গল্পে ধাঁধা
মারাত্মক ভুল
- উত্তর পাঠাতে হবে ২১ অক্টোবরের মধ্যে। সঠিক উত্তরদাতাদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে একজন পাবেন ১০০০ টাকার বই।

আঁকা : অনন্যা প্রমা
শোল্ডার ব্লেডের ঠিক নিচ দিয়ে ঢুকেছে গুলিটা।
লাশটা সাবধানে চিত করে শুইয়ে দিলাম।
সাদা শার্টের বুকের বাম দিকে গোল আরেকটা জখম। ক্ষতটার চারপাশে কাপড় ছিঁড়ে কালচে হয়ে আছে। গুলি যে বেরিয়ে গেছে, সেটি বোঝা যাচ্ছে ক্ষতের কিনারায় জমে থাকা রক্তের দাগ দেখেই। পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ। খুব কাছ থেকে করা হয়েছে গুলি।
দুটো ফুটো ঘিরে লাল হয়ে উঠেছে সাদা শার্ট। রক্তের কিছুটা শুষে নিয়েছে ঘরের পুরু, সবুজ ভেলভেটের কার্পেট। ছোপ ছোপ কালচে দাগ তৈরি হয়েছে কার্পেটের ওপর।
সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। ঘরটা দেখলাম চোখ ঘুরিয়ে।
খুব বেশি অসংগতি নেই কামরায়। ভারী একটা কাঠের টেবিল। পাশে দুটো চেয়ার। দেয়ালে বড় একটা পেইন্টিং। জানালার পর্দাগুলো টেনে দেওয়া।
অদ্ভুত একটা গন্ধ ঘরের বাতাসে। বারুদের ঝাঁজ, রক্ত আর দামি পারফিউমের মিশ্রণ।
কিন্তু গুলিটা কোথায়?
মেঝের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে কয়েক পা এগোলাম। খুঁজতে খুঁজতে চোখ আটকে গেল গজখানেক দূরে পড়ে থাকা একটা সেলফোনের ওপর।
উপুড় হয়ে আছে ওটা। বোধ হয় ভেঙে গেছে স্ক্রিন।
সম্ভবত এই ফোন থেকেই আমাকে কল করেছিলেন দ্রাবিড় হাসান। শেষ করতে পারেননি কথা। সংযোগ কেটে গিয়েছিল কথার মাঝখানে। তার কয়েক মিনিট পরই এখানে এসে পৌঁছাই আমি।
ফোনটা তুলে নেওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছি, এমন সময় পেছনে অস্ফুট একটা শব্দ হলো।
চমকে ঘুরে দাঁড়ালাম।
দরজায় দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী।
কাটা কাটা মুখ। নীল চোখ। চোখের তারা দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল, স্বাভাবিক চোখ ও দুটো। তারপর খেয়াল করলাম, উজ্জ্বল আলোয় মণির কিনারায় দেখা যাচ্ছে কনট্যাক্ট লেন্সের সূক্ষ্ম রেখা।
দরজার চৌকাঠ আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি। অবিশ্বাসভরা চোখজোড়া স্থির হয়ে আছে লাশের ওপর।
নিজের পরিচয় দিলাম।
‘ডিটেকটিভ?’
মেয়েটির মুখ দিয়ে শব্দটা বেরোল ফিসফিস করে। তারপর সে যেন হঠাৎ নিজের বুকের ভেতর আটকে থাকা বাতাসটুকু ছেড়ে দিল।
‘হ্যাঁ,’ বললাম আমি।
এবার ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। তবে নড়ল না জায়গা ছেড়ে।
নিঃশব্দে অপেক্ষা করছি আমি।
কয়েক মুহূর্ত পর ধীর পায়ে ঘরে ঢুকল মেয়েটি। প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হচ্ছিল, শক সামলানোর চেষ্টা করছে প্রাণপণে। সামনে যা দেখতে পাচ্ছে, সেটা যেন বাস্তব নয়।
‘গঅড...’ ঠোঁট কাঁপছে তার। ‘কে... কে করল এ কাজ?’ চাপা, খসখসে কণ্ঠ।
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
লাশটার দিকে তাকিয়ে রইল সে।
‘আপনার নাম?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি। তাকিয়ে আছি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে।
‘স্বাতী, স্বাতী রহমান,’ জবাব দিল মেয়েটি। ‘দ্রাবিড়ের...বান্ধবী।’
‘বান্ধবী’ শব্দটা বলতে গিয়ে ইতস্তত করল কেন? অন্য কিছু বলতে চেয়েছিল নাকি?
