মাসুদ রানার নায়িকারা

মাসুদ রানা সিরিজের নায়িকারা। ছবি: সংগৃহীত
পরিচিতির শুরুতে বলা হচ্ছে, ‘একা। টানে সবাইকে; কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না।’ এ একটি বাক্য রানা সিরিজে নারী চরিত্রদের পরিণতি নির্ধারণ করে দিয়েছে, তাই না? তাই এসপিওনাজ জগতে নিজ মহিমায় পদচারণ করে যাওয়া এ চিরতরুণ ছয় দশক পরও ‘একা’!
‘নায়িকা’ অর্থে সচরাচর যে ধরনের চরিত্রকে বোঝানো হয়; রানা সিরিজের খুব কম বইতেই সেভাবে আনা হয়েছে। তার সহকর্মী, সহযোগী কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই চরিত্রগুলো আঁকা; কখনো কখনো রোমান্সের আমেজ আনতে, তাতে নানা মাত্রা যোগ করা হয়েছে।
পাঠকদের কাছে সিরিজের জুটি বলতে বোঝায় ‘রানা-সোহানা’কে। এ জুটির গল্প যেহেতু ছয় দশক ধরে নানা সময়ের বইয়ে এসেছে— এ সম্পর্কে সবশেষে বলছি।
সুলতা রায়
কাজীদার মৌলিক গল্প ‘ধ্বংস-পাহাড়’। শত্রুভাবাপন্ন ভারতের এজেন্ট ‘সুলতা’। কিন্তু নবীনা, কিছুটা অভিজ্ঞতার অভাব ও অকপট চরিত্র তাকে পাঠকদের কাছে নিয়ে আসে, সেই সঙ্গে রানারও। কবীর চৌধুরীর নিষ্ঠুরতার বলি না হলে হয়তো রানার স্পাইজীবন সেখানেই থেমে যেতে পারত।
মিত্রা সেন
‘ভারত নাট্যম’, ‘মূল্য এক কোটি টাকা মাত্র’তে রানার বিপরীতে তাকে দেখি ভারতের স্পাই হিসেবে। মিত্রাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন ছিল রানার; কিন্তু তাতে ছিল সংশয় আর অবিশ্বাস। তাই প্রিন্সেস জয়ললিতা-মিত্রা সেন, রানার ভালোবাসা ও প্রেমের প্রতীক হয়ে থাকলেও সিরিজ থেকে বিদায় নেয়। মিত্রা পরে একবার ভিন্ন রূপে ফিরে আসে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’তে।
সবিতা
‘বিস্মরণে’ দুর্ঘটনায় রানা সাময়িক স্মৃতিভ্রষ্ট হয়, তার স্পাই পরিচয় মনে থাকে না। যার নৈতিকতা, মূল্যবোধ, ভালোবাসা— পেশাগত দিক থেকে না দেখে, শুধুই রানা হিসেবে দেখা যায়। এই অংশে রানার সঙ্গে ‘সবিতার’ রোমান্টিক সময়গুলোও তাই অন্য সব গল্প থেকে আলাদা। সবিতাকে সঙ্গী হিসেবে পেতে চাওয়াটা তার জন্য অকপট ও অনন্য।
প্রথম আলাপচারিতায় সবিতা প্রশ্ন করে রানার পছন্দের নারীর ব্যাপারে। রানার জবাবটা ছিল এমন—
‘আপনার মতো মেয়ে। যাকে দেখলে শান্তিতে ভরে যায় মানুষের হৃদয়, কোনো কলুষ যার এক মাইলের মধ্যে আসতে পারে না, ফুলের মত শুভ্র, সুন্দর, নিষ্পাপ যে মেয়ে!’
অনীতা গিলবার্ট
অনীতার সঙ্গে রানার প্রথম দেখা স্বর্ণমৃগে। আধুনিক, অমায়িক ও অকপট নারী। রোমান্সের কিঞ্চিৎ আভাস সে গল্পেই পাওয়া যায়। তবে সেটার ভেতর জোয়ার-ভাটার একটা ব্যাপার চলে আসে। কারণ, একপর্যায়ে সে রানা এজেন্সিতে যোগ দেয়। নীল আতঙ্কে অনেকটা নিষ্ঠুরতার সঙ্গেই পাঠকের ওপর অনীতার করুণ পরিণতিটা চাপিয়েই দেওয়া হয় বলা চলে।
রেবেকা সাউল
সোহানার পরই সিরিজে তার নাম সবচেয়ে বেশি এসেছে। তবে এর পেছনের আরেকটা কারণ হচ্ছে, রেবেকা সাউলের অঢেল সম্পত্তির উত্তরাধিকার রানা। অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা সূত্র উল্লেখ করতে গিয়ে রেবেকার কথা আসে। ‘বিদায় রানা’তে রেবেকার সঙ্গে রানার পরিচয়, প্রেম। কিন্তু পরের গল্প ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’তেই রানা তাকে হারিয়ে ফেলে। রেবেকার সঙ্গে রানার বিয়ের আয়োজন চলছিল। কিন্তু দাতাকুর একের পর এক আক্রমণে রেবেকা হারিয়ে যায় রানার জীবন থেকে।
সোহানা চৌধুরী
রহস্য রেখে বলা যায়, সিরিজে সোহানার আগমন নীল আতঙ্কে, অভিযান গুপ্তচক্রে আর সর্বনাশ পিশাচ দ্বীপে! বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের আরেকজন তুখোড় এজেন্ট সে। রানা-সোহানার সম্পর্কটা সিরিজে একধরনের অসম্পূর্ণ অথচ গভীর টানাপড়েনের গল্প। পেশাগত নৈকট্য আর বিপজ্জনক জীবনের কারণে তাদের ভালোবাসা কখনোই পুরোপুরি স্বস্তির জায়গায় পৌঁছাতে পারে না। তবুও দুজনের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস, নির্ভরতা আর এক অদ্ভুত বোঝাপড়া সবসময় কাজ করে। সোহানার দৃঢ়তা আর রানার কঠোরতার ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোমল দিক— এ দ্বন্দ্ব থেকেই তাদের রোমান্সের আলাদা মাত্রা তৈরি হয়েছে। সোহানা কখনোই রানাকে বাঁধতে চায় না। বিষয়টা বিস্তারিত উঠে এসেছে ‘পালাবে কোথায়’-এ।
‘... সোহানাকে সে ভালোবাসে, তাতে কোনো খাদ নেই; কিন্তু সেই সঙ্গে এ-ও জানে, বিবাহিত জীবনে সোহানাকে সুখী করতে পারবে না সে। ... সোহানা ওর জীবনের অর্ধেকেরও বেশি।’ কিংবা সোহানা যখন বলে, ‘... রানাকে ভালোবাসি; কিন্তু সেই ভালোবাসার দাবি নিয়ে ওর সর্বনাশ করার কোনো অধিকার আমার নেই। ... ওকে ভালোবাসতে পেরে আমি ধন্য হয়ে গেছি।’








