জঙ্গলে অমঙ্গল
- উত্তর পাঠাতে হবে ১২ আগস্টের মধ্যে। সঠিক উত্তরদাতাদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে একজন পাবেন ১০০০ টাকার বই।

আঁকা : অনন্যা বিশ্বাস
শ্রাবণের একনাগাড়ে ঝরতে থাকা মুষলধারে বৃষ্টিতে কালেঙ্গার গহিন অরণ্য যেন আদিম রহস্যময় এক রূপ ধারণ করেছে। পাহাড়ি চড়াই-উতরাইয়ের গায়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল গর্জন, চাপালিশ আর সেগুনগাছগুলোর পাতা চিরে বড় বড় জলের ফোঁটা ঝরে পড়ছে কাদাপথে। চারপাশের আবছায়া অন্ধকারে বাতাস থমথম করছে। কদাচিৎ ডেকে উঠছে কোনো নিশাচর পাখি। বনের বড় ছড়াগুলোর বুক চিরে জেগে ওঠা প্রমত্তা গর্জন জানান দিচ্ছে জলধারার ক্ষিপ্রগতি।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট সীমানাসংলগ্ন এই অভয়ারণ্যে নতুন দায়িত্বে এসেছেন বন কর্মকর্তা জাহিদ আহমেদ। বয়স তিরিশের কোঠায়; তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আর ঠান্ডা মাথার যুক্তিবোধ তার মূল হাতিয়ার। কিন্তু গত এক সপ্তাহে চাকরির চাপের চেয়েও জাহিদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে অন্য এক উদ্বেগ। কালেঙ্গার গভীরে চোরাশিকারির আনাগোনা।
কালেঙ্গার ভৌগোলিক গঠন বেশ জটিল। এক পাহাড়ের খাঁজে বন কর্মকর্তাদের কাঠের আবাসন আর সেখান থেকে প্রায় আধ কিলোমিটার দূরে, গহিন বনের অন্য এক পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে পুরনো এক ডাকবাংলো। দুই পাহাড়ের মাঝখানের গভীর খাদ দিয়ে ধেয়ে চলেছে একটা পাহাড়ি ছড়া।
আজ রাতে বৃষ্টিটা যেন আকাশ ভেঙে নেমেছে। ঘড়িতে রাত সাড়ে এগারোটা। কাঠের কোয়ার্টারের বারান্দায় দাঁড়িয়ে গরম চা খাচ্ছেন জাহিদ। বৃষ্টি তার ভীষণ পছন্দ। জঙ্গলের রাতে বৃষ্টির তো তুলনা নেই। কিন্তু আজ কেন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে মনে। বৃষ্টির রাত চোরাশিকারিদের সবচেয়ে প্রিয় সময়— পায়ের ছাপ কাদায় ধুয়ে যায়, বৃষ্টির তোড়ে বন্দুক বা অন্য কোনো আওয়াজ চাপা পড়ে যায়। হঠাৎ বৃষ্টির টানা শব্দের মধ্যে একটা কর্কশ ডাক ভেসে এলো। অনেকটা কুকুরের ডাকের সঙ্গে মিল আছে। তবে জাহিদ জানে এটা মায়া হরিণ বা বার্কিং ডিয়ারের ডাক। চরম ভয় পেলে বা বিপদে পড়লেই এরা এমন কুকুরে গলায় ডাকে।
ছড়ার দিক থেকে এরপরই ভারী কিছু আছড়ে পড়ার অস্পষ্ট আওয়াজ কানে এলো। জাহিদ আর দেরি করলেন না। রেইনকোট গলিয়ে শক্তিশালী টর্চলাইটটা হাতে নিয়ে পিচ্ছিল কাদার পথ ধরে দৌড়ালেন। একপর্যায়ে চলে এলেন ছড়ার কাছে।
