বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬
হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন হোক সুস্থ জীবনের অঙ্গীকার

প্রতিদিন আমাদের হৃদপিণ্ড বিরামহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটির যত্নের কথা আমরা অনেকেই ভাবি তখন, যখন বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো বিপদসংকেত দেখা দেয়।প্রতি বছর ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস পালিত হয় হৃদ্রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে। হৃদয়ের সতর্ক সংকেত যেমন অবহেলা করা যাবে না, তেমনি সুস্থ থাকার প্রতিদিনের সুযোগও হাতছাড়া করা উচিত নয়।
বিশ্বব্যাপী হৃদরোগ এখনো মৃত্যুর প্রধান কারণ। WHO-এর হিসাবে, বছরে প্রায় ১৯.৮ মিলিয়ন মানুষ হৃদরোগে মারা যায়। এর মধ্যে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের প্রবনতা সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক WHO তথ্য অনুযায়ী, হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ noncommunicable diseases বা NCD বর্তমানে দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী। অর্থাৎ সংক্রামক রোগের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ এখন অসংক্রামক রোগ।
বাংলাদেশে হৃদ্ ও রক্তনালির রোগ একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের আধিক্য, তামাক ব্যবহার, অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই হৃদ্রোগ শুধু বয়স্কদের সমস্যা—এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
নীরব ঝুঁকি চিনুন
উচ্চ রক্তচাপের বড় সমস্যা হলো, অনেকের কোনো লক্ষণ থাকে না। অথচ দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে এটি হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক, কিডনি ও রক্তনালির ক্ষতি করতে পারে। তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা জরুরি।
ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ
ডায়াবেটিস শুধু রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার সমস্যা নয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি হৃদ্ ও রক্তনালির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। রক্তে অতিরিক্ত ক্ষতিকর কোলেস্টেরলও কোনো উপসর্গ ছাড়াই ধমনির দেয়ালে জমে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত ওজন, কিডনি রোগ বা পরিবারে হৃদ্রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শে সামগ্রিক হৃদ্রোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ।
কোলেস্টেরল
রক্তে অতিরিক্ত LDL কোলেস্টেরল কোনো উপসর্গ ছাড়াই ধমনির দেয়ালে জমতে পারে। সময়ের সঙ্গে plaque তৈরি হয়ে রক্তনালি সরু হতে পারে। কোনো plaque ফেটে জমাট তৈরি হলে রক্তপ্রবাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে হার্ট এ্যটাক বা স্ট্রোক হতে পারে।
বুকে ব্যথা ‘গ্যাস’ভেবে উপেক্ষা নয়
বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব কিংবা ব্যথা বাহু, কাঁধ, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া—এসব হৃদ্রোগের বিপদসংকেত হতে পারে।
তামাক ছাড়ুন, লবণ কমান, সক্রিয় থাকুন
সিগারেট, বিড়ি ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্য হৃদ্ ও রক্তনালির ক্ষতি করে। পরোক্ষ ধূমপানও ক্ষতিকর। তাই তামাকমুক্ত জীবন নিজের পাশাপাশি পরিবারের হৃদ্স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ। খাবারে অতিরিক্ত লবণ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। রান্নার লবণের পাশাপাশি আচার, চানাচুর, চিপস, তাৎক্ষণিক নুডলস ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকেও অতিরিক্ত লবণ শরীরে প্রবেশ করে। খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, পূর্ণ শস্য ও মাছকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, পূর্ণ শস্য ও মাছকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
নিয়মিত হাঁটা ও শরীরচর্চাও হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাছের গন্তব্যে হেঁটে যাওয়া, সম্ভব হলে সিঁড়ি ব্যবহার এবং পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত হাঁটা—এমন ছোট অভ্যাসও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে লক্ষণ সব সময় একই রকম নাও হতে পারে। তাই সন্দেহজনক উপসর্গকে শুধু ‘গ্যাস’ বা ‘অ্যাসিডিটি’ ভেবে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
একইভাবে হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়া, হাত-পা দুর্বল বা অবশ হওয়া কিংবা কথা জড়িয়ে যাওয়া স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট মূল্যবান।
পরিবার থেকেই শুরু হোক পরিবর্তন
হৃদ্রোগ প্রতিরোধ শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসকের চেম্বারের বিষয় নয়। এর শুরু হতে পারে নিজের ঘর থেকেই।
পরিবারে খাবারের লবণ কমানো, তামাকমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা, নিয়মিত হাঁটা, শিশুদের খেলাধুলায় উৎসাহ দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তচাপ, রক্তের শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা—এসব ছোট উদ্যোগই ভবিষ্যতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
আজ থেকেই আমরা পাঁচটি অঙ্গীকার করি-
নিজের রক্তচাপ ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসূচক জানব
তামাক থেকে দূরে থাকব
নিয়মিত হাঁটব ও শরীরচর্চা করব
খাবারে অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমাব
হৃদরোগের সতর্ক সংকেত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেব
হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন আমাদের জীবনের একটি মূল্যবান মুহূর্ত। তাই নিজের হৃদয়ের যত্ন নিন, পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সচেতন করুন এবং সুস্থ জীবনযাপনকে পারিবারিক অভ্যাসে পরিণত করুন। Don’t Miss a Beat — একটি স্পন্দনও যেন হারিয়ে না যায়।
লেখক:
উপ-মহাব্যবস্থাপক, ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড



