এখনো অজেয় গেংখার পেনসুম

ভুটানের গেংখার পেনসুম পর্বত
ভুটান-তিব্বত সীমান্তে অবস্থিত গেংখার পেনসুমই এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে পৃথিবীর উচ্চতম অজেয় পর্বতের মুকুট ধারণ করে আছে। আর এই পর্বতের অবস্থান হিমালয়ের সেই অংশে, যেখানে মানচিত্র-সংক্রান্ত জরিপের কাজ সবচেয়ে কম হয়েছে।
ভুটানের সর্বোচ্চ এই পর্বত উচ্চতার দিক থেকে পৃথিবীর ৪০তম উঁচু পর্বত। ‘তিন আত্মিক ভাইয়ের সাদা চূড়া’— জংখা ভাষা থেকে গেংখার পেনসুমের ভাষান্তর করলে বঙ্গানুবাদ এমনটাই দাঁড়ায়। কেউ কেউ অবশ্য ‘মাউন্টেন অব থ্রি সিবলিংস’ নামেও একে ডাকেন। এই পর্বতের তিনটি উঁচু চূড়া আছে। পর্বতের পাদদেশের লায়া ও লুনানা অঞ্চলের অধিবাসীদের কাছে এই তিনটি চূড়া তিন দেবতার আবাস হিসেবে পরিচিত। আবহাওয়া, শস্য এবং উপত্যকার অধিবাসীদের ভাগ্য— তিন দেবতার প্রভাবের ক্ষেত্র তিন রকমের।
২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমা ‘কিলার মাউন্টেন’-এ গেংখার পেনসুম পর্বতকে এলিয়েনদের গা ঢাকা দেওয়ার স্থান হিসেবে দেখানো হয়। অনেকেই আবার মনে করেন, ইয়েতির ভুটানি সংস্করণ ‘মিগোই’ এবং ভুটানের পতাকায় খোদিত শুভ্র বজ্র ড্রাগন ‘ড্রুক’র আবাস এই পর্বতে!
৭ হাজার ৫৭০ মিটার (২৪ হাজার ৮৩৬ ফুট) উঁচু এই পর্বতে আরোহণের প্রচেষ্টাই হয়েছে মাত্র চার-পাঁচবার। গেংখার পেনসুমের অবস্থান ম্যাপে প্রথম নির্ণয় করা হয় ১৯২২ সালে; মানুষের এভারেস্ট আরোহণের প্রথম প্রচেষ্টার ঠিক এক বছর পর। রাষ্ট্রীয়ভাবে ভুটানের পক্ষ থেকে এই পর্বতের সঠিক উচ্চতা নির্ণয়ের কোনো উদ্যোগ আজ অবধি নেওয়া হয়নি। একটা সময় পর্যন্ত ধারণা করা হতো, ভুটানের উচ্চতম পর্বত হলো ৭ হাজার ৩২৬ মিটার উচ্চতার চোমলহারি।
১৯৮৩ সালে বজ্র ড্রাগনের দেশ নামে পরিচিত ভুটানে সরকারিভাবে পর্বত অভিযান চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৫ ও ১৯৮৬ সালে গেংখার পেনসুম পর্বতে পরপর চারটি অভিযান পরিচালিত হয়। প্রথম অভিযাত্রী দলে ছিলেন জাপানিরা। ১৯৮৫ সালের বর্ষার শেষে তারা ৬ হাজার ৮৫০ মিটার পর্যন্ত উঠতে সক্ষম হন। কিন্তু একজন পর্বতারোহীর উচ্চতাজনিত অসুস্থতার কারণে দলটি সেখান থেকেই ফিরে আসতে বাধ্য হয়। অন্য আরেকটা দল একই সময়ে অভিযান পরিচালনা করে এই পর্বতে। দলটা ভুটান গিয়েছিল বিশ্বখ্যাত ঘড়ি নির্মাতা ব্র্যান্ড রোলেক্সের স্পন্সর নিয়ে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তারা পর্বতটাই খুঁজে পায়নি! এ অঞ্চলের মানচিত্রের অসম্পূর্ণতার ব্যাপারটা এখান থেকেই অনুমান করা যায়।
ভুটানের জনগণের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী, উঁচু পর্বতগুলো দেবতা ও পবিত্র আত্মাদের বাসস্থান
