ব্ল্যাডি ম্যাকেনজি ও অন্যান্য

গ্রেইফায়ার্স কার্কইয়ার্ড
মধ্যরাতের স্কটল্যান্ড। ঘন কুয়াশার পাতলা চাদরে ঢাকা প্রাচীন এডিনবরা শহর। শতবর্ষী এক গোরস্তানের লোহার বিশাল ফটক ঠেলে ভেতরে পা বাড়াতেই বাতাস যেন একঝটকায় ভারী হয়ে উঠল। চারপাশে স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ আর তার মাঝেই মিশে আছে কোনো অদৃশ্য আত্মার বরফশীতল নিঃশ্বাস। আপনি দাঁড়িয়ে আছেন বিশ্ববিখ্যাত ‘গ্রেইফায়ার্স কার্কইয়ার্ড’-এ।
১৫৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই রহস্যপুরীতে ঢুকলেই দেখা যায় লোহায় ঘেরা কিছু অদ্ভুত কবর, যাদের বলা হয় ‘মরটসেফ’। আঠারো শতকে লাশ চোরদের হাত থেকে মৃতদেহ রক্ষা করতে এগুলো বানানো হলেও, মধ্যরাতে চাঁদের আবছা আলোয় এগুলো দেখলে মনে হবে, ভেতরের কোনো পচা-গলা প্রেতাত্মা যেন বেরিয়ে আসার জন্য লোহার শিকলে আঁকুপাঁকু করছে!
তবে এ গোরস্তানের আসল নরকযন্ত্রণা ‘ব্ল্যাডি ম্যাকেনজি’ বা স্যার জর্জ ম্যাকেনজি। ১৬৭৯ সালে ১৬০০ ধর্মদ্রোহীকে বন্দি করে এ গোরস্তানেরই পেছনে এনে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছিলেন তিনি। শত শত মানুষের রক্তে হাত রাঙানো সেই নিষ্ঠুর ম্যাকেনজি মারা যাওয়ার পর গড়ে ওঠে এক রাজকীয় সমাধি। ১৯৯৮ সালের এক শীতের রাতে এক ভবঘুরে আশ্রয়হীন লোক ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচতে ম্যাকেনজির বন্ধ সমাধির জানালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। ব্যস, সজাগ হয়ে ওঠে ঘুমন্ত শয়তান! পচা হাড়গোড়ের ওপর পড়ে থাকা সেই লোকটিকে কোনো এক অদৃশ্য শক্তি হিংস্রভাবে আক্রমণ করে।
সেই রাতের পর থেকে আজ পর্যন্ত এই সমাধিতে ঘটেছে হাজারো গা-শিউরে ওঠা রক্ত হিম করা ঘটনা! শত শত পর্যটক দাবি করেছেন— সমাধির কাছাকাছি যেতেই কোনো এক কালচে ছায়াশরীর তাদের ঘিরে ধরে। অদেখা হাত তাদের সজোরে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়, গায়ের জামা ছিঁড়ে থাবায় আঁচড়ে-কামড়ে দেয়, এমনকি অলৌকিক শক্তিতে মানুষের হাড় ভেঙে যাওয়ার শব্দও পাওয়া গেছে!
তবে ম্যাকেনজিই একা নন; এই কার্কইয়ার্ডে ঘুরে বেড়ায় আরও অসংখ্য বিদেহী আত্মা।
গোরস্তানের সবচেয়ে নির্জন কোনায় প্রায়ই রাতে ভেসে আসে এক ছোট্ট শিশুর করুণ কান্না। পর্যটকদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, অন্ধকারে কুয়াশার মধ্য থেকে হঠাৎ ভেসে ওঠে ভিক্টোরিয়ান আমলের এক বিষাদগ্রস্ত বাচ্চা মেয়ের ছায়ামূর্তি। সে পথচলতি মানুষের হাত ধরে বাঁচার আকুতি জানায়, কিন্তু কেউ হাত বাড়ালেই তার চেহারা বিকৃত রক্তচক্ষু রাক্ষসে রূপ নেয় এবং মুহূর্তেই বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যায়!
আবার গভীর রাতে গোরস্তানের সীমানা ঘেঁষে যারা হেঁটে যান, তারা মাঝেমধ্যেই দেখতে পান গাঢ় কালো কোট পরা এক মাথাবিহীন ছায়ামূর্তিকে। নিঃশব্দে কবরগুলোর মাঝে হেঁটে বেড়ায় সে, হাতে ঝুলতে থাকে তার নিজেরই কাটা মাথা!



