আন্তর্জাতিক সংক্রমণ প্রতিরোধ সপ্তাহ
সংক্রমণ প্রতিরোধে সচেতন হবেন কীভাবে

সংক্রমণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পানি, বাতাস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কর্মপরিবেশ ও মানুষের দৈনন্দিন আচরণ। সংক্রমণ প্রতিরোধে সচেতন থাকার নানান বিষয় নিয়ে লিখেছেন ডা. অমিত সিনহা
বাংলাদেশের একটি ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতাল। অথচ ডেঙ্গু ও হাম আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রতিদিন সেখানে ভর্তি থাকছেন ৮০০-এর বেশি রোগী। সীমিত জনবল নিয়ে রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা। এমন পরিস্থিতিতে একজন নার্স এক রোগীকে ইনজেকশন দিয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছেন পরের রোগীর কাছে। এত চাপের মধ্যে প্রতিবার রোগীকে সেবা দেওয়ার আগে হাত পরিষ্কার করার সুযোগ কি হচ্ছে? অথচ কয়েক সেকেন্ডের এ অভ্যাসই কখনো নির্ধারণ করে দিতে পারে একজন রোগীর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা।
সংক্রমণ শুধু জীবাণুর বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পানি, বাতাস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কর্মপরিবেশ ও মানুষের দৈনন্দিন আচরণ। প্রতি বছর অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে পালিত ‘আন্তর্জাতিক সংক্রমণ প্রতিরোধ সপ্তাহ’ আমাদের সেই জালের দিকে নতুন করে তাকাতে শেখায়।
হাসপাতালেই সংক্রমণের ঝুঁকি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি প্রতি ১০০ রোগীর মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে প্রায় সাতজন এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে প্রায় ১৫ জন স্বাস্থ্যসেবাসংশ্লিষ্ট সংক্রমণে আক্রান্ত হন। যথাযথ সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এসব সংক্রমণের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠার সংকট। ল্যানসেটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২১ সালে ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার কারণে বিশ্বে প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০২৫-৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখে পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, বিশ্বের প্রায় চারটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একটিতে মৌলিক পানির সুবিধা নেই। নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে সংক্রমণ প্রতিরোধের উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হয়।
যেসব সংক্রমণ প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি
শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ: সাধারণ সর্দি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, কভিড ১৯, নিউমোনিয়া ও যক্ষ্মার মতো রোগ শ্বাসতন্ত্রকে আক্রান্ত করতে পারে। কিছু রোগের জীবাণু বাতাসে ছড়ানো ক্ষুদ্র কণা বা আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণের মাধ্যমে ছড়ায়। ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা, কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখা, প্রয়োজন অনুযায়ী মাস্ক ব্যবহার এবং অসুস্থ অবস্থায় অন্যদের সংস্পর্শ কমানো ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। যক্ষ্মার লক্ষণ দেখা দিলে পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। ফ্লু, কভিড ১৯ ও নিউমোনিয়ার কিছু গুরুতর সংক্রমণ প্রতিরোধে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য টিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্য ও পানিবাহিত সংক্রমণ: ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, আমাশয় ও হেপাটাইটিস এ, দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়াতে পারে। নিরাপদ পানি পান করা, খাবার ভালোভাবে রান্না করা, ফলমূল ও শাকসবজি পরিষ্কার পানিতে ধোয়া এবং রান্না করা খাবার ঢেকে রাখা প্রয়োজন। খাবার তৈরি ও খাওয়ার আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস এসব রোগের ঝুঁকি কমায়। অনিরাপদ পানি ও অপরিচ্ছন্ন খাবার এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ।
মশা ও অন্যান্য বাহকবাহিত সংক্রমণ: ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ নির্দিষ্ট প্রজাতির মশার মাধ্যমে ছড়ায়। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে বাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানি অপসারণ, পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। মশারি, জানালার জাল, শরীর ঢাকা পোশাক ও উপযুক্ত মশা প্রতিরোধক ব্যবহারও সহায়ক। ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হয়।
সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রথম শর্ত হাতের পরিচ্ছন্নতা। রোগীকে স্পর্শ করার আগে ও পরে হাত পরিষ্কার করা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
রক্ত ও শরীরের তরলের মাধ্যমে ছড়ানো সংক্রমণ: হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি ও এইচআইভি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রক্ত বা শরীরের সংক্রমণবাহী তরলের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। একই সুচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহার, অনিরাপদ রক্ত গ্রহণ এবং জীবাণুমুক্ত নয় এমন চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। তাই নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, একবার ব্যবহারযোগ্য সুচের যথাযথ ব্যবহার, জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি এবং নিরাপদ যৌন আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে টিকা কার্যকর।
যৌনবাহিত ও অন্যান্য সংক্রমণ: সিফিলিস, গনোরিয়া, ক্ল্যামাইডিয়া এবং এইচআইভির মতো সংক্রমণ প্রতিরোধে নিরাপদ যৌন আচরণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও সময়মতো চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ। ত্বক ও ক্ষতস্থানের সংক্রমণ ঠেকাতে ক্ষত পরিষ্কার রাখা, পরিষ্কার ব্যান্ডেজ ব্যবহার এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। হাম, হেপাটাইটিস বি, পোলিও ও টিটেনাসের মতো টিকাপ্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে সুরক্ষায় বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী টিকা নেওয়া জরুরি।
সংক্রমণ প্রতিরোধের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র
সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রথম শর্ত হাতের পরিচ্ছন্নতা। রোগীকে স্পর্শ করার আগে ও পরে হাত পরিষ্কার করা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনাও অবহেলা করা যাবে না। ব্যবহৃত সুচ ও সিরিঞ্জ সাধারণ আবর্জনার সঙ্গে ফেললে পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ অন্যরা সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েন। তাই বর্জ্য আলাদা ও নিরাপদে নিষ্পত্তি করা জরুরি। স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী, হেপাটাইটিস বি টিকা, সুচ ফোটার দুর্ঘটনার পর দ্রুত ব্যবস্থা এবং মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি হাম, যক্ষ্মা ও ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো বায়ুবাহিত রোগের বিস্তার কমাতে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।
জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক নয়
জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ কেনা কিংবা নির্ধারিত কোর্স শেষ না করা বিপজ্জনক অভ্যাস। ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ, প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার কিংবা অন্যের ওষুধ খেলে জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়ে। ফলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও কঠিন হতে পারে। তাই চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করতে হবে এবং অবশিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক নিজে থেকে ব্যবহার করা যাবে না।
সমস্যাটি শুধু মানুষের শরীরে সীমাবদ্ধ নয়। হাসপাতাল, ওষুধ কারখানা, পশুখামার ও মাছ চাষ থেকে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ পরিবেশে মিশে জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ ধারণাই ‘ওয়ান হেলথ’ নামে পরিচিত।
দৈনন্দিন অভ্যাসেই প্রতিরোধের শুরু
খাওয়ার আগে, টয়লেট ব্যবহারের পরে ও বাইরে থেকে ফিরে সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়া, শিশুর নির্ধারিত টিকা নিশ্চিত করা এবং বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি সপ্তাহে অন্তত একবার অপসারণ করা জরুরি। ঘুমানোর সময় মশারি বা উপযুক্ত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করতে হবে। কাশি ও হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা, নিরাপদ পানি পান করা এবং খাবার ঢেকে রাখার অভ্যাসও সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়।
নীতিনির্ধারকদের টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, মশক নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি ফার্মেসি মালিক, শিক্ষক, গণমাধ্যম এবং জনপ্রতিনিধিদেরও সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখতে হবে।
লেখক: এমবিবিএস, এমপিএইচ, বিসিএস (স্বাস্থ্য), মেডিকেল অফিসার সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতাল, সুনামগঞ্জ



