তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক বাড়ছে কেন, প্রতিকার কী

মডেল: নিহাল, ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
একসময় যে রোগকে শুধুই বয়স্কদের রোগ হিসেবে ভাবা হতো, সেই হৃদরোগ এখন চোখ রাঙাচ্ছে তরুণদের। তরুণদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ও এর প্রতিকার নিয়ে লিখেছেন ডা. আশরাফুল আলম সুমন
মাত্র ৩৪ বছর বয়স। ধূমপানের অভ্যাস নেই, আগে থেকে উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসও ধরা পড়েনি, ছিল না অতিরিক্ত কোলেস্টেরেলও। ছয় মাস আগেই করা হয়েছিল ফুল বডি চেকআপ। তাতেও ধরা পড়েনি কোনো সমস্যা। একদিন হঠাৎ বুকে চাপ অনুভব, শ্বাসকষ্ট ও অতিরিক্ত ঘাম নিয়ে হাসপাতালে যেতে হয় সোহেলকে (ছদ্মনাম)। পরীক্ষায় দেখা যায়, হৃৎপিণ্ডে রক্ত সরবরাহকারী মূল ধমনিতে শতভাগ ও লেফট অ্যান্টেরিয়র ডিসেন্ডিংয়ে প্রায় ৭০ ভাগ বন্ধ হয়ে গেছে। পরে তার দুটো ধমনিতেই স্টেন্ট বসানো হয়।
সোহেলের মতো হাজারো তরুণ আজ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। অথচ একসময় হৃদরোগকে মনে করা হতো শুধু বয়স্কদের রোগ। আজ সেই চিত্র পাল্টে গেছে। ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা এখন এক অশনিসংকেত।
হার্ট অ্যাটাক কী?
আমাদের হৃৎপিণ্ডের পেশিগুলো সারাক্ষণ রক্ত পাম্প করে শরীরকে সচল রাখে। এই কাজ করার জন্য হৃৎপিণ্ডের নিজেরও অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়, যা ধমনির মাধ্যমে রক্ত থেকে আসে। কোনো কারণে যদি এই ধমনিগুলোতে চর্বি বা প্লাক জমে রক্ত চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে হৃৎপিণ্ডের সেই পেশিগুলো অক্সিজেন না পেয়ে মরে যেতে শুরু করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এ অবস্থাকেই বলে ‘মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন’ (Myocardial Infarction) বা হার্ট অ্যাটাক।
তরুণদের ঝুঁকি কেন বাড়ছে?
তরুণ প্রজন্মের আধুনিক জীবনযাত্রার নেতিবাচক দিকগুলোই এই বিপদের মূল কারণ। মূলত নিচের বিষয়গুলোই তাদের হৃৎপিণ্ডকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
শারীরিক অলসতা: ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা, কায়িক শ্রম না করা এবং দীর্ঘক্ষণ চেয়ারে বসে কাজের অভ্যাসের ফলে শরীরে মেদ ও চর্বি জমছে, যা হার্টের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার: অতিরিক্ত তেল, ভাজাপোড়া, চিনি এবং ট্রান্সফ্যাট সমৃদ্ধ আলট্রা-প্রসেসড খাবার, যেমন— পিৎজা, কোল্ড ড্রিংকস বা প্যাকেটজাত স্ন্যাকস খাওয়ার কারণে তরুণরা হৃদরোগের দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে।
অতিরিক্ত মানসিক চাপ: ক্যারিয়ারের প্রতিযোগিতা, পড়াশোনার চাপ বা পারিবারিক উদ্বেগের কারণে তরুণরা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা ও উদ্বেগে ভোগেন। এই মানসিক চাপ রক্তচাপ বাড়িয়ে দিয়ে হার্টের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে।
ধূমপান ও মাদক: তামাক, ই-সিগারেট বা ভেপিং ধমনিকে সংকুচিত করে। এ ছাড়া কোকেন বা অ্যাম্ফিটামিনের মতো মাদক রক্তনালিতে তীব্র খিঁচুনি ও রক্ত জমাট বাঁধিয়ে তরুণদের তাৎক্ষণিক হার্ট অ্যাটাকের কারণ হচ্ছে।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ: অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ফলে খুব অল্প বয়সে অনেকের শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, রক্তে উচ্চ শর্করা ও উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ছে, যা সরাসরি হার্টের গঠনগত ক্ষতি করছে।
জিনগত প্রভাব: পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে অল্প বয়সেই রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বেড়ে ধমনি ব্লক হতে পারে। এ ছাড়া কভিড-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক প্রদাহও হার্টের ক্ষতি করছে বলে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে।
লক্ষণ চেনা জরুরি
তরুণদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের সময় বুকে তীব্র ব্যথাই প্রধান লক্ষণ নয়। তাই নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত সতর্ক হতে হবে:
- বুকে তীব্র ব্যথা বা ভারী কিছু চেপে ধরে আছে এমন অনুভূতি;
- ব্যথা বুক থেকে বাম হাত, পিঠ, ঘাড়, চোয়াল কিংবা পেটের ওপরের দিকে ছড়িয়ে পড়া;
- কোনো কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত ঠান্ডা ঘাম হওয়া, সঙ্গে বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া;
- অল্পতেই প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হওয়া এবং মাথা ঘোরানো;
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা শরীরের জোর হারিয়ে ফেলা।
সতর্কবার্তা
বুকে কোনো অস্বস্তি বা ওপরে উল্লিখিত লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা করবেন না। লক্ষণগুলো ছোট মনে হলেও সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং ইসিজি করান। সচেতনতাই পারে আপনার হার্টকে দীর্ঘকাল সচল রাখতে।
প্রতিকার ও প্রতিরোধে করণীয়
লাইফস্টাইলে সামান্য পরিবর্তন এনে তরুণরা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারেন। যেমন-
খাদ্যাভ্যাস: প্রতিদিনের খাবারে প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল, ওটস ও লাল চালের ভাত রাখুন। ড্যাশ (DASH) বা মেডিটেরানিয়ান ডায়েট হার্টের জন্য দারুণ। ফাস্টফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত লবণ ও চিনি থেকে দূরে থাকুন।
শারীরিক ব্যায়াম: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি ধরনের ব্যায়াম করুন। দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা সাঁতার কাটা হার্টকে শক্তিশালী রাখে। একটানা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার অভ্যাস ত্যাগ করুন।
নেশা বর্জন: সব ধরনের ধূমপান, ভেপিং ও তামাকজাত পণ্য পুরোপুরি ত্যাগ করুন। মাদক ও অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা এনার্জি ড্রিংকস এড়িয়ে চলুন।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ: স্ট্রেস কমাতে পর্যাপ্ত ঘুমান, নিয়মিত যোগব্যায়াম বা মেডিটেশন করুন এবং মোবাইল বা কম্পিউটারের স্ক্রিন টাইম কমিয়ে শখের কাজে সময় দিন।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: ২০ বছর বয়সের পর থেকেই বছরে অন্তত একবার রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং লিপিড প্যানেল বা কোলেস্টেরল পরীক্ষা করান।
লেখক: এমবিবিএস, এমডি (কার্ডিওলজি), সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা।