টর্চের তীব্র আলো বৃষ্টির ঝাপটায় কিছুটা ফিকে। লাল মাটিতে দৃশ্যটা দেখে থমকে দাঁড়ালেন তিনি। একটা পূর্ণবয়স্ক মায়া হরিণ নিথর হয়ে পড়ে আছে প্রকাণ্ড এক গর্জন গাছের বিশাল ছড়ানো শিকড়ের খাঁজে। ওপরের ঘন পাতা আর শিকড়ের আচ্ছাদনের কারণে বৃষ্টির সরাসরি ঝাপটা সেখানে পৌঁছায়নি। হরিণটির গলার ক্ষতের আড়াল থেকে বের হওয়া ঘন রক্তের ধারা ছড়ার দিকে নেমেই ঘোলা জলে মিশে লালচে ফেনা তৈরি করছিল।
হাঁটু গেড়ে বসে চারপাশটা তীক্ষ্ণ নজরে পরখ করলেন জাহিদ। মায়া হরিণ বনের সবচেয়ে সতর্ক আর ক্ষিপ্র প্রাণীগুলোর একটি, তাকে খোলা জায়গায় ধাওয়া করে ধরা প্রায় অসম্ভব। জাহিদ বুঝতে পারলেন, মুষলধারে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে হরিণটি এই শিকড়ের খাঁজে আশ্রয় নিতে এসেছিল। আর শিকারি আগে থেকেই গাছের আড়ালে ওত পেতে ছিল। হরিণটি কাছাকাছি আসতেই শিকারি গাছের ওপর বা শিকড়ের আড়াল থেকে সরাসরি তার ওপর লাফিয়ে পড়ে। কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। গলায় সোজা বিঁধে শ্বাসনালি ও মূল রগ কেটে দেওয়া হয়েছে এক টানে, যাতে হরিণটি বিন্দুমাত্র চিৎকার করার বা পালানোর সুযোগ না পায়।
গলায় বিঁধে আছে অত্যন্ত ধারালো, খাঁজকাটা একটি ট্র্যাকিং নাইফ। বাঁটে সুন্দর করে খোদাই করা দুটি ইংরেজি হরফ— ‘V.K.’। এটি সাধারণ কোনো ছুরি নয়, পেশাদার শিকারিদের ব্যবহৃত বিশেষ ‘সাইলেন্ট কিলিং’ ট্র্যাকিং নাইফ। কিন্তু শিকারি এত কষ্ট করে শিকার ধরেও হরিণটি ফেলে পালাল কেন? জাহিদ নিজের টর্চলাইটের দিকে তাকালেন। হরিণের ডাক শুনে তিনি খুব দ্রুত রেসপন্স করেছিলেন। দূর থেকে টর্চের জোরালো আলো এগিয়ে আসতে দেখেই শিকারি বুঝতে পারে, এই ১৫-১৬ কেজির ভারী মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে পালানো অসম্ভব। ধরা পড়ার ভয়ে তড়িঘড়ি করে সে শিকার এবং নিজের ছুরি ফেলেই অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়েছে।
ঘটনাস্থল ঘেঁটে জাহিদ আরও দুটি অমূল্য প্রমাণ পেলেন। অপেক্ষার প্রহরে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে থাকার সময় শিকারি ধূমপান করেছিল। গাছের একটি শুকনো কোটরের খাঁজে আটকে আছে একটা আধপোড়া দামি ফিল্টার সিগারেটের টুকরো। বৃষ্টির ছাঁট না পৌঁছানোয় ফিল্টারটি এখনো পুরোপুরি ভিজে চটচটে হয়ে যায়নি। আর হরিণটি যেখানে পড়েছিল, ঠিক তার মাথার ওপরের একগুচ্ছ বড় ঝোপের পাতার নিচের পিঠে কয়েক ফোঁটা তাজা রক্ত লেগে আছে। ভারী বৃষ্টিতে ওপরের সব পাতা ধুয়ে গেলেও, ঝোপের তলার ঢাকা অংশে কাদা ও রক্তমাখা হাতের সেই ছাপটা অক্ষত থেকে গেছে!
