রক্তবর্ণ

আঁকা : অনন্যা বিশ্বাস
‘জি, ইয়ে, আমিই খুন করেছি। কাজটা খুব একটা কঠিন না বুঝলেন। এই ধরেন রাত দশ কি সোয়া দশ।’
‘নিন, চা নিন।’
‘ধন্যবাদ। বাকিটা বলব?’
‘বলতে চাইলে বলেন। থানা হলো বলাবলির জায়গা। বিচার হয় আদালতে। সাজা খাটবেন জেলখানায়। থানার আর কাজ কী। অবশ্য পরে আবার ওয়ান সিক্সটি ফোরে সব বলতে হবে।’
‘ওহ। তা বলব। যতবার দরকার হবে বলবেন। বান্দা হাজির। শুনুন তবে। বাবলু বদমাশটা বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে গেটে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল। আমার ভাঙা বাড়িটার প্রতি তার বেজায় লোভ, বুঝলেন। আমি বলেই দিয়েছি যে বেচব না, মানে বেচব না। এরপর বলে কিনা আমার মেজো মেয়েটাকে বিয়ে করবে। তুলে নিয়ে যাবে-টাবেও বলছিল। আমার আবার ধরেন সাধারণত মাথায় রক্ত চড়ে না। তবে যা করা দরকার মনে করি, সেটা করে ফেলি। ভাবলাম, মামলা ডিসমিস করে ফেলি।’
‘মামলা তো শুরুই হয়নি। ঘটনা বলুন।’
‘হারামজাদা সিগারেট নিয়ে মুততে বসেছিল। ঠিক আমার বাড়িটার সামনেই। ড্রেনের ওপর। মুখ দিয়ে গলগল আর নিচ দিয়ে কলকল। ভাবলাম, আমাকে আর সন্দেহ করবে কী, চিনেই তো না। এরপর ওই যে ধরুন রোডে কনস্ট্রাকশন হচ্ছিল। কী ভাগ্য বলুন, একটা রডের টুকরো পেয়ে যাই। পুলিশ হেফাজতে আছে ওটা। কী যেন বলে ওটাকে? ও হ্যাঁ, মার্ডার উয়েপন।’
‘ওটা দিয়েই বাড়ি দিলেন?’
‘নাহ। আগে কাছে গেলাম। যখন ঠিক করি খুনটা করব, ধপ করে সাহস বেড়ে গেল। কাছে গিয়ে বললাম, নবাবজাদা এত এত চাঁদাবাজি করে বেড়াও, বাড়িতে টয়লেট নাই কেন! আমার বাড়ির সামনেই কেন
সারতে হবে!’
‘সে আপনাকে দেখতে পায়নি?’
‘ইলেকট্রিসিটি ছিল না। ঘুটঘুটে আঁধার। তবে কণ্ঠ চিনে থাকতে পারে। চিনলেই বা কী, সে তো আর সাক্ষী দিতে আসবে না। আমিই সাক্ষী, আমিই আসামি। এরপর দেরি করিনি। মাথার পেছনে দিলাম দশ সেরের বাড়ি। অনেকটা ধরেন, ওই বাজার থেকে কই মাছ কেনার পর কাটার আগে যেভাবে...। এক বাড়িতেই ধুপ্পুস। মানে সোজা ড্রেনে।’
‘আচ্ছা। ছটফটও করেনি।’
‘নারকেলের খোল ফাটার মতো শব্দ হয় বুঝলেন। এক বাড়িতেই খালাস। ভাগ্য ভালো যে ড্রেনে পড়েছে। রক্ত এক ফোঁটা ও রাস্তায় পড়ল না। আমি আবার পরিবেশ সচেতন।’
শরিফুল হাসানের কথা শুনে মনে হচ্ছে না তিনি অপরাধ স্বীকার করে সারেন্ডার করতে এসেছেন। মনে হচ্ছে, ওসির কাছে বড় মেয়ের শ্বশুরবাড়ির আলাপ করছেন।
রাজধানীর মনোহরবাগের ১০ নম্বর রোডের পাশে অন্ধকার একটা সরু গলিতে বাবলু পাটোয়ারীর থেঁতলানো লাশ উদ্ধারের পরই কয়েক মুখে বলাবলি হচ্ছিল, খুনটা শরিফুল ছাড়া আর কে করবে। তবে সারা রাত কেউ টের পেল না। ভোরে খবর পেয়ে পুলিশ এসে দেখে, ড্রেনে হাত-পা ছড়িয়ে এক ফালি আকাশের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল লাশটা। কপালের বেশ খানিকটা থেঁতলানো। শুকনো খটখটে ড্রেন। জমাট বাঁধা রক্তগুলো অদ্ভুত রঙ নিয়েছে। কোথাও কালচে লাল, কোথাও টকটকে কমলা। রক্তগুলো খাপছাড়াভাবে দলা পাকিয়ে আছে কিছু জায়গায়।
আশপাশে জটলা ছিল না। দু-একজন হেঁটে পার হওয়ার সময় বলেছিল, ওই বাড়ির সঙ্গে ক্যাচাল ছিল। লোকাল পলিটিকসে জড়িত থাকা সুবিশাল ভুঁড়িওয়ালা মাঝবয়সী লোকটা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করত বেশ। বড় দুয়েকটা কেসও নাকি আছে। পুলিশের খাতার কেস না। ওগুলো ছিল অন্য কোনো অঘটনা।
পুলিশ যখন লাশ উদ্ধার করে, শরিফুলের পুরনো আমলের একতলা বাড়ির একচিলতে উঠোনে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল ভার্সিটিতে পড়া মেয়েটা। ইন্সপেক্টর আশীষ জানতে চেয়েছিলেন, ‘আপনি কিছু দেখেছেন?’
