পাঠকের ভয়
ডাক

আঁকা : ফারজিন
রাতে বাবার কাছ থেকে এলো মাছ ধরার ডাক। কিন্তু মাছ ধরার জন্য অভিশপ্ত দীঘির কাছে পৌঁছতেই বদলে গেলেন বাবা। লিখেছেন রাকিব আহসান
আমার দাদার আমলের কথা। ছোটবেলায় বহুবার দাদার মুখ থেকে এ ঘটনা শুনেছি আমি। গ্রামীণ পরিবেশে বিদ্যুৎ তখনো সবার ঘরে ঘরে পৌঁছায়নি। তাই সন্ধ্যা হলেই চারপাশের পরিবেশে গ্রাস করত গাঢ় অন্ধকার। ভরা পূর্ণিমার রাতে দূর থেকে শোনা যেত ঝিঁঝি পোকার ডাক, রাতের নিস্তব্ধ পরিবেশে মাঝেমধ্যে জলাশয় থেকে ভেসে আসত ব্যাঙের ঘ্যাঙানি হাঁক। আর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে নীরব পরিবেশ যেন ক্রমে ভারী হয়ে উঠত। এই ছিল তখনকার ঘটনা।
নতুন বিবাহিত জীবন তখন দাদুর, অথচ সংসারের ব্যস্ততা এখনো তার মাথায় চেপে বসেনি। লোকসংগীতের প্রতি দাদুর ছিল ভীষণ ঝোঁক। তাই সময় পেলেই গুনগুন শব্দে লোকসংগীত চর্চা করতেন। অন্যদিকে দাদুর বাবা করিম আলী, যাকে আমি বড় বাবা বলে ডাকি, তার ছিল বিশাল এক পানা পুকুর। পুকুরে প্রচুর মাছ উঠত। মাছ বিক্রি করেই পরিবারের অর্ধেক খরচ মিটে যেত।
একদিন সন্ধ্যার শান্ত, নীরব পরিবেশে একটি কুপিবাতির মৃদু আলোর নিচে বসে দাদু তার একতারা হাতে নিয়ে লোকসংগীতের চর্চা করছিলেন। ঠিক তখনই ঘরের মেঝেতে বসে দাদু শুনতে পেলেন, বাইরে থেকে ভেসে আসা তার বাবার কণ্ঠস্বর।
সোবহান! ও সোবহান!
‘জি বাবা।’
‘বাড়ির পশ্চিম পাশে জাল ফালাইছি। চল, মাছগুলো ধরে নিয়ে আসি।’
বড় বাবার কথা শুনে দাদু আর দেরি করলেন না। ঘরের দরজা অল্প ভিড়িয়ে বাইরে উঠানে এসে বড় বাবাকে বললেন, ‘বাবা, চলো যাওয়া যাক। আজ এমনিতেই পূর্ণিমা, বেশি দেরি করলে রাইত হইয়া যাইব। বেশি রাইত হওনের আগেই মাছ লয়া আমরা বাড়ি ফিরা আমু।’
আমাদের বাড়ির পশ্চিম দিকটা ছিল কিছুটা নির্জন। পুকুরের কাছেই ছিল গ্রামের একটি প্রাচীন দীঘি। লোকমুখে প্রচলিত ছিল, সেই দীঘির ভেতর এক অশুভ শক্তি থাকে। তাই দীঘিটি বহু বছর আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। দিনের বেলায় সেই দীঘির পাশটা থমথমে, স্তব্ধ থাকত। আর সন্ধ্যার পর সেখানে লোকের যাতায়াত থাকত আরও কম।
সেই পূর্ণিমার রাতে পুকুরপাড়ে মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য আমার দাদু বড় বাবার পেছন পেছনে হাঁটছিলেন। কিছুটা পথ যাওয়ার পরেই দাদুর হঠাৎ মনে হলো, কিছু একটা ঠিক নেই। বড় বাবার হাঁটার ধরনটা একেবারেই অন্যরকম লাগছে। পা যেন ঠিকমতো মাটিতে পড়ছে না, অদ্ভুত ভঙ্গিতে বড় বাবা সামনে এগিয়ে চলেছেন। দাদু একটু দ্রুত পা চালিয়ে ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বড় বাবা ঠিক আগের মতো নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেই হেঁটে চলছেন।
পেছন থেকে দাদু বড় বাবাকে ডেকে উঠলেন,
‘বাবা, একটু অাস্তে হাঁটো।’
কিন্তু সামনের মানুষটার কাছ থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। সে অল্পের জন্যও থামল না। শুধু অন্ধকারের বুক চিরে বড় বাবা আগের মতোই এগিয়ে চলতে লাগলেন।
কিছুদূর যাওয়ার পর দাদু ও বড় বাবা এসে পৌঁছাল বিশাল পুকুরপাড়ে। পুকুরের চারদিকে তাকিয়ে দাদু জাল খুঁজতে লাগলেন, কিন্তু কোথাও জালের কোনো চিহ্ন পর্যন্ত নেই।
দাদু অবাক হয়ে এবার বড় বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাবা, জাল কই? এইহানে তো কোনো জাল দেখতাছি না!’
