ত্বকের যে অসুখ প্রভাব ফেলে মনে

ত্বক আমাদের শরীরের আয়না। যখন সেই আয়নায় খসখসে লালচে দাগ আর চুলকানির আস্তরণ পড়ে, তখন জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এমনই একটি দীর্ঘমেয়াদি চর্মরোগ হলো ‘সোরিয়াসিস’। এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। মূলত শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে সুস্থ ত্বকও আক্রান্ত হতে পারে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া, চামড়া মোটা হয়ে যাওয়া এবং অসহ্য চুলকানি এই রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
সোরিয়াসিস কেন হয়?
সোরিয়াসিস একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত চর্মরোগ। অতিরিক্ত মানসিক চাপ এই রোগের বড় একটি কারণ। এ ছাড়া শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ইনফেকশন, বিশেষ করে গলায় সংক্রমণ থাকলে সোরিয়াসিস মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। ত্বকের আঘাত বা অতিরিক্ত রোদে চামড়া পুড়ে যাওয়াও এই রোগকে ত্বরান্বিত করে। জীবনযাপন পদ্ধতির দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, ধূমপান, মদ্যপান ও অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা সোরিয়াসিসের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। এমনকি উচ্চ রক্তচাপ, ম্যালেরিয়া বা লিথিয়ামজাতীয় কিছু ওষুধের
সংক্রমণের স্থান
সোরিয়াসিস শরীরের যেকোনো স্থানে হতে পারে। তবে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় হাঁটু, কনুই ও মাথার ত্বকে (প্রায় ৬০-৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে)। এ ছাড়া বুক, পিঠ, হাত, পা, নখ, মুখ, কপাল এবং কান ছাড়াও শরীরের বিভিন্ন ভাঁজযুক্ত স্থানে, যেমন— বগল, কুঁচকি বা নারীদের স্তনের নিচেও এই রোগ দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসা পদ্ধতি
সোরিয়াসিসের স্থায়ী নিরাময় নিশ্চিত করার মতো চিকিৎসা এখনো নেই। তবে নিয়মিত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং নির্দেশনা মেনে চললে রোগটি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আক্রান্ত স্থানের পরিমাণ, রোগের তীব্রতা, চুলকানি এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়।
বাহ্যিক চিকিৎসা: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্টেরয়েড ক্রিম বা অয়েন্টমেন্ট, ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ ক্রিম এবং বিভিন্ন রেটিনয়েড ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে। মাথার ত্বকের সমস্যার জন্য কোল টার বা স্যালিসাইলিক অ্যাসিডমিশ্রিত শ্যাম্পু অত্যন্ত কার্যকর।
লাইট থেরাপি: প্রাকৃতিক সূর্যালোক বা বিশেষ ফটোথেরাপি (যেমন— পিইউভিএ বা আলট্রাভায়োলেট লাইট) সোরিয়াসিস নিয়ন্ত্রণে দারুণ
ভূমিকা রাখে।
উন্নত চিকিৎসা: রোগ যখন গুরুতর আকার ধারণ করে, তখন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ মুখে খাওয়ার ওষুধ, যেমন— মিথোট্রিক্সেট, সাইক্লোস্পোরিন বা রেটিনয়েড এবং প্রয়োজনে আধুনিক ‘বায়োলজিক’ ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
নিয়মিত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং নির্দেশনা মেনে চললে সোরিয়াসিস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব
প্রতিকার ও জীবনযাত্রায় সতর্কতা
জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন এবং সচেতনতা সোরিয়াসিসের প্রকোপ কমাতে জাদুর মতো কাজ করে:
খাদ্যাভ্যাস: যেসব খাবার খেলে চুলকানি বাড়ে, সেগুলো তালিকা থেকে বাদ দিন। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রচুর টাটকা সবুজ শাকসবজি এবং ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ সামুদ্রিক মাছ রাখুন। শরীর আর্দ্র রাখতে দিনে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন।
অভ্যাস পরিবর্তন: ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন করুন। নিয়মিত হাঁটাচলা ও কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
মানসিক প্রশান্তি: মেডিটেশন ও ইয়োগা চর্চার মাধ্যমে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন। মনে রাখবেন, মানসিক চাপ কমলে সোরিয়াসিস নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেক সহজ হয়।
ত্বকের সুরক্ষা: ত্বক যেন কোনোভাবেই কাটাছেঁড়া বা আঘাতপ্রাপ্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। কড়া রোদে বেশিক্ষণ থাকবেন না।
ইনফেকশন প্রতিরোধ: শরীরে যাতে কোনো সংক্রমণ না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখুন। আর যদি কোনো ওষুধের কারণে সমস্যা হয়, তবে দ্রুত চিকিৎসককে জানান এবং ওষুধ পরিবর্তন করুন।
সোরিয়াসিস একটি ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি রোগ, তাই এটি নিয়ন্ত্রণে ধৈর্যের প্রয়োজন। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের সঠিক পরামর্শ ও নির্দেশিত নিয়ম মেনে চললে সোরিয়াসিস আক্রান্ত ব্যক্তিও একটি স্বাচ্ছন্দ্যময় ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, মেডিসিন, সিটি ডেন্টাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, ঢাকা



