই ডাকাতির পরিকল্পনা ছিল এতটাই দুঃসাহসিক যে, পরে এটি ব্রিটিশ অপরাধ ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ডাকাতির প্রচেষ্টা হয়ে ওঠে।
দিনটি ছিল ২০০০ সালের ৭ নভেম্বর সকাল। মিলেনিয়াম ডোমে তখনো দর্শনার্থীর আনাগোনা শুরু হয়নি পুরোদমে। হঠাৎ একটি বিশাল বুলডোজার বা মাটি কাটার যন্ত্র নিয়ে হাজির হয় একদল অপরাধী। মুহূর্তের মধ্যে তারা ডোমের দিকে সেটি চালিয়ে দেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল প্রদর্শনীর সুরক্ষিত অংশে ঢুকে মূল্যবান হীরাগুলো ছিনিয়ে নেওয়া।
পরিকল্পনাটিও ছিল সিনেমার দৃশ্যের মতো। অপরাধীদের কাছে ছিল ধোঁয়ার গ্রেনেড, হাতুড়ি, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত শক্তিশালী যন্ত্রপাতি, বুলেটপ্রুফ ভেস্ট এবং গ্যাস থেকে সুরক্ষার সরঞ্জাম। বুলেট প্রতিরোধী কাচ ভেঙে হীরাগুলো বের করে আনার পর দ্রুত সরে যাওয়ার কথা ছিল তাদের। পালানোর জন্য টেমস নদীতে একটি দ্রুতগতির নৌকাও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।
কিন্তু অপরাধীরা জানত না, তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর আগেই নজর রাখছিল ব্রিটিশ পুলিশ। এই ডাকাতির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অনেক আগেই পুলিশ চক্রটির গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছিল। সন্দেহভাজনদের বৈঠক, প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ— সবকিছুর ওপর নজর রাখা হচ্ছিল। ফলে ৭ নভেম্বর যখন তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী হামলা চালায়, তখন মিলেনিয়াম ডোমের আশপাশে এবং ভেতরে আগে থেকেই বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র ও ছদ্মবেশী পুলিশ প্রস্তুত ছিল।
বুলডোজার দিয়ে প্রবেশের পর অপরাধীরা যখন দ্রুত সুরক্ষিত প্রদর্শনী কক্ষের দিকে এগিয়ে যায়, তখনই পুলিশের অভিযান শুরু হয়। হীরার কাছে পৌঁছানোর আগেই তাদের ঘিরে ফেলা হয়। কোনো গুলিবিনিময় বা প্রাণহানি ছাড়াই ঘটনাস্থলে তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। টেমস নদীতে পালানোর জন্য অপেক্ষা করা নৌকাটিও পুলিশের নজর এড়াতে পারেনি। নৌকার চালককে আটক করা হয় এবং পুরো পরিকল্পনাটিই সেখানেই ভেস্তে যায়।
কিন্তু এ ঘটনার সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায় তখনো বাকি। অপরাধীরা যদি পুলিশের বাধা পেরিয়ে হীরার কাছে পৌঁছাতেও পারত, তবু তাদের হাতে আসল রত্ন উঠত না। কারণ, পুলিশ ও কর্তৃপক্ষের পূর্বপ্রস্তুতির অংশ হিসেবে আসল হীরাগুলো আগেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছিল সেগুলোর মতো দেখতে প্রায় একই রকম কৃত্রিম প্রতিরূপ। ফলে ডাকাতরা সফল হলেও তাদের ব্যাগে উঠত মূল্যবান হীরা নয়, কেবল মূল্যহীন নকল রত্ন।
অর্থাৎ অপরাধীরা ভেবেছিল, তারা পুলিশকে চমকে দিয়ে পৃথিবীর অন্যতম মূল্যবান রত্ন লুট করতে যাচ্ছে; অন্যদিকে পুলিশ আগে থেকেই তাদের অপেক্ষায় ছিল এবং যে সম্পদের জন্য এত আয়োজন, সেটিও এরই মধ্যে সরিয়ে রাখা হয়েছিল।
পরবর্তী বিচারে এই ডাকাতির পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িতদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রেমন্ড বেটসন ও উইলিয়াম ককরাম প্রথমে ১৮ বছর করে কারাদণ্ড পেয়েছিলেন। রবার্ট অ্যাডামস ও আলডো চিয়ারোক্কি পেয়েছিলেন যথাক্রমে ১৫ ও ১৫ বছরের সাজা, আর নৌকার চালক কেভিন মেরেডিথের সাজা হয়েছিল পাঁচ বছর। পরে আপিলের মাধ্যমে কয়েকজনের সাজা কমানো হয়।
এ ঘটনার সবচেয়ে বড় আইরনি ছিল, মিলেনিয়াম স্টারের ঝলক অপরাধীদের জন্য ছিল কেবল এক মরীচিকা। আর এ কারণেই গ্রিনউইচের সেই ব্যর্থ ডাকাতির চেষ্টা আজও ব্রিটিশ অপরাধ ইতিহাসের এক নাটকীয় অধ্যায় হয়ে আছে।