ঠিক সেই মুহূর্তে সামনের মানুষটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে লাগল। আর দাদুর শরীর যেন ক্রমে ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগল। যখন সে জিনিসটি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াল, অস্পষ্ট আলোয় ভেসে উঠল তার মুখ। নিস্তব্ধ রাতে তার হাতের আঙুলগুলো যেন একে অপরের সঙ্গে ঘষা খেয়ে খসখসে শব্দ করছিল। শরীরের চামড়াগুলো ঝুলে পড়েছে। আর চোখ দুটো পাথরের মতো স্থির হয়ে দাদুর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। দাদু বুঝতে পারল, দেখতে অনেকটা বড় বাবার মতো হলেও আসলে সে জিনিসটা বড় বাবার রূপ ধরে আসা অন্য কিছু। ভীতিকর সেই মুহূর্তে মৃদু ভয় পেলেও দাদু পুরোপুরি তার হিতাহিত জ্ঞান শক্তি হারাল না।
কিন্তু দাদু কিছু করার আগেই সেটি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এক ঝটকায় দাদুর ঘাড় ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল দূরের দীঘির সামনে। দীঘির পানি ঘুটঘুটে কালো হয়ে আছে, যার থেকে ভেসে আসছে দুর্গন্ধ। তারপর ঝপাং করে সে দাদুর মাথাটা সোজা চুবিয়ে দিল দীঘির পচা দুর্গন্ধযুক্ত গভীর কালো পানির নিচে।
দাদুর নাক-মুখ দিয়ে হু হু করে ঢুকে যেতে লাগল দীঘির নোংরা পানি। হাত-পা ছুড়ে নিজেকে ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করলেন দাদু। তখন তিনি বেশ শক্তসমর্থ আর সাহসী একজন যুবক। দাদুর ভেতর জেদ চেপে গেল, নিজের শক্তি দিয়ে তিনি সেই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। পানি আর কাদার ভেতর শুরু হলো দুপক্ষের মধ্যে প্রচুর ধস্তাধস্তি।
শেষ পর্যন্ত নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে দাদু সেই শক্তির হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে সক্ষম হলেন। তারপর দীঘির পাড়ে উঠে পেছনের দিকে আর একমুহূর্তও না তাকিয়ে তিনি সোজা বাড়ির দিকে দৌড়াতে লাগলেন। কীভাবে যে দাদু সেদিন বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিলেন, তা তার নিজেরও ঠিক মনে ছিল না!
এদিকে আমাদের বাড়িতে দাদুকে না পেয়ে হুলুস্থূল কাণ্ড বেঁধে গিয়েছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর যখন দাদুকে বাড়ির দরজার সামনে পাওয়া গেল, তখন তাকে দেখে সবাই বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল। কারণ, কাদাপানিতে ভেজা দাদুর সারা শরীর ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপছে। কাদার জন্য দাদুকে চেনাই যাচ্ছিল না। সবচেয়ে আজব ব্যাপার হলো, দাদুর সারা শরীর থেকে ভেসে আসছিল পচা মাছের তীব্র দুর্গন্ধ! এমন গন্ধ, যেন তাকে বহুদিনের পচে যাওয়া কোনো জলাশয়ের অতলে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল। তখন কোনো কিছু চিন্তা না করে দাদুকে সবাই ধরাধরি করে ভেতরে নিয়ে যায়। পরে দাদুর জ্ঞান ফিরলে পরিবারের সবাই এ ব্যাপারে দাদুকে জিজ্ঞেস করে। দাদুও সেদিনকার পুরো ঘটনা পরিবারের সবার কাছে খুলে বললেন। দাদুর কথা শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়।



