গেরামে ফিরা যাইতে পারলে কি এই শহরে পইড়া থাকি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জীবন কি আসলে ছাই ফেলতে ভাঙা এক কুলা? সাবিহার কাছে হয়তো তাই। লেখাপড়া জানা কোনো মানুষের মতো গুছিয়ে কথা বলতে পারলে এভাবেই ব্যাখ্যা করতেন নিজের জীবনকে। তাই হয়তো জীবনের অন্য এক বিমুখ প্রান্তরে মাথায় ছাইয়ের বস্তা নিয়ে ঘুরে ঘুরে জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে তার। ভোরবেলা এ নগরের বিভিন্ন পাড়ায় গলিতে তার হাঁক শোনা যায়— এই... ছাই লইবেন, ছাই?
ষোলো বছর আগে নিজস্ব সাকিন জামালপুরকে পেছনে ফেলে কাজের সন্ধানে শহর ঢাকার জমিনে পা রেখেছিলেন। মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছিল রামপুরা এলাকার বনশ্রীতে। কাজ খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎই দেখা মিলেছিল সাদেক মিয়ার। ছাইয়ের ব্যবসা তার। সেখানেই জোটে ঘুরে ঘুরে ছাই বিক্রি করার কাজ। এক কৌটা ছাই দশ টাকা, পুরো বস্তা বিক্রি হলে বারোশ। সাবিহার কাছে এ শহরটা হারামি জায়গা। বাসের ভাড়া বাড়ে, বাজারে সবজির দাম বাড়ে। এক কেজি আলু কিনতে খরচ হয়ে যায় ত্রিশ টাকা। সাবিহার প্রশ্ন, ‘কিছুই তো খাওনের উপায় নাই; আমাগো কী হইব কন তো?’
এই হারামি শহর ছেড়ে তাহলে আবার জামালপুরে ফিরে যায়নি কেন সাবিহা? উত্তর দেওয়াটা তার জন্য যত সহজ, জীবন তার চাইতে অনেক বেশি কঠিন।
‘ফিরা যাইতে পারলে কি এই শহরে পইড়া থাকি? গেরামে তো কুনু কাজ নাই। যাগো জমি আছে তারা কিছু কইরা খাইতে পারে; আমাগো মতো মানুষের তো হেই উপায় নাই। প্যাটের দায়ে এই শহরে আসছি, কিন্তু এহানে ভালা লাগে না।’
সাবিহার স্বামী এখন ঢাকা শহরে একজন অনিয়মিত রিকশাচালক। অসুস্থতার কারণে সব দিন কাজে যাওয়া হয় না তার। তিন ছেলে কোনো দিন গার্মেন্টসে কাজ করে আবার কোনো দিন করেও না। বাড়িতেই বসে থাকে। কিন্তু সাবিহার ছাই বিক্রি বন্ধ হয় না। তাহলে সংসার চলবে কেমন করে?
বনশ্রী, রামপুরা, বসুন্ধরা, গুলশান আর উত্তরা এলাকা সাবিহার ব্যবসার জায়গা। সব দিন যে সমান যায় তার এমনও নয়। চালের তুষ থেকে তৈরি হওয়া ছাইয়ের কদর নগরবাসীদের কাছে এখন কম। কথায় কথায় মনের ক্ষোভ ঝাড়লেন, ‘এহন সবাই সাবান কিনে, আমাগো ছাই আর নেয় না। সাবানের গুঁড়া আমাগো মতো মানুষের কপাল খাইছে।’
‘তাহলে সংসার চলে কীভাবে, সংসারের চাকাটা ঘোরায় কে?’
‘সংসার আর চলতে চায় না। জিনিসপত্রের দাম বাড়তি। ঘুরতে ঘুরতে কুনু দিন পাঁচশ টাকারও বিক্রিবাট্টা হয় না। পরিবারের মানুষরাও ঠিকমতো কাজকাম পায় না। ঠিক কইরা চাইট্টা খাইতেও পারি না; কষ্ট হইয়া যায়।’
গ্রামে ফিরে যাওয়ার পথ আর খোলা নেই। সেখানে গিয়েও কাজ জোটে না সাবিহার। ধান তোলার মৌসুমে অতিরিক্ত শ্রমিকের খাতায় নাম লেখালে এককালীন কিছু টাকা আসে হাতে। তারপর আবার এই শহর তাকে ফিরে আসতে বাধ্য করে। তারপরও এ ঢাকা ছেড়ে মাঝে মাঝে গ্রামে যান সাবিহা। দুয়েকজন আত্মীয়স্বজন আছে সেখানে। তাদের সঙ্গে মিলে ছোটখাটো অস্থায়ী কাজ করেন। কিন্তু এ রাজধানী তার স্থায়ী নির্বাসন। শহরের পথে ঘুরতে ঘুরতে রাস্তার ধারে বসেই খাবার খান। আবার কোনো দিন সেই খাবারটাও জোটে না। সারা দিন ছাইয়ের বস্তা মাথায় নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে বনশ্রীর সেই ছোট্ট আশ্রয়ে ফিরে যান। দিন শেষে এ জীবনকে অভিশাপ দেন। আর কোনো বিকল্প কাজও জানা নেই তার।




