অতি প্রাকৃত
পুকুরে সাবধান!

আঁকা : অনন্যা প্রমা
ভীতিকর এক পুকুরের গল্প বলেছেন শারমিন হক
ঘটনাটি ২০০৮ সালের। আমি যে হোস্টেলে থাকতাম, তার পাশেই ছিল বিশাল বড় একটি পুকুর। পুকুরটির গভীরতা অনেক বেশি। বর্ষায় সেটি পানিতে কানায় কানায় ভরে উঠত। আমি সাঁতার কাটতে খুব ভালোবাসতাম। তাই প্রায়ই রুমমেটদের সঙ্গে পুকুরে নামতাম।
শ্রাবণ মাস। একদিন দুপুরে ঝুম বৃষ্টি নামল। রুমমেটদের সঙ্গে আমিও পুকুরে নামলাম। বৃষ্টির মধ্যে পুকুরে গোসল করার আনন্দ অন্যরকম। পুকুরপাড়ের ডুবে যাওয়া সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আরও অনেকেই ভিজছিল। সিঁড়ি শেষ হওয়ার পরই এক মানুষ সমান পানি; যে কেউ সেখানে ডুবে যেতে পারে। এ জন্য সবাই ডাঙার কাছাকাছি থেকে গোসল করছিল, কারণ বেশিরভাগ মেয়েই সাঁতার জানত না।
আমি সাঁতার কেটে থেমে থেমে কয়েকবার পুকুরের মাঝখান থেকে ঘুরে এলাম। অনেকক্ষণ মরার মতো ভেসেও থাকলাম। তারপর গলাপানিতে দাঁড়িয়ে অন্যদের আনন্দ করা দেখতে লাগলাম।
হঠাৎ গভীর জলের নিচে কে যেন আমার পা টেনে ধরল। শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। কিছু একটা আমাকে ডুবিয়ে দিতে চাইছে! মনে হলো, পুকুরের তলার গলা কাদা আর শ্যাওলার জালে জড়িয়ে গেছি, আর উঠতে পারছি না। আমি তলিয়ে যাচ্ছিলাম জলের অতলে। সর্বশক্তি দিয়ে মাথা ওপরের দিকে তুলে চিৎকার করলাম; কিন্তু মেয়েরা তখনো গান গেয়ে আনন্দ করতে ব্যস্ত। কেউ আমার চিৎকার শুনতে পেল না।
শেষে প্রাণপণ শক্তিতে হাত বাড়িয়ে রুমমেটের ভেসে থাকা ওড়না ধরে জোরে টান দিলাম। তখন সে আমাকে খেয়াল করল আর হাত ধরে টেনে নিল। আমি জোরে পা ঝাড়া দিলাম। এক ঝটকায় যেন সে আমার পা ছেড়ে দিল।
পুকুরপাড়ের সিঁড়িতে বসে আমি হাঁপাতে লাগলাম। চোখ দুটো লাল টকটকে। সবাই ভাবল, আমি হয়তো ডুবে যাচ্ছিলাম। আমি কাউকে কিছু বললাম না। এরপর আর কখনো ওই পুকুরে নামিনি।
তবু পুকুর আমাকে খুব টানত। মন খারাপ হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার পাড়ে বসে থাকতাম। এভাবে কেটে গেল কয়েক বছর। একসময় আমার অভ্যাস হয়ে দাঁড়াল, সন্ধ্যা হলেই চায়ের মগ হাতে পুকুরপাড়ে গিয়ে বসা। রাত ৮টা পর্যন্ত পুকুরপাড় মুখর থাকত। তারপর একে একে সবাই চলে যেত আর রাত ৯-১০টা পর্যন্ত আমি একাই বসে থাকতাম।
পূর্ণিমা রাতে মাঝেমধ্যে দেখতাম, পুকুরপাড়ের সিঁড়িতে বসে খোলা চুলের একটি মেয়ে আনমনে পা ভিজিয়ে জল নিয়ে খেলছে। পানি ছিটানোর শব্দ স্পষ্ট শোনা যেত। আমাদের রিডিং রুমের বারান্দা থেকেও পুকুরপাড় দেখা যেত। রাত ৩টার পর প্রায়ই কোনো একটি মেয়ের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসত। করুণ সেই কান্না আসত পুকুরের দিক থেকে। একটু পরেই কুকুরের ডাকাডাকিতে সে আওয়াজ হারিয়ে যেত।
