নগর চরিত্রের খোজে
পূজায় ঢাক না বাজালে মন ভরে না আমার

নিজের ঢাক সঙ্গে নিয়ে নিরঞ্জন। ছবি: লেখক
তারা সাধারণত এই নগরে থাকেন না। কিন্তু বছর ঘুরে আশ্বিনে পড়লে হাওয়া তাদের ডাক পাঠায়, এই নগরে ইট-কাঠের ফাঁক গলে কোথাও মাথা তোলা কাশফুল এই মানুষদের চিরচেনা ছবিটাকে আবার নতুন করে মনে ফিরিয়ে দেয়। তারা ঢাকি। দুর্গাপূজার সময় ঢাকার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে তাদের হাতে ধরা কাঠি ঢাকের মুখে বোল ফোটায়। সকাল অথবা সন্ধ্যাবেলা ধূপের সুগন্ধ, আনন্দিত হয়ে অসংখ্য মানুষের আসা-যাওয়ার সঙ্গে ঢাকের আওয়াজ অদ্ভুত সুন্দর এক আবহ তৈরি করে।
ঢাকিদের বেশিরভাগই রাজধানীতে থাকেন না। নগরপ্রান্তে অথবা গ্রামে তাদের বসবাস। কিন্তু এই নগরীর উৎসবের একটি অংশ হয়ে উঠেছেন তারা বহু বছর ধরে। নিরঞ্জনের বয়স এখন ৫৭ বছর। অনেক বছর ধরে পূজার সময় দলবল নিয়ে শহরের নানা মণ্ডপে ঢাক বাজাতে আসেন। তার বাড়ি আশুলিয়ায়। অনেক বছর ধরে নিরঞ্জন এই বিশাল আকৃতির বাদ্যযন্ত্রটি বাজাতে চলে আসেন শারদীয় দুর্গাপূজায়। নিরঞ্জনের ভাইয়ের বয়স এখন ৭০ ছুঁইছুঁই। তিনি ১৮ বছর বয়স থেকে পূজায় ঢাক বাজাতেন। বয়স হয়ে যাওয়ায় এখন আর পারেন না। নিরঞ্জন পারিবারিকভাবে কাজটা করেন এখন।
এই শহরকে, এই শহরের উৎসবের ছবিটাকে চোখের সামনে বদলে যেতে দেখেছেন নিরঞ্জন। অনেক আগে পূজার উৎসবের মধ্যে এক ধরনের সরলতা ছিল। এখন অনেক আলো, অনেক জৌলুশ আর মানুষের ভিড়ে সেই আগের উৎসব হারিয়ে গেছে বলেই তার মনে হয়। শৈশবে পূজার উৎসবের ভিন্ন এক ছবি তার মনের মধ্যে গেঁথে আছে।
‘ঢাক বাজানো তো পেশা নয়, তাহলে কেন আজও এই কাজটা করেন?’
‘এই যন্ত্রের বাজনাটা রক্তের মধ্যে মিশে গেছে। পূজার সময় ঢাক না বাজালে মন ভরে না। ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঢাক বাজাতে আসি। মায়ের পূজার সঙ্গে ঢাকের বোলও মিশে থাকে। তাকে ডাকি এই ভাষাতেই।’
‘এখন ঢাক বাজানোর মানুষ কি কমে যাচ্ছে?’
সময়ের বদল দেখা নিরঞ্জন মনে করেন, মানুষের জীবন আর জীবিকার লড়াই দিনে দিনে কঠিন হয়েছে। আগে বহু ঢাকির প্রধান পেশাই ছিল এটা। পাশাপাশি তারা সামান্য কৃষিকাজ বা মাছ ধরে জীবনের প্রয়োজন মেটাত। কিন্তু এখন পাল্টে গেছে সময়। কঠিন হয়েছে জীবনযুদ্ধ। তার পরিবারের পরের প্রজন্ম আর ঢাকা বাজাতে চায় না; এই বাজানোকে পেশা হিসেবে নেওয়ার প্রশ্ন তো বহুদূর। তারা অন্য কোনো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে আগ্রহী। কারণ, বছরে কয়েকটা পূজায় ঢাক বাজিয়ে তেমন আয় করা সম্ভব হয় না। টাকার মূল্যও এখন কমেছে, বেড়েছে ব্যয়।
নিরঞ্জন ঢাকের পাশাপাশি বাঁশিও বাজান। দেশের বিভিন্ন জেলায় বাঁশি বাজানোর জন্য তার ডাক পড়ে। বিয়েতেও এসব বাদ্যযন্ত্র নিয়ে এখনো হাজির হন তিনি। বাদ্যযন্ত্র বাজাতে ভালো লাগে তার।
‘একদিন ঢাক বাজানোর শিল্পী যদি আর খুঁজে না পাওয়া যায় এই শহরে?’
সামান্য হেসে নিরঞ্জন বললেন, ‘পূজায় ঢাক বাজবে চিরকাল। কিন্তু এ কথাও সত্যি, ঢাকিদের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে। একটা প্রজন্ম চলে যাচ্ছে, পরের প্রজন্মের কেউ কেউ আবার ঢাক বাজানো শিখছেও। এটা এক ধরনের পরম্পরা; ঢাকের বোল কখনো বন্ধ হবে না।’
নিরঞ্জনের বসবাস ঢাকা নগরের প্রান্তে। অনেক বছর হলো একটু দূরে গিয়ে বসবাস করছেন। এত মানুষের ভিড়, এত যানবাহনের চলাচল তার পছন্দ নয়। তাই সবকিছু থেকে একটু দূরেই থাকতে চান তিনি। অনেক বছর কেটে গেছে তার এই শহরে পূজার উৎসবে ঢাক বাজিয়ে। বহু উৎসবের সাক্ষী তিনি। এই শহরবাসের ইতিকথা তার কাছে খারাপ লাগেনি।



