বন্ধুর বেশে

আঁকা : নওরিন জাহান শর্মী
রাতের শেষ ভাগ। অন্ধকার তখনো দূর হয়নি। ছোটবেলা থেকেই তিনি শুনে এসেছেন, এ সময়ে বাইরে বের হতে নেই। তবুও গোয়ালঘরের দিকে পা বাড়ালেন। তাগড়া ষাঁড়টাকে নিয়ে আজ ক্ষেতে যেতেই হবে। গতকাল বৃষ্টির দেখা মিলেছে। এখন ষাঁড়-গরুটা দিয়ে হালচাষের কাজ শুরু না করলেই নয়। তা ছাড়া গতকাল সন্ধ্যায় হাট থেকে ধানের বীজ (চারাগাছ) কিনে আনা হয়েছে। ওগুলোও পড়ে থাকলে নষ্ট হয়ে যাবে।
‘যাস নে...’, হঠাৎ কানের পাশে কে যেন ফিসফিসিয়ে বলে গেল কথাটা।
‘কে! কে?’ ভয়ার্ত কণ্ঠে বললেন তিনি।
ঠিক তখনই প্রিয় ষাঁড়-গরুটার বিকট ‘হাম্বা’ ডাকে সমস্ত ভয় মূহূর্তেই উবে গেল।
নিচু হয়ে চারাগাছগুলো রোপণে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎ চটি-জুতা পায়ে কারও হেঁটে যাওয়ার শব্দে মাথা তুলে তাকালেন। অদূরের মেঠোপথটা দিয়ে কেউ হেঁটে যাচ্ছে।
‘কে যায় রে?’
‘আমি।’
‘আমি কে? এদিকে আয়।’
‘যখন ডেকেছ, না এসে কি পারি!’
দিক পরিবর্তন করে লোকটা তার কাছাকাছি আসা মাত্রই ভীষণ চমকে উঠলেন তিনি।
‘সোহরাব তুই? এ সময়ে এখানে?’
সোহরাব তার বন্ধু। মিতা। উপজেলা সদরে বাড়ি। এত ভোরে তার এত দূরের... বন্ধুকে দেখে ভীষণ অবাক হলেন তিনি। ফের প্রশ্ন করলেন, ‘কোথাও যাচ্ছিলি নাকি?’
কিন্তু আগন্তুক কোনো জবাব দিলেন না। মূল রাস্তা ছেড়ে ক্ষেতে নেমে পড়লেন। লোকটা অনেকটা যেন সম্বোহিতের মতো তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন।
তারপর কোনো কথা বলা ছাড়াই তাকে ধাক্কা মেরে কাদামাটিতে ফেলে দিল।
‘এই, কী করছিস সোহরাব?’
লোকটা তার কথা শুনলেনই না। কাদামাটিতে পড়ে থাকা তার শরীরের ওপর পুরো শক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। জোরালো হাতে গলা চেপে ধরল। ঠিক তখন গাঁয়ের মসজিদ থেকে ভেসে এলো আজানের সুমধুর সুর...
‘সোহরাব, বাসায় আছিস?’ বাড়ির বাইরে থেকে কেউ একজন ডাকছেন বাবাকে।
আমি ভেতরে পড়ার টেবিলে বসেই জবাব দিলাম, ‘আব্বায় তো বাসায় নাই।’
‘কোথায় গেছে?’
‘ঢাকায়।’
আমি দরজা খুলে দিলাম। বাইরে যাকে দাঁড়ানো দেখলাম, তিনি আমার বেশ পরিচিত। ওনার নামও সোহরাব।
‘এক গ্লাস পানি খাওয়াও তো, বাবা।’
আমি চাপকল চেপে স্টিলের গ্লাসে এক গ্লাস পানি এনে দিলাম তার হাতে। ততক্ষণে তিনি বাড়ির সামনের পাকা কংক্রিটের বেঞ্চিতে বসে পড়েছেন।
পিপাসার্তের মতো এক ঢোকে পুরো গ্লাসের পানি খেয়ে খালি গ্লাসটা ফেরত দিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা, ও ঢাকা গেছে কবে?’
‘গত সপ্তাহে।’
‘আচ্ছা। যাও বাবা, ভাবিরে আমার সালাম জানাও।’
আমি মাকে খবরটা জানিয়ে পড়ার টেবিলে বসলাম। মা দরজার এপাশে এসে নিচু কণ্ঠে সালাম জানালেন। তখন তিনি ঘরের বাইরের সেই বেঞ্চিতে বসেই মাকে ওপরের ঘটনাটা খুলে বললেন। সকালে কয়েকজন মসজিদগামী মুসল্লি তাকে ফসলের ক্ষেতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখে বাড়িতে নিয়ে আসেন। ওই ঘটনার পর আরও পঁচিশ কি ছাব্বিশটি বছর কেটে গেছে। এখনো প্রশ্ন জাগে মনে— লোকটি আসলে কে ছিল?



