চৌকির নিচে

আঁকা : ফারজিন
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের এক কলোনির ফ্ল্যাটে ঘটেছিল ব্যাখ্যার অতীত কাণ্ড। নিজের বাবার জীবনের সে অভিজ্ঞতা পাঠকের সামনে হাজির করেছেন ফারজানা কবীর ঐশী
ঘটনাটি শুনেছি আমার আব্বুর কাছ থেকে। আব্বু তখন বেশ ছোট। তো, আমার দাদার সরকারি চাকরির সুবাদে ঢাকার একটি সরকারি কলোনিতে ছিলেন তখন। কলোনির বাসাগুলো যেমন হয়, তাদের বাসাটা ছিল বেশ বড় আর খুব পুরনো ধাঁচের। রুমগুলো বড় বড়। প্রতিটির সঙ্গে ব্যালকনি আছে। তাদের বাসাটা ছিল কলোনির এক প্রান্তে, অর্থাৎ বারান্দায় দাঁড়ালে ওই পাশে পুরোটাই তখন জঙ্গল দেখা যেত। সন্ধ্যার পর গ্রাম গ্রাম একটা পরিবেশ তৈরি হতো।
আব্বু তখন বেশ ছোট। কখনো কলোনির অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলা করত, আবার বাসায় এসে নিজের মতো করে সে ঘুরত-ফিরত। একদিনের ঘটনা। তখন প্রায় শীত পড়ে গিয়েছে। বাসার সবাই কোথায় যেন ঘুরতে গিয়েছিল। শুধু ছিল আমার দাদি আর আব্বু। দাদি কাজ করছিল। সময়টা বিকাল, তবে শীতের দিন বলে সন্ধ্যার আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। আব্বু কোনো একটা জিনিস নিয়ে খেলছিল, খেলতে খেলতে বারান্দায় চলে যায়। বারান্দাটা বেশ বড় ছিল, এক কর্নারে পুরনো কিছু আসবাব, যেমন— চেয়ার, ভাঙা চৌকিসহ পুরনো কিছু জিনিসপত্তর ছিল। অনেকটা স্টোররুমের মতো আর কি।
সেখানে আমার আব্বু খেলতে খেলতে গিয়ে তাকিয়ে দেখে, বড় ব্যালকনির একদম শেষ প্রান্তে একটা চেয়ারের মধ্যে একজন মহিলার মতো বসা, তার গায়ে একটা কাপড়। তবে পোশাকটা বড় অদ্ভুত। অনেকটা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে একদম মাথা পর্যন্ত উঠে গেছে।
আব্বু হঠাৎ করে দেখে প্রথমে ভেবেছিল, আমার দাদি বসা। কিন্তু পরে দেখল, নারী কাঠামোটির মাথা পর্যন্ত কাপড় পেঁচানো, মানে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। তার মা এভাবে থাকবে কেন?
আব্বু অবাক হয়ে দেখছিল। একটা সময় ওই জিনিসটা ঘুরে আব্বুর দিকে তাকায় এবং হাত বাড়িয়ে তাকে ডাকে। আব্বু ধীরে ধীরে সামনের দিকে যাচ্ছিল এবং সেই জিনিসটা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। তখনই ওটার শরীর নুয়ে যায় বা বাঁকা হয়ে যায়, তারপর পাশের চৌকির নিচে ঢুকে যায়। আব্বু এটি দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে যায় এবং পেছন দিকে দৌড়ে চলে আসে। চিৎকার শুনে আমার দাদি রান্নাঘর থেকে দৌড়ে আসে। জিজ্ঞেস করে, কী হইছে? আব্বু কথা বলতে পারছিল না। মানে তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। তাকে তাড়াহুড়ো পানি খাওয়ান দাদি।
অন্ধকারের মধ্যে চৌকির নিচের ছোট জায়গাটিতে চার হাত-পা দিয়ে মানুষের মতো, তবে অদ্ভুত আর ভীতিপ্রদ অবয়বটা বসে ছিল
একটু সুস্থির হতে দাদি ভয় পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে আব্বু কী দেখেছেন বলে। তখন দাদি বলেন, তুমি হয়তো ভুল দেখেছ। ওই দিকটায় যেও না। কারণ, ওই বারান্দার পাশে জঙ্গল আছে। আবারও ভয় পেতে পারো।
কিন্তু আমার আব্বুর ভয়টা যাচ্ছিল না। দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। তার পরের এক রাতের ঘটনা। আব্বু তখন ঘুমিয়ে আছে। কলোনির সব ফ্ল্যাটের দরজা-জানালাও পুরনো ধাঁচের। তো, রাতের বেলা হুট করে সে শুনতে পায় যে ঠকঠক শব্দ হচ্ছে এবং তাকিয়ে দেখে রুমের জানালাটা খুলে যাচ্ছে এবং জানালা দিয়ে মনে হয় ছাগলের মতো দুটো পা ঢুকে যাচ্ছে। এতে জানালাটার দুই পাশের পার্ট সরে খুলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর আব্বুর চোখে যখন অন্ধকারটা সয়ে এলো, দেখল সেই অবয়বটা, যেটা দেখেছিল সাদা কাপড় পেঁচানো, সেটা জানালার ওইপাশে দাঁড়িয়ে আছে এবং মুখের মধ্যে হচ্ছে গিয়ে সেইভাবে কাপড় পেঁচানো।
