সেই ঐশী

আঁকা : ফারজিন
ঢাকার চামেলীবাগের বাসায় মা-বাবাকে খুন করেছিলেন ঐশী। এক যুগের বেশি সময় আগের এ ঘটনা আলোড়ন তুলেছিল দেশ জুড়ে। লিখেছেন জেমাম আহমেদ
২০১৩ সালের আগস্ট মাসের এক রাত। ঢাকার চামেলীবাগের ফ্ল্যাটের বন্ধ দরজার ওপারে জমে উঠেছিল নিস্তব্ধ এক ভয়াল অন্ধকার। পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান সম্ভবত ভাবতেও পারেননি, যে সন্তানকে বুকের ভেতর নানা স্বপ্ন দিয়ে আঁকড়ে ধরে বড় করেছিলেন, সেই সন্তানের হাত ধরেই নেমে আসবে তাদের জীবনের শেষ রাত।
১৭ আগস্ট শনিবার দুপুরে পল্টন থানায় এক তরুণী হাজির হলো। তার চুলগুলো উসকোখুসকো, পরনে নোংরা কাপড়, দৃষ্টিতে শূন্যতা। সেই তরুণীর নাম ঐশী রহমান। মা-বাবাকে খুন করার কথা স্বীকার করে যখন সে পুলিশের সামনে দাঁড়াল, তখন গোটা থানায় নেমে এসেছিল পিনপতন নীরবতা।
ঐশীর এই গল্পটিকে শুধু একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড বললে ভুল হবে; একই সঙ্গে পরিবারের অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়, বিষাক্ত সঙ্গ এবং একটি সম্ভাবনাময় জীবনের করুণ পতনের দলিল এটি। চামেলীবাগের সেই ফ্ল্যাটের পরিবেশ বাইরের মানুষের কাছে হয়তো বেশ গোছানো ও সুখী মনে হতো। বাবা পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে সংসারে প্রাচুর্য কিংবা সুরক্ষার কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু বাহ্যিক এই চকচকে আবরণের নিচে যে গভীর এক অন্ধকার তৈরি হচ্ছিল।
ছোটবেলা থেকেই ঐশী বেড়ে উঠেছিল চার দেয়ালের এক নীরব একাকিত্ব ও স্বাধীনতার অদ্ভুত এক মিশ্রণে। মা-বাবার স্নেহের কমতি না থাকলেও কর্মব্যস্ত বাবার সময় না পাওয়া এবং আধুনিক শহুরে জীবনের দূরত্ব তাদের মধ্যে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেছিল। ও-লেভেলের শিক্ষার্থী ঐশী একসময় পড়ালেখার স্বাভাবিক পথ ছেড়ে জড়িয়ে পড়ে এক বিপথগামী বন্ধুচক্রের সঙ্গে। ক্লাবের আলো-ঝলমলে পরিবেশ, অতিরিক্ত রাত জাগা আর ধীরে ধীরে মাদকের বিষাক্ত ছোঁয়া তার জীবনে প্রবেশ করে। ইয়াবা, অ্যালকোহল, গাঁজাসহ নানা ধরনের নেশায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। অভিভাবক হিসেবে মা-বাবা যখন বিষয়টি টের পেলেন এবং তার ওপর কড়াকড়ি আরোপের চেষ্টা করলেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ঘরের বাইরে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, পকেট মানি বন্ধ করা বা মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার মতো পদক্ষেপ ঐশীর বিভ্রান্ত মনকে আরও বেশি বিদ্রোহী করে তোলে। মাদকের তীব্র আসক্তি তার ভেতরের স্বাভাবিক বিচার-বুদ্ধি, আবেগ ও নৈতিক বোধকে একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছিল।
কফি খেয়ে যখন মাহফুজুর রহমান ও স্বপ্না রহমান গভীর ঘুমে তলিয়ে যান, তখন ঐশীর মাথায় ভর করে এক চরম নৃশংসতা
ঘটনার দিন, অর্থাৎ ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট রাত। বাজার থেকে কেনা ঘুমের ওষুধ কফির সঙ্গে মিশিয়ে মা-বাবাকে পান করায় ঐশী। কফি খেয়ে যখন মাহফুজুর রহমান ও স্বপ্না রহমান গভীর ঘুমে তলিয়ে যান, তখন ঐশীর মাথায় ভর করে এক চরম নৃশংসতা। নিজের ঘরে শুয়ে থাকা অচেতন বাবাকে সে একের পর এক ছুরিকাঘাত করতে থাকে। এরপর পাশের ঘরে গিয়ে একইভাবে আঘাত হানে জন্মদাত্রী মায়ের ওপরেও। যে হাতগুলো ছোটবেলায় তাকে পরম মমতায় কোলে তুলে নিয়েছিল, সেই মা-বাবার শরীর থেকে রক্ত ঝরে পড়ে চামেলীবাগের ফ্ল্যাটের মেঝেতে। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর ঐশী তার ছোট ভাই ঐকীকে অন্য ঘরে আটকে রাখে। পরদিন ১৫ আগস্ট সকালে সে তার ছোট ভাই ও গৃহকর্মী সুমিকে নিয়ে টাকা, গয়না ও মালামাল ব্যাগে ভরে ফ্ল্যাটে তালা দিয়ে বেরিয়ে যায়।