‘হাসান সাহেব বলছিলেন, কিছুদিন ধরে কেউ তাকে হুমকি দিচ্ছিল ফোনে,’ এতটুকুন বলে আচমকা প্রশ্ন ছুড়লাম, ‘আপনি কি কিছু জানতেন এ ব্যাপারে?’
স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে স্বাতী। বলল, ‘হ্যাঁ, জানতাম।’
‘কাউকে সন্দেহ হয়?’
একমুহূর্তও ভাবল না মেয়েটি। মাথা ওপর-নিচ করল দ্রুত। সেই সঙ্গে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, জিশান।’
‘জিশান কে?’ প্রশ্ন করলাম।
‘আমার এক্স— ফিয়ঁসে,’ স্বাতীর গলায় এবার ভয়ের বদলে রাগ।
‘আচ্ছা!’ বিস্মিত হইনি। এমনটাই তো হয়ে থাকে সচরাচর। বললাম, ‘তারপর?’
‘গত সপ্তাহে ওর সঙ্গে এনগেজমেন্ট ভেঙে দিয়েছি আমি,’ খোলাসা করল মেয়েটি। ‘তার পর থেকেই খেপে আছে জিশান। ফোন করেছে আমাকে, মেসেজ দিয়েছে...।’
‘আপনার কী ধারণা?’ বাধা দিয়ে বলি আমি। ‘হাসান সাহেবকে যে হুমকি দিচ্ছিল, সেই লোক জিশান?’
‘এগজ্যাক্টলি।’ স্বাতীর চোখে কাঠিন্যের একটা ঝিলিক দেখা দিল। ‘হয় সে, নয়তো ওর ভাড়া করা লোক।’
‘কীভাবে বুঝলেন?’ সংগত কারণেই প্রশ্নটা করা।
‘না বোঝার কী আছে?’ পাল্টা প্রশ্ন করল মেয়েটি। ‘ও তো আমাকেও শাসিয়েছে। সরাসরিই বলেছে— আমি যদি দ্রাবিড়কে বিয়ে করি, তাহলে দুজনকেই খুন করে ফেলবে।’ কথাটা বলতে গিয়ে কেঁপে উঠল স্বাতীর কণ্ঠস্বর। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে যোগ করল, ‘বাস্টার্ড! কাউকে পেছন থেকে গুলি করা ওর মতো কাপুরুষের পক্ষেই সম্ভব।’
মুচকি হাসলাম আমি। খুবই সহজ কেস। অস্বাভাবিক রকমের সহজ।
মোটিভ আছে। হুমকি আছে। সম্ভাব্য খুনির নামও পাওয়া গেছে। রহস্যটা সমাধান করার জন্য আয়োজন করেই যেন আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে আমাকে।
আবার লাশটার দিকে তাকালাম।
রক্তের দাগ। এক জোড়া ক্ষত। মৃতদেহের অবস্থান। কার্পেটের ওপর রক্তের ছিটে। সবই ঠিক আছে। কিন্তু সবকিছু ভেস্তে দিয়েছে মারাত্মক একটা ভুল।
ভুলটা খুবই ছোট। কিন্তু খুনের নাটকে ছোট্ট ভুলই সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
আসল মোটিভ কী, সেসব পরে দেখা যাবে। আগে এই খেলার সমাপ্তি টানা যাক।
স্বাতীর দিকে তাকিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘পিস্তলটা কোথায়, ম্যাডাম?’
প্রশ্ন হচ্ছে, ডিটেকটিভ কীভাবে বুঝলেন যে স্বাতীই খুনের সঙ্গে জড়িত?



