সূর্যঘড়িতে স্কুলের পাঠদান

সন্তোষ জাহ্নবী উচ্চ বিদ্যালয়ের সূর্যঘড়ি
ঘড়ির কাঁটা নয়, রোদ আর ছায়ার হিসাব কষেই চলে টাঙ্গাইলের একটি পুরো স্কুলের সব কার্যক্রম। লিখেছেন আবু জুবায়ের উজ্জল
গল্পটা ১৮৭০ সালের। তখন টাঙ্গাইল ছিল বিশাল ময়মনসিংহ বিভাগের অংশ। এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে জমিদার শ্রীমতী জাহ্নবী চৌধুরানী প্রতিষ্ঠা করেন সন্তোষ জাহ্নবী উচ্চবিদ্যালয়। মাত্র ৯ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল জাহ্নবী চৌধুরানীর। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, ১৩ বছর বয়সেই তিনি স্বামী হারান। জীবনের এই গভীর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি জমিদারির পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। এলাকার দরিদ্র ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা এবং শিক্ষক-কর্মচারীর জন্য সম্মানী ও ভাতা দিতেন তিনি। সে সময় কলকাতায় ৪০ হাজার টাকা খরচ করে বিদ্যালয়টির জন্য নানা সরঞ্জাম কিনে এনেছিলেন এই বিদুষী নারী। সে যুগে ময়মনসিংহ বিভাগে দ্বিতীয় ইংলিশ ভার্সন স্কুল হিসেবে ইতিহাস গড়েছিল এটি।
স্কুলে প্রবেশ করলেই যে কারও চোখ কপালে উঠবে। ২২ ইঞ্চি পুরু দেয়াল আর ২২ ফুট উঁচু ব্রিটিশ স্থাপত্যের এই ভবনে কোনো জানালা নেই! কেন?
সেই যুগে বিদ্যুৎ ছিল না। শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশের জন্য অভিনব কায়দায় তৈরি করা হয়েছিল ১০টি কক্ষ। তাতে মোট দরজার সংখ্যা ঠিক ১০১! বিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর প্রাচীন সূর্যঘড়ি। স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক পি সি সেন সে সময় বিদ্যালয়ের সময় নির্ধারণের জন্য এই ঘড়ি স্থাপন করেছিলেন।
পিয়ন আরিফ খান হাসিমুখে স্মৃতিচারণ করেন, শুরুতে এই ঘড়ি দেখে বেল বাজানো তার জন্য ভীষণ কঠিন ছিল। পরে স্কুলের অরুণ স্যার তাকে সেকেন্ড, মিনিট আর ঘণ্টার হিসাব বুঝিয়ে দেন। আরিফ খানের মতে, এখন আর কোনো হাতঘড়ির প্রয়োজন হয় না। সূর্য আকাশের যেদিকে থাকে, স্তম্ভের ছায়া ঠিক তার বিপরীত দিকে পড়ে। আর সেই ছায়ার দৈর্ঘ্য ও রোমান সংখ্যায় চিহ্নিত ঘরগুলো দেখে নিখুঁতভাবে সময় মাপা হয়। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নিখুঁতভাবে এই সূর্যঘড়ির আলো-ছায়ার খেলায় চলে ক্লাস, টিফিন ও ছুটির ঘণ্টা।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাইদা তাসনিম জানায়, তাদের স্কুলের সিনিয়র শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা নতুনদের পরম যত্নে এই সূর্যঘড়ির ভাষা শিখিয়ে দেন।
প্রধান শিক্ষক মো. চান মিয়া আক্ষেপ করে বললেন, ‘আমাদের ঐতিহ্য এই সূর্যঘড়ি আর ১০১ দরজার ভবনটি আজ বড় জরাজীর্ণ। আমরা সংস্কারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।’
ডিজিটাল যুগে এসেও রোদ আর ছায়ার মিতালিতে চলা এই স্কুলের পাঠদান ও ভবনটি দেখতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন টাঙ্গাইলের সন্তোষ থেকে।