পরদিন ১৬ আগস্ট মাহফুজুর রহমানের ভাই শাহীন রহমান বহু চেষ্টা করেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে ফ্ল্যাটে আসেন। তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকতেই ঘরের মেঝেতে রক্তের দাগ এবং বাথরুম থেকে মাহফুজুর রহমান ও স্বপ্না রহমানের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ যখন ঘটনার তদন্তে নেমে ঐশীর খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছিল, ঠিক তখনই ১৭ আগস্ট দুপুরে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঐশী নিজে গিয়ে পল্টন থানায় আত্মসমর্পণ করে। ঘটনার পরপরই ঐশীর বন্ধু জনি, রনি ও গৃহকর্মী সুমিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
পুলিশ যখন ঐশীর খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছিল, ঠিক তখনই সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে পল্টন থানায় আত্মসমর্পণ করে
এই হত্যাকাণ্ড পুরো বাংলাদেশের আইনি ও সামাজিক ব্যবস্থায় এক নতুন ঝড়ের জন্ম দেয়। শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩ এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। বিচারক ঐশী রহমানকে জোড়া হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। পাশাপাশি তার বন্ধু রনিকে সহায়তা করার জন্য কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং অপর বন্ধু জনিকে খালাস দেওয়া হয়। গৃহকর্মী সুমি অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার বিচার সম্পন্ন হয় কিশোর আদালতে। মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর ঐশীকে পাঠানো হয় গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে।
কিন্তু ঐশীর আইনজীবী এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন। আপিলের শুনানিতে ঐশীর মানসিক স্বাস্থ্য ও অপরাধের প্রেক্ষাপট নিয়ে ব্যাপক বিশ্লেষণ শুরু হয়। চিকিৎসকদের দেওয়া মানসিক মূল্যায়নে দেখা যায়, অপরাধ সংঘটনের সময় এবং তার আগেও ঐশী ‘কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডার’ ও নানা ব্যক্তিত্বের জটিলতায় ভুগছিল। অতিরিক্ত মাদক সেবন তার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে পুরোপুরি অকেজো করে দিয়েছিল।
২০১৭ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট ঐশীর মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানার রায় দেন। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে পাঁচটি মূল কারণ, যার ওপর ভিত্তি করে সাজা কমানো হয়েছিল: প্রথমত, অপরাধ করার সময় ঐশীর বয়স ছিল আনুমানিক ১৯ বছর, অর্থাৎ সে ছিল একজন উঠতি তরুণী। দ্বিতীয়ত, তার কোনো পূর্ববর্তী অপরাধের রেকর্ড বা সাজা ছিল না। তৃতীয়ত, ঘটনার পরপরই সে পালিয়ে না গিয়ে নিজেই থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল এবং নিজের অপরাধ স্বীকার করেছিল। চতুর্থত, সে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাগতভাবে প্রমাণিত মানসিক অসুস্থতা ও আচরণগত ব্যাধিতে ভুগছিল। পঞ্চমত, মাদকাসক্তি তার চিন্তাভাবনাকে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল।
আজও কাশিমপুর কারাগারে বন্দি দিন কাটাচ্ছে ঐশী। নিজেকে শুধরেও নিয়েছে অনেক। জানা যায়, বইপত্র পড়েই সময় যায় তার। এ ছাড়া কারাগারের গ্রন্থাগারে লাইব্রেরিয়ান হিসেবেও কাজ করছে সে।
চামেলীবাগের সেই ফ্ল্যাটের ঘটনাটি শুধু একটি আইনি মামলার নথিতে সীমাবদ্ধ হয়ে নেই, এটি রয়ে গেছে আমাদের সমাজের জন্য এক চিরন্তন সতর্কবার্তা হিসেবে। ঐশীর ঘটনাটি আমাদের দেখিয়ে দেয়, সন্তানকে শুধু বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা আর প্রাচুর্য দিলেই অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সন্তানদের সঠিক মানসিক সান্নিধ্য দেওয়া, তাদের সুসঙ্গে রাখা, মাদকের হিংস্র থাবা থেকে মুক্ত রাখা এবং মনের ভেতরে জমে থাকা অভিমান কিংবা কষ্টের খবর রাখাটাও জরুরি।







