ঢাকার ভূত
হলুদ জামার আতঙ্ক

আঁকা : সোহানুর রহমান
মানুষের ভারে জর্জরিত এই ঢাকা শহরে এখনো এমন কিছু বাড়ি আছে, যেখানে দাপট মানুষের নয়, অন্য কিছুর। মোহাম্মদপুরের এমন এক ভুতুড়ে বাড়ির গল্প বলেছেন মনিরা তাবাসসুম প্রীতি
ঘটনাটি আজ থেকে প্রায় চার বছর আগের। তখন আমরা ঢাকার মোহাম্মদপুর হাউজিং লিমিটেডের একটি বাড়ির নিচতলায় ভাড়া থাকতাম। আমার বরের বড় বোন থাকতেন সে বাড়িরই দোতলায়। আমি তখন অন্তঃসত্ত্বা। বিয়ে হয়ে বাসাটিতে ওঠার পর থেকেই অকারণে এক ধরনের অস্বস্তি অনুভব করতাম।। সে রাতে সবকিছু ছিল একেবারে স্বাভাবিক। ঘুমাতে যাওয়ার আগে গোসল করেছিলাম। চুল ভেজাই ছিল। তারপর বিছানায় শুয়ে পড়ি। ঠিক কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই। একপর্যায়ে আধঘুম, আধজাগা অবস্থায় হঠাৎ অনুভব করলাম, আমার বিছানার পাশে সাত-আট বছরের একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে হলুদ রঙের একটি ফ্রক। মেয়েটি একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। সে কিছু বলছিল না।
এরপর এমন একটি দৃশ্য দেখলাম, যার ব্যাখ্যা আজও আমার কাছে নেই। বিছানায় শুয়ে আছি, অথচ একই সঙ্গে দেখতে পাচ্ছি, আমি নিজেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ভেজা চুল দুই হাতে তুলে ঝাড়ছি। ঠিক যেভাবে ছোটবেলায় আমাদের মায়েরা গামছা দিয়ে ভেজা চুল ঝেড়ে শুকিয়ে নিতেন। সেই ছোট মেয়েটি ধীরে ধীরে আমার সেই প্রতিচ্ছবির কাছে এগিয়ে গেল। কোনো কথা না বলে হঠাৎ আমার চুলের একগোছা শক্ত করে ধরে টেনে দিল।
চিৎকার করতে চাইছিলাম, কাউকে ডাকতে চাইছিলাম কিন্তু আমার শরীর যেন পাথর হয়ে গিয়েছিল। যত শক্তি ছিল সব দিয়ে চেষ্টা করছিলাম; কিন্তু যেন অদৃশ্য কিছু আমাকে আটকে রেখেছিল। হঠাৎ একসময় প্রচণ্ড চিৎকার করে উঠলাম। চোখ খুলে দেখি, আমি বিছানাতেই শুয়ে আছি। ঘরের আলো আগের মতোই জ্বলছে। চারপাশে কেউ নেই। পরদিন সকালে কোনো দ্বিধা না করেই আমার কোমর ছাড়িয়ে যাওয়া ঝলমলে চুলগুলো কেটে ফেলি। স্বপ্নে চুলের যে অবধি সেই মেয়েটি ধরে টেনেছিল, ঠিক সেই অংশটুকু পর্যন্ত কেটে ফেলেছিলাম। কেন করেছিলাম, আজও জানি না। শুধু মনে হয়েছিল, এটাই করা দরকার। সকালবেলা পুরো বাড়িটা ভালো করে ঘুরে দেখতে গিয়ে আরেকটি অদ্ভুত বিষয় চোখে পড়ে। প্রায় প্রতিটি শোবার ঘরের দরজায়, বারান্দার দরজায়, এমনকি রান্নাঘরের ছোট বারান্দার কাছেও ছোট-বড় নানা আকারের আরবি লেখা কাগজ লাগানো ছিল। আগে কখনো সেগুলোর দিকে আমার নজর যায়নি।
চিৎকার করতে চাইছিলাম, কাউকে ডাকতে চাইছিলাম, কিন্তু আমার শরীর যেন পাথর হয়ে গিয়েছিল
আমাদের বাসাটি ছিল গলির একেবারে শেষের দিকে। রান্নাঘরের ছোট বারান্দার ওপাশেই ছিল একটি ফাঁকা প্লট। দিনের বেলায় সেটি সাধারণ ময়লার ভাগাড় ছাড়া আর কিছুই মনে হতো না। কিন্তু রাত হলে জানালার বাইরে তাকাতে আমার কেমন ভয় ভয় করত। সেদিনের ঘটনাটি আমি পরিবারের সবার কাছে খুলে বলেছিলাম। বলতে বলতে লক্ষ করলাম, আমার শাশুড়ি হঠাৎ অস্বাভাবিক নীরব হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ওপরতলা থেকে এলো আমার ননাসের মেয়ে পিহু (ছদ্মনাম)। আমার অভিজ্ঞতার কথা শুনে সেও চুপ মেরে রইল, কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে ফিসফিস করে বলল— ‘মামি, ওই মেয়েটিকে আমিও চিনি!’
এরপর পিহু যা শোনাল, তা আমার রক্ত জল করে দিল। এ ঘটনার সপ্তাহখানেক আগে সে স্বপ্নে দেখেছিল, পেছনের ওই পরিত্যক্ত প্লটের দেয়ালের ওপর এক বিকৃত চেহারার মাঝবয়সী মহিলা দাঁড়িয়ে আছে আর তার কোলে হলুদ ফ্রক পরা একটি মেয়ে। ও প্রায়ই গভীর রাতে কান্নার করুণ সুর শুনত, যা বিছানায় শুলে আরও তীব্র হয়ে কানে বাজত। মনে হতো ঘরের মেঝে থেকে শব্দটি ভেসে আসছে। এসব কারণে পিহু রাত জাগতে শুরু করে আর যখনই ঘুমাত, নানারকম স্বপ্নে দেখত। স্বপ্নে বারবার ভয়ংকর কণ্ঠে হুমকি দেওয়া হতো, ‘এই বাড়ি ছাড়, নয়তো পরিবারের ক্ষতি হবে!’