পরবর্তী অভিযাত্রী দল আসে আল্পস পর্বতমালার পাদদেশের অস্ট্রিয়া থেকে। টানা বাজে আবহাওয়ার শিকার হয়ে কদিন পর অভিযানের ইতি টানা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথই খোলা ছিল না। এর পরের অভিযানটা পরিচালনা করে ব্রিটিশরা। অভিযাত্রী দলে ছিল জনাসাতেক ক্লাইম্বার, ৯ জন ট্রেকার, পাঁচজন ফিল্ম ক্রু এবং খ্যাতনামা দৈনিক ‘সানডে টাইমস’-এর একজন রিপোর্টার। জাপানি ও অস্ট্রিয়ান অভিযাত্রী দলের ফেলে যাওয়া দড়ি ব্যবহার করে তারা ৬ হাজার ৭০০ মিটার উচ্চতায় ২ নম্বর ক্যাম্প স্থাপন করেন। এই উচ্চতা থেকে আর মাত্র ১২০ মিটার পথ পেরোতেই দলের দুই সদস্য ফ্রস্টবাইটে (তুষারক্ষত) আক্রান্ত হলে তারা সেখানেই অভিযানের সমাপ্তি টানেন। পরে ১৯৯৪ সালে ভুটানের জনসাধারণের ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রথার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ৬ হাজার মিটারের উঁচু পর্বতে আরোহণ নিষিদ্ধ করা হয়। ভুটানের জনগণের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী, উঁচু পর্বতগুলো দেবতা ও পবিত্র আত্মাদের বাসস্থান।
১৯৯৮ সালের মে মাসে চায়নিজ মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের ৪০ বছর পূর্তির প্রাক্কালে ‘জাপানিজ আলপাইন ক্লাব’ চায়নিজ মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন থেকে গেংখার পেনসুমে অভিযান চালানোর অনুমতি আদায় করে। তাদের পরিকল্পনা ছিল, তিব্বতের দিক থেকে অভিযান পরিচালনা করার। সে লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালের অক্টোবরে জাপানিজ আলপাইন ক্লাব একটা অনুসন্ধানী দল পাঠায়। জাপানিজ আলপাইন ক্লাব যখন পুরোদমে পরবর্তী বছরের অভিযনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন চায়নিজ মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন জানায়, সীমান্ত নিয়ে চীন ও ভুটানের রাজনৈতিক টানাপড়েনের কারণে গেংখার পেনসুম পর্বতে অভিযান চালানোর অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে পবিত্র পর্বতে অভিযান নিয়ে ভুটানের সাধারণ জনগণের মধ্যেও তীব্র আক্রোশের সৃষ্টি হয়। জাপানি দলটি তড়িঘড়ি করে গেংখার পেনসুমের সংলগ্ন ‘লিয়াংকাং কাংরি’তে অভিযান চালানোর অনুমতি জোগাড় করে। ১৯৯৯ সালের ৫ মে ওই অভিযাত্রীরা লিয়াংকাং কাংরির (২৪ হাজার ৪১৩ ফুট) চূড়ায় ওঠেন, যেটিকে মূলত গেংখার পেনসুমের একটি গৌণ চূড়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গেংখার পেনসুম আরও অনেক বছর নিঃসন্দেহে উচ্চতম অজেয় পর্বতের তিলক নিজের কপালে এঁটে রাখবে। কারণ, ভুটান সরকার ২০০৩ সাল থেকে দেশটিতে সব ধরনের পর্বতারোহণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল যেখানে উঁচু পর্বতে পদযাত্রা ও আরোহণকে কেন্দ্র করে বিপুল রাজস্ব রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করে, সেখানে ভুটানিরা খুব সচেতনভাবেই তাদের কাছে পবিত্র এসব পর্বতের শুচিতা রক্ষায় এই প্রলোভন পরিহার করার পথ বেছে নিয়েছে।