‘হুঁ।’
‘থানায় আসতে হবে তা হলে। নাম বলুন।’
‘জেবা।’
‘কারও চেহারা দেখেছিলেন? কোনো শব্দ শুনেছিলেন?’
‘না।’
‘কাল রাতে ফিরেছিলেন কয়টায়? ভার্সিটিতে প্রোগ্রাম ছিল?’
‘রাতে। ছবি আঁকার অনুষ্ঠান ছিল। লোকটা আমাকে ডিস্টার্ব করত খুব, জানেন।’
‘কালও করেছিল?’
‘হুঁ।’
‘কীভাবে?’
‘আমাকে বলে তার গায়ে ছবি এঁকে দিতে।’
‘কীসের ছবি?’
‘সরিষা ফুল।’
‘তারপর?’
‘আমি দৌড়ে বাড়িতে ঢুকে যাই।’
‘এরপর?’
‘জানি না।’
শরিফুলের মনে কিঞ্চিৎ অস্বস্তি। ঘটনায় বিশেষ কোনো মারপ্যাঁচ না থাকায় গল্পটা বলে জুত পাচ্ছেন না।
ওসির মনের খচখচানিও যাচ্ছে না। কেউ খুন করে পুলিশকে এভাবে জেন্টলম্যানের মতো বর্ণনা দেবে কেন? লোকটাকে তো মানসিক বিকারগ্রস্তও মনে হচ্ছে না।
‘আপনার পরিবারের কেউ আসেনি থানায়?’
‘আমার ওয়াইফ বড় মেয়ের বাড়িতে। বড় মেয়ে শিক্ষা অফিসার। বগুড়ায় পোস্টিং। ছোটটা... মানে থানা পুলিশে এসে কী কাজ তার। আসামি নিজেই তো হাজির।’
‘ও তো ঘটনার সাক্ষী।’
‘ও আর কী দেখবে। অন্ধকারে কিছু দেখা যায় নাকি। তার ওপর লোডশেডিং।’
‘আপনার এই মেয়েকেই বিরক্ত করত বাবলু?’
‘আরে নাহ। বিরক্ত করবে কী। পলিটিকস আর চাঁদাবাজি করে কূল পায় না। আমার বাড়ি দখল...।’
‘হয়েছে, এবার চুপ করুন। আপনি কোনো খুন-টুন করেননি। ঘটনা কী, সেটিও বুঝতে পেরেছি। আদালতে আপনি দোষ স্বীকার করেও পার পাবেন না। তবে আমাকে সময় দিন, ঘটনা একটা সাজানো যাবে বটে। আপাতত যা বলেছেন, সব ভুলে যান।’
‘জি, ইয়ে মানে। আমিই কিন্তু..।’
‘আপনার গল্পে বড় ফোকর আছে। ফোকর মানে জানেন তো? ফাঁকের ওপর ফোকর। তা ছাড়া খুন কে করেছে, সেটি অনুমান করতে পারছি। যদিও সে ব্যাপারে নিশ্চিত না।’
‘জি আচ্ছা। তা হলে ইয়ে মানে, মার্ডার উয়েপন তো আছে।’
‘ওটার বন্দোবস্ত হবে। তার আগে ড্রেনটা পরিষ্কার করান। বাড়ির সামনে নোংরা ড্রেন থাকা তো কাজের কথা না, তাই না? ভয় পাবেন না; সলিড অ্যাভিডেন্স ছাড়া যাকে-তাকে আমরা অ্যারেস্ট করব না। এখন পর্যন্ত কেউ মামলাও করতে আসেনি। পুলিশই করবে যা করার।’
পাঠক বলুন, শরিফুল কেন মিথ্যা জবানবন্দি দিল।
উত্তর পাঠাতে হবে ২৯ জুলাইয়ের মধ্যে। সঠিক উত্তরদাতাদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে একজন পাবেন ১০০০ টাকার বই।