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে জাহিদ দ্রুত পদক্ষেপে ফিরে এলেন। রাত বারোটার মধ্যে তিন সন্দেহভাজনকে নিজের ছোট্ট আবাসে তলব করলেন তিনি।
সন্দেহভাজন ১: ফরেস্ট গার্ড সামাদ মিয়া
বহু বছর ধরে এই বনে চাকরি করছেন। কিছুটা অলস প্রকৃতির বলে বদনাম আছে তার। রাতে ভেজা ফরেস্ট ইউনিফর্ম পরে হাজির হলেন। শরীর-ইউনিফর্ম কাদামাখা। জাহিদকে বললেন, ‘স্যার, বৃষ্টি নামার পর ফরেস্ট বাংলোর দিক থেকে টহল সেরে নামছিলাম। রাইফেলটা অফিসে জমা আছে। অস্ত্র ছাড়া বের হয়েছিলাম। ছড়ার রাস্তা দিয়ে আসার সময় পিচ্ছিল খাদে আছাড় খেয়ে পড়ি, তাই কাপড়ে এত কাদা। বৃষ্টির এত শব্দে আমি সত্যি অন্য কোনো শব্দ পাইনি স্যার!’
সন্দেহভাজন ২: জসীম (কাছের বাঙালিপাড়ার বাসিন্দা)
বনের সীমানায় তার বাস। ফাঁদ পেতে ছোটখাটো প্রাণী শিকারের অতীত রেকর্ড আছে। জসীমের পরনে ছিল ভিজে যাওয়া গামছা আর খালি পায়ে কাদার প্রলেপ। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বলছিল, ‘হুজুর, রাতে বৃষ্টির মধ্যে ছড়ার ওপারে খোঁয়াড়ে আমার গরুগুলো ঠিক আছে নাকি দেখতে বের হয়েছিলাম। আমি সাধারণ গ্রামের মানুষ, এখন আর এসবের মধ্যে নেই। তবে এটা ঠিক, টাকাপয়সার টানাটানি থাকায় দুই-একবার খারাপ কাজ করছিলাম।’
সন্দেহভাজন ৩: রবার্ট উইলিয়ামস (বিদেশি পর্যটক)
অন্য পাহাড়ের ফরেস্ট বাংলোয় উঠেছেন এই ইউরোপীয় আলোকচিত্রী। সঙ্গে অনেক ভারী ব্যাগপত্র। ট্র্যাকিং জ্যাকেট আর দামি ওয়াটারপ্রুফ বুট পরে ঘরে এলেন রবার্ট। তার জ্যাকেটের হাতার ভেতরের অংশ কিছুটা ভেজা। ভাঙা ইংরেজিতে বললেন, ‘আমি রাত দশটা থেকে বাংলোর খোলা বারান্দায় বসে কফি খাচ্ছিলাম। রাত এগারোটা বাজতেই ঠান্ডা বাতাস আর বৃষ্টি বাড়ায় ঘরে ঢুকে পড়ি। আমার কাছে কোনো অস্ত্র নেই, শুধুই বন্যপ্রাণীর ছবি তোলার ক্যামেরা।’
তিনজনকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে টেবিলে হরিণ শিকারের ছুরিটি আর সিগারেটের টুকরোটি রাখলেন জাহিদ। বাইরে তখনো অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে।
জাহিদ মৃদু হেসে রবার্টের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যে ভেবেছিল মুষলধারে বৃষ্টি তার সব অপরাধ ধুয়েমুছে সাফ করে দেবে, সে ভুলে গিয়েছিল যে প্রকৃতি সবসময় একটা না একটা ক্লু রেখে দেয়। রবার্ট উইলিয়ামস, আপনার চালাকি এখানেই শেষ!’
পাঠক, বলুন তো জাহিদ কীভাবে বুঝলেন রবার্টই অপরাধী?




