রালাইপাড়ার জুমে ধান কাটার উৎসবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পাহাড়ে এখন সাজসাজ রব। সময়টা যে জুমের ফসল ঘরে তোলার। এক শরতে এমনই এক জুমের ধান কাটা ও মাড়াইয়ে ম্রোদের সঙ্গী হয়েছিলেন তৌহিদ জসি
প্রথম দিন
শরতের পাহাড় সেজেছে নানা রঙে। দূরে তাকালে দেখা যায় সোনালি পাকা ধান। পুরো পাহাড়ের কোথাও সবুজ, কোথাও হলুদ। এখন জুমিয়াদের সবচেয়ে ব্যস্ততম সময়।
বাস থেকে নেমে বাইকে চলে গেলাম কুরুকপাতা বাজারে। তারপর মাতামুহুরী নদী ধরে নৌকায় কিছুদূর গিয়ে হাঁটা শুরু করলাম পাহাড়ি পথ ধরে। গন্তব্য রালাইপাড়া। সেখানে ম্রোদের বাস। অনেকটা চড়াই পেরিয়ে সমান রিজ লাইন। এই চূড়ায় বেশ জুম হয়েছে। জুমের পাকা ধান শারদীয় বাতাসে দোল খাচ্ছে। যতদূর চোখ যাচ্ছে, চূড়ায় চূড়ায় সাজানো ছোট্ট জুমের খেলনাঘর। সূর্যের আলো পড়ে পাকা ধানের সোনালি রঙ চকচক করছে।
জুমে একসঙ্গে দু-তিন রকমের ধান আবাদ হয়ে থাকে। সাধারণ খাওয়ার ধান। উৎসবের জন্য বিন্নি ধান। সেটিও আবার তিন রকমের— কালো বিন্নি, লাল বিন্নি আর সাদা বিন্নি
এই দৃশ্য দেখতে দেখতে রিজের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেলাম। এখানে সুন্দর একটা বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা রয়েছে। নেটওয়ার্কও পাওয়া যায়। আগামী কয়েক দিন নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে না বলে প্রয়োজনীয় কথা সেরে ফেললাম। এবার এখান থেকে নামার পালা। রাস্তাটি বিপজ্জনক। অসাবধানতাবশত একটু পা হড়কালেই খাদে। সাবধানে এক পা, দুই পা করে নেমে পৌঁছে গেলাম আমার কাঙ্ক্ষিত রালাইপাড়ায়।
পাড়ায় পৌঁছেই সোজা ঝিরিতে গিয়ে গোসল সেরে ঘরে এসে রান্নার আয়োজন শুরু করে দিলাম। আজ খুব ক্লান্ত।
দ্বিতীয় দিন
মোরগ ডাকার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম থেকে উঠে ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে প্রস্তুত হয়ে গেলাম রওনা দেওয়ার জন্য। জুমটা পাড়া থেকে কিছুটা দূরে তাই পরিবারের এক অংশ আগে থেকেই ওখানে থাকা শুরু করেছে। সকালের খাবার খেয়ে আমি আর পারিং (চাচা বলে ডাকি) যাত্রা শুরু করলাম জুমের পানে। ঝিরির পিছল পাথর পাড়ি দিয়ে প্রথমে একটা সরু পাহাড়ি পথ ধরে উপরে উঠলাম। পুরোটা পথ বাঁশের জঙ্গল। জঙ্গল পেরোতেই জুমের শুরু, এক জায়গায় তিনটি জুম। সবকটিই রালাইপাড়ার। এর মধ্যে সবচেয়ে ওপরের জুমটা চাচা পারিং-এর। আমার থাকা হবে ওই জুমটাতে।
জুমটা ওপরে হওয়ায় চারপাশে মোটামুটি খোলা। দূর থেকে সব পাহাড় সারি দেখা যাচ্ছে, এক পাশে চিম্বুকের রুংরাং পাহাড় আর পশ্চিমে দূরে দেখা যাচ্ছে মিরিঞ্জার বুশি তং। জুমে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে একপশলা বৃষ্টি আমাদের ভিজিয়ে দিয়ে গেল। জুমের ধান মোটামুটি পেকে গেছে। কাল থেকে ধান কাটা শুরু হবে। পাহাড়ে জুমে কারও যদি মানুষ কম থাকে, তখন এক পরিবার অন্য পরিবারকে ধান কাটা ও মাড়াইতে সাহায্য করে।
কাঁচিগুলো শান দেওয়া হয়ে গেছে। থ্রোং বা ঝুড়িগুলোও মেরামত করা শেষ। ধান কেটে শুকানোর জন্য রাখার জায়গা ও পাটি দিয়ে মোড়া হয়ে গেছে।
