শ্বাসতন্ত্রের সেবা সপ্তাহ
ফুসফুসের সুস্থতায় যে সতর্কতা জরুরি

ছবি: এআই
শরীর সচল রাখতে ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন সুস্থ ফুসফুস। অথচ বায়ুদূষণ, ধূমপান, বিভিন্ন জীবাণুর সংক্রমণ এবং অসচেতন জীবনযাপনের কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে শ্বাসতন্ত্র তথা ফুসফুসের নানা রোগ।
প্রতি বছর অক্টোবর মাসের শেষ পূর্ণ সপ্তাহে পালিত হয় শ্বাসতন্ত্রের সেবা সপ্তাহ (রেসপিরেটরি কেয়ার উইক)। এ সপ্তাহে শ্বাসতন্ত্রের চিকিৎসা ও সেবায় নিয়োজিত পেশাজীবীদের ভূমিকা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে শ্বাসকষ্টের কারণ, ফুসফুসের যত্ন এবং উন্নত শ্বাসতন্ত্রের সেবা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কেন বাড়ছে শ্বাসতন্ত্রের রোগ?
বর্তমানে বাংলাদেশে তথা বিশ্বে শ্বাসতন্ত্রের রোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বায়ুদূষণ। যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা, নির্মাণকাজের ধুলাবালি, শিল্পকারখানার নির্গমন, এমনকি ঘরের ভেতরের ধোঁয়া, যেমন— মশার কয়েল, রান্নার ধোঁয়া ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর।
বিশেষত ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপান ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে। তামাকের পাশাপাশি ভেপিং বা ই-সিগারেটকেও নিরাপদ বিকল্প মনে করা উচিত নয়। অন্যদিকে, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ, অনিয়ন্ত্রিত অ্যালার্জি, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং স্থূলতা শ্বাসতন্ত্রের রোগের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
যেসব শ্বাসতন্ত্রের রোগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন
হাঁপানি বা অ্যাজমা: বারবার শ্বাসকষ্ট, বুক চেপে আসা, কাশি এবং শ্বাসের সঙ্গে বাঁশির মতো শব্দ হাঁপানির লক্ষণ হতে পারে। ধুলাবালি, ধোঁয়া, অ্যালার্জি কিংবা ঠান্ডা বাতাসে উপসর্গ বাড়তে পারে। বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞের সঠিক চিকিৎসা ও তত্ত্বাবধানে কিছু পরামর্শ ও নিয়মিত স্টেরয়েড জাতীয় ইনহেলার ব্যবহারের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা, নির্মাণকাজের ধুলাবালি, মশার কয়েল, রান্নার ধোঁয়া ইত্যাদি ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর
সিওপিডি (COPD): দীর্ঘদিনের ধূমপান, বায়ুদূষণ ও ক্ষতিকর ধুলাবালির সংস্পর্শে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী কাশি, কফ এবং ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা শ্বাসকষ্ট এ রোগের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে রোগের অগ্রগতি ও জটিলতা কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
নিউমোনিয়া ও যক্ষ্মা: জ্বর, কাশি, কফ, বুকব্যথা ও শ্বাসকষ্ট নিউমোনিয়ার লক্ষণ হতে পারে। অন্যদিকে, দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে কাশি, ওজন কমে যাওয়া, রাতে ঘাম হওয়া কিংবা কাশির সঙ্গে রক্ত আসা যক্ষ্মার সতর্কসংকেত।
এ ছাড়া ফুসফুসের ক্যানসার, ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজ, ব্রঙ্কিয়েকটেসিস, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার সমস্যা, নাক ডাকা এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ সম্পর্কেও সচেতন থাকা প্রয়োজন।
ফুসফুস সুস্থ রাখতে যা করবেন
ফুসফুস সুস্থ রাখার জন্য কিছু অভ্যাস দৈনন্দিন জীবনে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
· সিগারেট, বিড়ি, জর্দা-গুলসহ তামাকজাত পণ্য পরিহার করুন এবং অন্যের ধোঁয়া থেকেও দূরে থাকুন।
· অতিরিক্ত দূষণের সময় বাইরে অবস্থান ও ভারী ব্যায়াম সীমিত করুন। প্রয়োজন অনুযায়ী ভালো মানের উপযুক্ত মাস্ক ব্যবহার করুন। ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করুন।
· বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী হাঁটা, ব্যায়াম এবং সক্রিয় জীবনযাপন ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে।
· চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়ার অন্যান্য প্রাসঙ্গিক টিকা গ্রহণ করুন।
· হাঁপানি ও সিওপিডির রোগীরা চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে ওষুধ ব্যবহার করুন।
· দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা শ্বাসকষ্ট হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রয়োজন অনুযায়ী বুকের এক্স-রে কিংবা সিটি স্ক্যান, স্পাইরোমেট্রি কিংবা লাং ফাংশন টেস্ট ছাড়াও অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করতে পারে।
কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন?
তীব্র শ্বাসকষ্ট, কথা বলতে না পারা, ঠোঁট বা মুখ নীলচে হয়ে যাওয়া, তীব্র বুকব্যথা, জ্বর, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা বিভ্রান্তি, প্রচুর পরিমাণে কাশির সঙ্গে রক্ত আসা কিংবা হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হলে দেরি না করে জরুরি বিভাগে যেতে হবে। বিশেষত বৃদ্ধ বা শিশু অথবা দীর্ঘমেয়াদি রোগাক্রান্ত ব্যক্তি, হাঁপানি বা সিওপিডির রোগীর নির্ধারিত জরুরি ওষুধেও উপসর্গ না কমলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস, এমসিপিএস (মেডিসিন)
এমডি (রেসপিরেটরি মেডিসিন)
মেডিসিন ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ
সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা



