বৃক্ষ পুরাণ
রেইনট্রির বয়স ২৫০!

ছবি: আগামীর সময়
ফেনী শহরের দক্ষিণে দাউদপুর পুলের কাছে ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরাতন গ্র্যান্ড ট্রাংক রোডের পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন এক রেইনট্রি গাছ। স্থানীয় কেউ একে বলেন মেঘ শিরীষ, কেউ রেন্ডি কড়ই, আবার কেউ বোট কড়ই। এই গাছের বয়স ও ইতিহাস নিয়ে রয়েছে নানা জনশ্রুতি। কারও মতে, এটি চারশ বছরের পুরনো; আবার কারও মতে, আড়াইশ বছর ধরে এটি সড়কে চলাচলকারী ক্লান্ত পথিকদের ছায়া দিয়ে আসছে। ফেনী শহরের গোড়াপত্তন থেকে শুরু করে এর বিকাশ ও নির্মাণ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে এই গাছটিকে বাদ দিয়ে যেন শহরটির ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়। একাধিক ঐতিহাসিক ও গবেষণা গ্রন্থেও এই প্রাচীন বৃক্ষটির কথা এসেছে।
ফেনীর প্রয়াত লেখক ও গবেষক কাজী মোজাম্মেল হক তার ‘ফেনীর স্থপতি নবীন চন্দ্র সেন’ গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ফেনীর প্রাচীন ব্যক্তিদের মতে এই মেঘ শিরীষ গাছের বয়স হবে তিনশ থেকে সাড়ে তিনশ বছর। ১৫৪০-১৫৪৫ সালে শেরশাহ গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড নির্মাণ করার সময় সড়কের পাশে চলাচলরত পথিকের ক্লান্তি দূর করতে এবং ছায়া দিতে এসব গাছ রোপণ করা হয়েছিল বলেও জনশ্রুতি আছে। বেশিরভাগ গাছ মারা গেলেও কালের বিবর্তনে এটি আজও টিকে রয়েছে। বিখ্যাত কবি নবীন চন্দ্র সেন ফেনীতে অবস্থানকালে (১৮৭৬-১৮৮৪) এই গাছের নিচে বসেই লেখালেখি করতেন। কবির আত্মজীবনী ‘আমার জীবন’ এবং কবি ও গবেষক শাবিহ মাহমুদ সম্পাদিত ‘নবীন চন্দ্র সেন: চিন্তা ও দর্শন’ গ্রন্থে এই বৃক্ষতলার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। সেকালে আদালতগামী সাধারণ মানুষকে উকিল ধরাতে সাহায্য করার জন্য এই গাছের নিচে একদল দালাল বা ‘টন্নী’র দপ্তর বসত। গ্রাম থেকে মামলা করতে আসা মানুষরা এই বৃক্ষতলায় দাঁড়িয়ে দালালের মাধ্যমে উকিলের কাছে যেত।
ফেনী সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের গবেষণা বলছে, মেঘ শিরীষ আমাদের দেশীয় উদ্ভিদ নয়; এর আদি নিবাস মেক্সিকো ও ব্রাজিল। ধারণা করা হয়, পনেরো শতকের পর পর্তুগিজদের হাত ধরে এই বৃক্ষ ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে। আকাশে মেঘ জমতে শুরু করলেই এই বৃক্ষ তার পাতাগুলো গুটিয়ে ফেলে এবং বৃষ্টির আভাস দেয়। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় এই রেইনট্রি গাছ ‘পুকুল লিমা’ নামে পরিচিত, যার অর্থ পাঁচ ঘটিকা। এককালে প্রায় দুই কোটি মানুষ সূর্য ডোবার আগে ও পরে এই গাছের পাতা মুড়ে যাওয়া দেখে সময় অনুমান করত। মেঘ শিরীষের পাতা শুধু বিকাল ৫টার সময় নয়; আকাশে মেঘ জমলেও মুড়ে যায়, যাতে গাছের নিচে বেশি পরিমাণ বৃষ্টির পানি পড়তে পারে।
এই গাছে ‘স্যাকেইডা’ নামক একধরনের ঝিঁঝি পোকা বাস করে, যা অন্যান্য ঝিঁঝির মতো ডানায় ডানা ঘষে নয়; বরং অত্যন্ত তীব্র ঘুঙুরধর্মী ডাক তৈরি করে। প্রজননের পর স্ত্রী-স্যাকেইডা গাছের ডালে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা হওয়ার পর পোকাটি মাটিতে পড়ে এবং দ্রুত মাটি খুঁড়ে ৩ থেকে ৪ ফুট গভীরে চলে যায়। সেখানে গাছের শিকড় থেকে অবিরাম রস খেয়ে তারা ১৩ থেকে ১৭ বছর কাটায়। মেয়াদ শেষে বাইরে এসে গাছে চড়ে বাকি জীবনের জন্য রস খাওয়ার সময় তারা প্রয়োজনীয় প্রোটিনটুকু রেখে বাকি সুগারটুকু বের করে দেয়। এই দেহনিঃসৃত বর্জ্য যখন মাটিতে পড়ে, তখন অবিকল বৃষ্টির ফোঁটা বলে মনে হয়, আর সে কারণেও এর নাম হতে পারে রেইনট্রি।
২০২২ সালে ফেনী সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের পরিমাপে গাছটির ব্যাসার্ধ পাওয়া যায় প্রায় ৭ দশমিক ৩ মিটার।
প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই হাজার হাজার পাখির কলকাকলিতে গাছটি মুখর হয়ে ওঠে, যা প্রমাণ করে এর সঙ্গে পুরো ইকোসিস্টেমের বহু প্রাণ জড়িয়ে আছে।