আব্বুকে হাত বাড়িয়ে ডাকছে ওটা। আব্বু অবচেতন মনে বিছানা থেকে উঠে যায় এবং হাঁটতে হাঁটতে সেই বারান্দায় চলে আসে। সেখানে দেখে, মাঝখানে সোজা হয়ে একদম একটা লাশের মতো দাঁড়িয়ে আছে ওটা। মুখ পর্যন্ত কাপড় পেঁচানো সেই অবয়বটা। আব্বু হাঁটতে হাঁটতে ওটার কাছে চলে আসে। জিনিসটা তখন মাথা নিচু করে চৌকির নিচে ঢুকে পড়ে। আব্বু চৌকিটার কাছাকাছি গিয়ে মাথা নিচু করে তাকান। অন্ধকারের মধ্যে চৌকির নিচের ছোট জায়গাটিতে চার হাত-পা দিয়ে মানুষের মতো, তবে অদ্ভুতে আর ভীতিপ্রদ অবয়বটা বসে ছিল। সে ইশারা করে ডাকা শুরু করল আবার। আব্বু সম্মোহিতের মতো শরীরের অর্ধেক অংশ ও মাথা চৌকির নিচে ঢুকিয়ে ফেলেন। ঠিক তখনই জিনিসটি তাকে হঠাৎ করে ধরে টান দেয়। টান দেওয়ার সেই মুহূর্তে আব্বুর মনে হয়, পেছন থেকে কেউ একজন আলো হাতে নিয়ে তার পা টেনে ধরেছে। আর সামনে তাকাতেই আব্বু দেখতে পান, সেই জিনিসটি ধোঁয়ার মতো চোখের পলকে মিলিয়ে গেছে। আব্বুকে পেছন থেকে টেনে বের করার পর দেখে সেখানে দাদি দাঁড়িয়ে খুব চেঁচামেচি করছেন, ‘কী ব্যাপার, তুমি এখানে কী করছ? এটার নিচে কেন ঢুকছ?’
তখন আব্বু দাদিকে জানান, ওই জিনিসটি তাকে ডাকছে। বিষয়টি নিয়ে দাদি এবার বেশ উদ্বেগে পড়েন। সবাইকে নিয়ে বসে ঘটনার বিস্তারিত আলোচনা করেন। কিন্তু আমার দাদা এসবে একেবারেই বিশ্বাস করতেন না। তারপর এমন একটা কাণ্ড হলো, যা পরিস্থিতি বদলে দিল।
একবার ঈদের সময় সবাই যখন ঘুরতে যায়, তখন দাদা বাসাতেই ছিলেন। কলোনি পুরো খালি বলা চলে। সন্ধ্যার দিকে তিনি যখন ওই বারান্দায় ধূমপান করতে যান, হঠাৎ তার মনে হয় চৌকির নিচ থেকে কেউ যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেটার দিকে তাকিয়ে তার খুব অদ্ভুত লাগে; মনে হচ্ছিল সাদা গোল ফুটবলের মতো একটি মাথা।
দাদা ভালো করে তাকিয়ে দেখেন যে হ্যাঁ, এটি সত্যিই মানুষের মতো কিছু একটা। অনেকটা ডেড বডি সাদা কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে রাখলে যেমন দেখায়, ঠিক তেমন। সেটি দাদার দিকে তাকিয়ে তাকে ডাকছিল। এবার দাদা বেশ ভড়কে যান এবং ভালোভাবে লক্ষ করেন যে চোখের কোনো ভুল হচ্ছে কি না। কিন্তু না, তিনি পরিষ্কার দেখতে পান যে জিনিসটি তার দিকে তাকিয়ে ইশারা করছে। দাদা হাতে আগুন নিয়ে যখন সেটির দিকে এগিয়ে যান, তখন সেটি আস্তে আস্তে চৌকির আরও গভীরে সরে যেতে থাকে।
ঠিক সেই মুহূর্তে মাগরিবের আজান পড়ে যায়। আজানের ধ্বনি শোনার সঙ্গে সঙ্গে দাদা ঘোর থেকে যেন বাস্তবে ফিরে আসেন এবং সামনে তাকিয়ে দেখেন যে সেখানে কিচ্ছু নেই। এরপর দাদা বুঝতে পারেন যে এখানে সত্যিই অলৌকিক কিছু একটা রয়েছে এবং বাবার বলা কথাগুলো মিথ্যা নয়।
তিনি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেন যে সেই ফ্ল্যাটটা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবেন। তিনি দ্রুত আবেদন করে বাসা বদলের ব্যবস্থা করেন। এ সময়টায় আব্বুকে নিরাপদ আশ্রয়ে এক আত্মীয়ের বাসায় বেশ কিছুদিন রেখে আসেন। পরে পাকাপাকিভাবে অন্যত্র শিফট করার পর কলোনির ওই ঘরটির বারান্দাটি স্থায়ীভাবে স্থায়ী ইটের গাঁথুনি বা অন্য কিছু দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। জানালাগুলোতে কাঠের তক্তা ও পেরেক মেরে আটকে দেওয়া হয়। আর দরজায়ও পেরেক মেরে সিলগালা করে দেওয়া হয়, যাতে ভুলেও কেউ সেদিকে যাওয়ার সাহস না করে।



