এক ক্লিকেই বাজিমাত
- শখের গণ্ডি ছাপিয়ে ফটোগ্রাফি এখন আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার

মডেল: নিশা চৌধুরী, ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
ফটোগ্রাফি সবসময়ই আকর্ষণীয় পেশা। এই কনটেন্ট ক্রিয়েশনের যুগে এর সম্ভাবনা আরও বাড়-বাড়ন্ত। আলোকচিত্রে ক্যারিয়ার গড়ার উপায় জানাচ্ছেন স্বর্ণা রায়
একসময় ক্যারিয়ার বলতে অনেকেই গৎবাঁধা কিছু পেশাকেই বুঝতেন। সময় বদলেছে। সেই সঙ্গে বদলেছে সাফল্যের সংজ্ঞাও। এখন সৃজনশীল কাজগুলোও হয়ে উঠছে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার। এমনই এক বৈচিত্র্যময় ও সম্মানজনক পেশা ফটোগ্রাফি।
স্বরূপ ও সম্ভাবনা
ফটোগ্রাফি মানে শুধু শখের বশে ছবি তোলা নয়, এটি একটি শিল্প। প্রতিটি ক্লিকে একটি মুহূর্তকে অক্ষয় করে রাখার পাশাপাশি এটি এখন একটি স্বতন্ত্র পেশা। ওয়েডিং থেকে শুরু করে ফ্যাশন, ফুড, প্রোডাক্ট, ওয়াইল্ডলাইফ কিংবা ফটোসাংবাদিকতা— ফটোগ্রাফির বিস্তৃতি এখন অনেক। বিশ্বব্যাপী কনটেন্ট ক্রিয়েশন ও ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার প্রসারের ফলে দক্ষ ফটোগ্রাফারের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। পড়াশোনা শেষে চাকরির বাজারের অনিশ্চয়তায় যখন অনেকেই দিশাহারা, তখন ফটোগ্রাফি হতে পারে সৃজনশীল ও লাভজনক এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।
একমুহূর্তের একটি ক্লিক শুধু ক্যামেরাবন্দি হওয়া ছবিটিকে নয়, সঙ্গে ফটোগ্রাফারকেও অনেকটা অমরত্বের স্বাদ দিতে পারে
কোথায় শিখবেন
ফটোগ্রাফিকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে চাইলে প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা ও হাতে-কলমে শিক্ষা। বাংলাদেশে এখন বিশ্বমানের ফটোগ্রাফি শেখার জন্য রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
পাঠশালা: এখানে তিন বছরের প্রফেশনাল ফটোগ্রাফি কোর্স করানো হয়। ঠিকানা: ১৬, শুক্রাবাদ, ঢাকা। ফোন: ০১৭৯৫০৯৪২৭১।
কাউন্টার ফটো: এখানে মেন্টর প্রোগ্রাম ও ডিপ্লোমা কোর্সের ব্যবস্থা রয়েছে। ঠিকানা: ১৪ পূর্ব শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা। ফোন: ০১৩১৮৬৭৯২৮৩।
বেগার্ট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি: এখানে এক বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্স করানো হয়। ঠিকানা: ৮৩ ল্যাবরেটরি রোড (কফি হাউসের গলি), ঢাকা। ফোন: ০১৭১৬৬৬৩৭৫৭।
ঢাকা ফটোগ্রাফি ইনস্টিটিউট: এখানে ভিডিও ও ডিপ্লোমা কোর্স করার সুযোগ রয়েছে। ঠিকানা: সাহেরা ট্রপিক্যাল সেন্টার (ষষ্ঠতলা), ২১৮ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা। ফোন: ০১৮৩১৫১০০৫২।
ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফটোগ্রাফিক সোসাইটি: শিক্ষার্থীদের জন্য তিন মাসের বেসিক কোর্স করানো হয় এখানে। ঠিকানা: ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ফোন: ০১১৯৭২৬০৫৫২-৫৪।
এ ছাড়া ফটোফি, ফ্রাস্টলাইট, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, ওয়েডিং ডায়েরি ও প্রিজমের মতো প্রতিষ্ঠানেও ফটোগ্রাফি প্রশিক্ষণের বিভিন্ন কোর্স চালু আছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রযুক্তিগত জ্ঞান, লাইটিং ও এডিটিংয়ের ওপর দক্ষতা অর্জন করে যে কেউ নিজেকে একজন দক্ষ ও পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন।
সীমানা ছাড়িয়ে
ফটোগ্রাফি পেশা শুধু কিছু সীমাবদ্ধ কাজের মধ্যে নেই। দক্ষ ফটোগ্রাফাররা বিজ্ঞাপনী সংস্থা, মিডিয়া হাউজ, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি, ই-কমার্স ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোতে কাজ করছেন। এমনকি ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বিশ্ববাজারেও নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের মাধ্যমে বিদেশের বড় বড় প্রজেক্টে কাজ করার সুযোগও রয়েছে অঢেল।
উৎসাহের উদাহরণ
এই পেশার অপার সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ অভিজিৎ নন্দী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর সুইজারল্যান্ডে উচ্চশিক্ষা নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্রচলিত করপোরেট জীবনের গৎবাঁধা রুটিন তাকে টানেনি; বরং প্যাশনকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। অভিজিতের মতে, যারা ফটোগ্রাফিকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে চান, তাদের উচিত শর্টকাট না খুঁজে পড়াশোনা ও হাতে-কলমে শেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া। সেই পড়াশোনা ফটোগ্রাফির ওপরই হতে হবে, এমন নয়। যেকোনো বিষয়ে পড়াশোনা আপনাকে ডিসিপ্লিনসহ আরও নানা বিষয় জানতে সাহায্য করবে।
অভিজিৎ বলেছেন, ‘একজন ফটোগ্রাফারের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পুঁজি হচ্ছে একটি শক্তিশালী পোর্টফোলিও। আপনি যদি কোনো সামাজিক বা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে একটি মানসম্মত ফটো-ডকুমেন্টারি বা প্রজেক্ট তৈরি করতে পারেন, সেটি আপনার জন্য অনেক ভ্যালু তৈরি করবে। এই পোর্টফোলিও ব্যবহার করে একজন ফটোগ্রাফার বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ বা উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করতে পারেন।’ অভিজিৎ মনে করেন, সৃজনশীলতার পাশাপাশি ব্যবসায়িক দক্ষতা, নেটওয়ার্কিং এবং ডেটলাইন মেনে কাজ করার মানসিকতাই একজন ফটোগ্রাফারকে দীর্ঘ মেয়াদে সফল করতে পারে।
ফটোগ্রাফি মানে শুধু ক্যামেরা হাতে ঘুরে বেড়ানো নয়; এটি গবেষণা ও জ্ঞানার্জনের এবং সৃষ্টিশীল উপায়ে সেটির প্রতিফলন দেখানোর এক বিস্তৃত জগৎ। কেননা একমুহূর্তের একটি ক্লিক শুধু ক্যামেরাবন্দি হওয়া ছবিটিকে নয়, সঙ্গে ফটোগ্রাফারকেও অনেকটা অমরত্বের স্বাদ দিতে পারে, দুনিয়ায় এমন উদাহরণ কম নয়। তাই যারা প্রথাগত পেশার বাইরে মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে স্বাধীন ও সম্মানজনক ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের জন্য এই পেশা হতে পারে আদর্শ গন্তব্য।