সেদিন আমার পরীক্ষা চলছিল। একে একে সবাই রিডিং রুম ছেড়ে চলে গেছে। আমি একা। তখন রাত ৩টা বা সাড়ে ৩টা। পূর্ণিমার আলোয় চারদিক এমন ঝলমল করছিল যে মনে হচ্ছিল, সকাল হয়ে গেছে। আমি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। দূরে দেখলাম, আমার রুমমেট দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। সে আমাকে ইশারায় রুমে যেতে বলল। আমি তখন চারপাশের প্রকৃতি দেখছিলাম। অদ্ভুত ভালো লাগছিল।
হঠাৎ সেই কান্নার আওয়াজ। আমি চারদিকে খুঁজলাম। তারপরই শুরু হলো কুকুরের ডাকাডাকি। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম, খোলা চুলে সাদা পোশাকের একটা মেয়ে পুকুরের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। পেছনে কুকুর তাড়া করছে। মেয়েটি চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গিয়ে পুকুরে ঝাঁপ দিল।
পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার সেই শব্দে আমি আর আমার রুমমেট একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলাম। মুহূর্তে কুকুরের ডাক থেমে গেল। আমি দারোয়ান মামাকে ডেকে সব বললাম। তিনি বাইরে বেরিয়ে চারদিকে খুঁজে কিছুই পেলেন না। পরদিন আবার খোঁজ করা হলো। তখন জানা গেল, সে রাতে হোস্টেলের কোনো মেয়েই বাইরে ছিল না। আমি সচরাচর ভৌতিক বিষয়ে ভয় পাই না। আর কীভাবে যেন সব ভুলেও যাই। তাই হয়তো বারবার পুকুরপাড়ে গিয়ে বসি।
এর কয়েক দিন পরের কথা। তখন আনুমানিক রাত সাড়ে ৯টা। আমি পুকুরপাড়ে একা বসে আছি। হঠাৎ চোখে যেন কিছু একটা ধরা পড়ল। ভয়ে ভয়ে তাকাতেই দেখলাম, পুকুরের ঠিক মাঝখানে থমকে থাকা কালো পানির ওপর সাদা কাপড়ে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চুলগুলো ভেজা, পিঠের ওপর ছড়ানো। ধীরে ধীরে সেই অবয়ব পানির ওপর দিয়েই পুকুরপাড়ের দিকে এগিয়ে আসছে। তার পায়ের কোনো শব্দ নেই; শুধু নূপুরের অদ্ভুত বিষণ্ণ রিনঝিন শব্দ রাতের নিস্তব্ধতা চিরে ফেলছে।
ভয়ে আমার রক্ত হিম হয়ে এলো। দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করতেই আমার নাম ধরে সে কোমল অথচ গভীর কণ্ঠে ডেকে উঠল—
‘একটু দাঁড়াবে না? খুব একা লাগে যে।’
আমি আর থামিনি। এক দৌড়ে হোস্টেলে ফিরে গেলাম, একবারও পেছনে তাকাইনি। কোনোমতে রুমে ঢুকে দেখি, আমি ঘামে ভিজে গেছি। সেই রাতেই গায়ে প্রচণ্ড জ্বর এলো।
অনেক খোঁজখবর করে জানতে পারলাম, বেশ কয়েক বছর আগে পাশের হোস্টেলের একটি মেয়ে রাত ৯টার পর এই পুকুরেই আত্মহত্যা করেছিল। প্রেমিকের প্রতারণা আর পরিবারের নির্মম লাঞ্ছনা— দুটো পাথর একসঙ্গে তার কিশোরী বুকটাকে পিষে ফেলছিল। অভিমান, যন্ত্রণা আর তীব্র অপমানে দিশাহারা হয়ে সে ভেবেছিল, এই পৃথিবীতে তার আশ্রয়ের কোনো জায়গা নেই। পরমুহূর্তেই একটা ভারী ঝাঁপ দেওয়ার শব্দ আর শান্ত জলের বুকে কিছু বুদ্বুদ... ব্যস! সেই ছটফটে কিশোরীর নিঃশ্বাস চিরতরে আটকে গেল পুকুরের কালো জলে।
এরপর আমি আর কখনো সন্ধ্যার পর পুকুরপাড়ে যাইনি।