শেষে পাড়ার বয়স্কদের কাছ থেকে জানা গেল সেই লোমহর্ষক ইতিহাস। এখানকার পরিত্যক্ত এক প্লটে বহু বছর আগে এক মা ও মেয়েকে পাশবিক নির্যাতনের পর নাকি মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। আমাদের সেই বাড়ির পেছনের প্লটটিই সম্ভবত সেই অভিশপ্ত প্লট ছিল।
এ বিষয়টি জানার পর বাড়ির দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করলাম, প্রথমে কিছু বলতে না চাইলেও পরে স্বীকার করে এ বাড়িতে খারাপ কিছু আছে, যা অনেক ভাড়াটিয়াই অভিযোগ করেছে।
এরপর শুধু রাত নয়, দিনের আলোতেও আমরা ছায়ামূর্তি দেখতে শুরু করলাম। পিহুর শারীরিক অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকল। সে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়ে কঙ্কালসার হয়ে পড়ল।
নিরুপায় হয়ে আমরা স্থানীয় এক হুজুরকে নিয়ে এলাম দোয়া পড়ানোর জন্য। তিনি চোখে দেখতেন না। তিনি বাসার দরজায় পা রেখেই থমকে দাঁড়ালেন। খসখসে গলায় বললেন, “এই বাড়িতে আমি আগেও এসেছি! একই সমস্যার জন্য আমাকে বাড়ি ‘বন্ধ’ করতে ডেকে আনা হয়েছিল।” হুজুর বাড়ি বন্ধ করে যাওয়ার আগে সতর্ক করে দিয়ে বলে গেলেন, এখানে যা আছে তা খুব শক্তিশালী অশুভ শক্তি। দ্রুত যেন এ বাসা ছেড়ে যাই।
পিহুকে দেওয়া হুজুরের তাবিজগুলো ওর কাছ থেকে হারিয়ে যেত। প্রাণচঞ্চল মেয়েটি একেবারেই বিমর্ষ হয়ে থাকত। আমরা ভয় পাব বলে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনেক কিছুই সে আড়াল করত।
এরপর পিহুকে ঝাড়ফুঁক করতে পারেন এমন আরও একজন মহিলাকে দেখানো হলো। তিনি জানালেন, ওই প্লটটিতে যে মেয়েটিকে মারা হয়েছে, সে নাকি পিহুর বয়সী ছিল। দেখতেও ওর চেহারার সঙ্গে মেলে। সবকিছু জানিয়ে কিছু পড়া পানি আর তাবিজ দিয়ে তিনিও আমাদের বাড়ি ছাড়ার তাগিদ দিলেন।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমরা বেশ কয়েকবার বাসা ছাড়ার উদ্যোগ নিলেও প্রতিবারই কোনো না কোনো অজানা কারণে তা ভেস্তে যাচ্ছিল। যেন অদৃশ্য এক মায়া বা শিকল আমাদের ওই অভিশপ্ত চার দেয়ালের মাঝে আটকে রেখেছিল।
এরই মধ্যে আমার কোল আলো করে এলো আমাদের প্রথম সন্তান। নিরাপত্তার স্বার্থে মেয়ের জন্মের ঠিক ১৪ দিনের মাথায় আমার বাবার বাড়ি চলে আসি।
আমি তখন বাবার বাড়ি, এক সকালে হঠাৎ মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপের নোটিফিকেশন বেজে উঠল। স্ক্রিন স্লাইড করে দেখি বড় ননাসের ফোন থেকে একটি ভিডিও এসেছে। ভিডিওতে দেখলাম, আমাদের বাসার ডাইনিং রুমের দেয়ালে রক্তের ছোপ ছোপ টাটকা দাগ! সেই রক্তের ছোপ টেবিলের ওপর রাখা পানির বোতল থেকে শুরু করে রুমের মেঝে হয়ে রান্নাঘরের দিকে গেছে এবং হুট করেই এক জায়গায় এসে অদৃশ্য হয়ে গেছে। কোনো প্রাণীর পায়ের ছাপ না, শুধু জমাটবদ্ধ দলা দলা রক্ত। এ রক্তের রহস্যের কিনারা করতে না পেরে পুরো পরিবার আতঙ্কে পাথর হয়ে গিয়েছিল। সেই অশুভ শক্তি আমাদের পিছু ছাড়ছিল না। এবার পিহুর স্বপ্নে হাজির হলো একদল বীভৎস চেহারার লোক। এবার তারা জানিয়ে গেল এতদিন বাসা ছাড়ার কথা বলেছি, ছাড়িসনি। এবার আর এই বাসা থেকে তোদের যেতে দেব না!
সেই বিভীষিকা আর আতঙ্কের মধ্য দিয়েই আরও দেড় বছর কাটাতে হলো আমাদের। অবশেষে দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরের সেই দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে আমরা ওই বাড়ি থেকে চিরতরে মুক্তি পাই।
বাসা ছেড়ে আসার পরদিন কিছু দরকারি জিনিস আনতে গেলে জানতে পারি এ বাসায় আসা নতুন পরিবারটি মালামাল নিয়ে ওঠার পরদিনই সব আসবাব ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে।