জুমে একসঙ্গে অনেক রকমের ফসল ফলানো হয়। জুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফসল ধান। এই ধান দিয়েই তাদের পরের জুমের আগ পর্যন্ত খাবারের জোগান করতে হয়। তাই ধান কাটার সময়টা পাহাড়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জুমে একসঙ্গে দু-তিন রকমের ধান আবাদ হয়ে থাকে। সাধারণ খাওয়ার ধান। উৎসবের জন্য বিন্নি ধান। সেটিও আবার তিন রকমের— কালো বিন্নি, লাল বিন্নি আর সাদা বিন্নি। এ ছাড়া মারফা, আদা, হলুদ, মরিচ, মিষ্টিকুমড়া, তিল, ভুট্টা, তুলা এবং শিম, শসা, করলার মতো নানা শাকসবজি ও মসলা আবাদ হয়।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে পাটাতনে শুয়ে শুয়ে তারা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
তৃতীয় দিন
সকাল থেকেই শুরু হয়ে গেছে ধান কাটার তোড়জোড়। পাড়া থেকে প্রতিবেশীরাও চলে এসেছে জুমে। কাস্তে থ্রোং নিয়ে প্রস্তুত ধান কাটার জন্য। আমিও হাত লাগালাম এ কাজে। পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে ধান কাটা ব্যাপারটি অনেক কষ্টসাধ্য। সবার সঙ্গে লাইনে কোনোরকমে পায়ের বুড়ো আঙুলের ওপর ভর দিয়ে ঝুলে আছি পাহাড়ের ঢালে। ধানের গোছের শীষ কাস্তে দিয়ে কেটে জমা করছি থ্রোঙে। এখানে একজন আছে ধান বহন করার জন্য। যখন ধান জমা হয়ে যাচ্ছে, পারিং চাচা এসে আরেকটি থ্রোং এনে সেই ধানগুলো নিয়ে যাচ্ছে জুমঘরে। সেখানে এই ধান সাজিয়ে রাখা হবে কয়েক দিন শুকানোর জন্য। দুপুরের খাবার সেরে বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলল ধান কাটা। ধান কাটার ফাঁকে ফাঁকে সিদ্ধ ভুট্টা দিয়ে হালকা নাশতা।
ধান মাড়াই
তিন দিন পর ধান মাড়াই করা শুরু হবে। তাই পারিং চাচা ধান রাখার অংশটা বাঁশ দিয়ে তৈরি করে নিচ্ছে। জুমঘরের একেবারে মাঝের অংশে বাঁশ কেটে একটার পরে একটা সাজিয়ে তৈরি করা হয় এই ধানের গোলা। অন্যদিকে, বাকিরা ব্যস্ত ধান কাটায়। এদিকে, চুলায় ভুট্টা দিয়ে পোড়ানোয় ব্যস্ত আমি। আজ প্রচণ্ড গরম, তাই ধান কাটতে যাইনি।
লাইন দিয়ে সবাই একতালে ধান কাটছে। দেখার মতো এক দৃশ্য
বসে বসে দেখছি তাদের ধান কাটা। লাইন দিয়ে সবাই একতালে ধান কাটছে। দেখার মতো এক দৃশ্য।
পাহাড়ে ধান মাড়াই একেবারে সনাতন। এখানে আধুনিক যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ নেই। সাধারণত পা দিয়েই ধান মাড়াই হয়।
আগামীকাল ধান মাড়াই হবে। তার আয়োজন চলছে। ধান মাড়াই এখানে একধরনের উৎসব। দেবতার প্রতি মুরগি বিসর্জন দিয়ে সেই মুরগি লবণ ও কোনো প্রকার মসলা ছাড়া জুমের কুমড়ো-লতা দিয়ে রান্না করে খেয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা।
প্রথমে ঘরের মধ্যে পা দিয়ে মাড়িয়ে মাড়িয়ে ধানগুলো আলাদা করা হয় শীষ থেকে। দ্বিতীয় ধাপে আবার পা দিয়ে জোরে প্রেশার দিয়ে বাকি ধানগুলো ছাড়িয়ে খড় ফেলা হয় জুমের মাচার পাশে। নারীরা ব্যস্ত থাকে খড়গুলো চালন দিয়ে উড়িয়ে ধান পরিষ্কার করতে। সারা দিন ধরে চলে এই কাজ। যারা ধান মাড়াইতে অংশ নেয়, তাদের সবাইকে জুম মালিক রাতে মুরগি রান্না করে ভাত খাওয়ায়। এভাবেই জুমের ধান মাড়াই প্রক্রিয়া শেষ হয়।
আমিও অংশ নিলাম মাড়াইয়ে। ওজন বেশি হওয়ায় এ কাজে আমার বেশি একটা বেগ পেতে হয়নি। ধান মাড়াই শেষে শুরু হয় ফিরে আসার পালা। মেঘ-বৃষ্টির লুকোচুরিতে কীভাবে এতগুলো দিন কেটে গেছে, টের পাইনি। চমৎকার কিছু সময় আর অনেক অনেক অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করে ফিরে চললাম জনারন্যে।






