পাহাড়ে আলো ছড়ানো পাঠাগার

পাঠাগারের বাইরে বই পড়ায় ব্যস্ত সদস্যরা (বামে) এবং পাঠাগারের উদ্যোগে লজ্জাবতী বানর সংরক্ষণে সচেতনতা কর্মসূচি
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় গড়ে ওঠা পিটাছড়া পাঠাগারকে সাধারণ আট-দশটি লাইব্রেরি বা পাঠাগারের সঙ্গে এককাতারে ফেলার সুযোগ নেই। কেন? সেই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন ইশতিয়াক হাসান
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাবেন পূর্ব খেদাছড়ায়। ছোট-বড় সবুজ টিলা, বন ও কলকল শব্দে বয়ে চলা ছড়ায় ঘেরা এই দুর্গম জনপদে গড়ে উঠেছে পিটাছড়া পাঠাগার।
এই দুর্গম এলাকায় বাস করা স্থানীয় বাঙালি ও বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর শিশু-কিশোরদের জন্য বই পড়ার এ সুযোগ তৈরি করাটা কম নয়। তবে এর উদ্দেশ্য শুধু পাঠ্যাভ্যাস তৈরিও নয়। ২০২১ সালের নভেম্বরে পিটাছড়া পাঠাগারের যাত্রা শুরুর পর থেকেই প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে।
এখানে শিশুরা বই পড়ার পাশাপাশি সরাসরি বন, পাখি, বন্যপ্রাণী ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার দুর্লভ সুযোগ পায়। মূলত পিটাছড়া পাঠাগার পিটাছড়া বন রক্ষায় মাহফুজ রাসেলের মূল প্রচেষ্টার একটি অংশ। দীর্ঘদিন বিদেশে কাটানোর পর দেশে এসে পিটাছড়ায় থিতু হয়ে এখনকার হারানো বন ফিরিয়ে আনায় কাজ শুরু করেন রাসেল। তিনি এবং তার বন্ধুরা মিলে ‘পিটাছড়া বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ইনিশিয়েটিভ’ নামক একটি উদ্যোগে নিজেদের মালিকানাধীন ৭৫ একর বনভূমি সংরক্ষণ করছেন। পিটাছড়া ফাউন্ডেশনের অধীনে সব ধরনের কাজ করা হচ্ছে। প্রকৃতি রক্ষার এ উদ্যোগের অংশ হিসেবেই জন্ম নেয় এই ব্যতিক্রমী পাঠাগার। পাঠাগারের এ যাত্রার পেছনে দুজন মানুষের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়, যাদের একজন মো. জাহেদুল আলম এবং অন্যজন সৌরভ বড়ুয়া। দুজনেই চট্টগ্রামে পাঠাগার গড়ে তুলেছেন এর আগে। এ কারণে পিটাছড়া পাঠাগার স্থাপনে তাদের আন্তরিক পরিশ্রম বড় ভূমিকা রাখে।
জাহেদুল আলম বলেন, ‘পাঠাগারের মাধ্যমে নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করতে চেয়েছি আমরা। বিভিন্ন পাড়ায় গিয়ে বাচ্চাদের উৎসাহ দিয়েছি শুরুতে। আমাদের সৌভাগ্য, কিছু স্থানীয় চাকমা, বাঙালি, ত্রিপুরা ও মারমা ভলান্টিয়ার তৈরি করতে পেরেছি। এখন ওরাই পাঠাগারের অনেক দায়িত্ব পালন করছে।’
পিটাছড়া পাঠাগারের সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে এমনই একজন কাঞ্চনমালা ত্রিপুরা। তিনি বললেন, শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত শিশুরা পাঠাগারে বসে বই পড়ার পাশাপাশি একত্রে আনন্দঘন সময় কাটায়। বাড়িতেও বই নিয়ে যেতে পারে। বড়রাও চাইলে এর সদস্য হতে পারেন।
কাঞ্চনমালা ত্রিপুরা জানান, প্রতি শুক্রবার এখানে গান-বাজনা ও খেলাধুলার পাশাপাশি প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে মুক্ত আলোচনা হয়। আগে শিশুদের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি এমন অনুরাগ দেখা না গেলেও এখনকার নিয়মিত এসব কার্যক্রমের ফলে তারা প্রকৃতিকে গভীরভাবে ভালোবাসতে শিখছে।
মাহফুজ রাসেল জানান, বছর জুড়ে পিটাছড়া পাঠাগার শিশু-কিশোরদের জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের পসরা সাজিয়ে বসে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়মিত বই পাঠ ও পাঠচক্র; বন, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যবিষয়ক বিশেষ শিক্ষা; ছবি আঁকা, গান, আবৃত্তি, নাটক ও নানা সাংস্কৃতিক চর্চা এবং বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি চর্চা।
বর্তমানে পিটাছড়া পাঠাগারের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩০০। সদস্যদের অধিকাংশই স্থানীয় শিশু-কিশোর ও কিশোরী। এই পাঠাগারের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো বাঙালি, ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরা সমানভাবে অংশ নেয়।
বর্তমানে এই পাঠাগারে বইয়ের সংখ্যা এক হাজারের বেশি। এর মধ্যে ছোটদের নানান বই, উপন্যাস, কবিতা, জীবনী, ইতিহাস, বিজ্ঞান, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি এবং প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যবিষয়ক বইগুলো উল্লেখযোগ্য।
পিটাছড়া ক্লিনিক ভবনের একটা অংশ ব্যবহৃত হয় পাঠাগার হিসেবে। অর্থের জোগান প্রসঙ্গে জানা যায়, এখানকার বয়স্ক অবস্থাপন্ন সদস্য ও ভলান্টিয়াররা নিয়মিত চাঁদা দেন, বড় কোনো অনুষ্ঠানের সময় বিভিন্ন ডোনার বা দাতা ব্যক্তিরা অর্থ সহায়তা দেন আর পিটাছড়া ট্রাস্টের পক্ষ থেকেও নিয়মিত আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রতিষ্ঠাতা মাহফুজ রাসেল জানান, স্থানীয় ইতিহাস ও বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা, ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা এবং পাঠাগারটিকে পাহাড়ি অঞ্চলের একটি অন্যতম কার্যকর প্রকৃতি ও সংস্কৃতি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
পিটাছড়া পাঠাগারে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। সোলার এখানে ভরসা। তবে প্রকৃতি, মানুষ আর জ্ঞানের এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করে পিটাছড়া পাঠাগার আজ খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার খেদাছড়ায় যে অন্যরকম আলো ছড়াচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে আগামী দিনের এক আলোকিত ও সম্প্রীতিময় সমাজ গড়তে সাহায্য করবে।




