স্থপতিদের এখন অনেক সুযোগ

স্থপতি ওয়াসিক ঈদাফের মতে, এই পেশায় দীর্ঘ মেয়াদে সফল হতে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
সব ধরনের স্থাপনার পেছনে থাকে সুপরিকল্পিত নকশা। সেটির মাধ্যমে ভবনকে পরিবেশসম্মত, নিরাপদ ও কার্যকর করে তোলেন স্থপতি। সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা স্থাপত্য পেশায় ক্যারিয়ারের সম্ভাবনার গল্প লিখেছেন স্বর্ণা রায়
অনেকেই মনে করেন, যারা ছবি আঁকতে পারেন কিংবা হস্তশিল্প বা কারিগরি শিল্পে আগ্রহী, এই পেশা শুধু তাদের জন্য। বাস্তবে বিষয়টি তেমন নয়। স্থাপত্য মূলত ত্রিমাত্রিক জগৎকে বোঝার একটি বিষয়। ছবি আঁকতে পারা বা না পারার সঙ্গে স্থপতি হওয়ার সরাসরি সম্পর্ক নেই।
কোথায় পড়বেন
বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যবিদ্যা পড়ার সুযোগ রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে পড়ানো হয়।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এ তালিকায় রয়েছে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি (চট্টগ্রাম) এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ প্রভৃতি।
ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের জন্য ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও সুযোগ রয়েছে।
ভর্তির যোগ্যতা
স্থাপত্য বিভাগে সাধারণত বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের এ-লেভেলে বিজ্ঞান বিষয়ে ন্যূনতম তিনটি ‘এ’ এবং ও-লেভেলে গণিত, ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নসহ পাঁচটি বিষয়ে অন্তত ‘বি’ গ্রেড থাকতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে কিছু পার্থক্য থাকলেও ভর্তি পরীক্ষা সাধারণত দুই ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ধাপে পরীক্ষা নেওয়া হয় গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও ইংরেজি বিষয়ে। দ্বিতীয় ধাপে ড্রয়িং বা মুক্তহস্তে অঙ্কনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তি মূল্যায়ন করা হয়।
স্থাপত্য পেশা শুধু নকশা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, প্রকৌশলীদের সঙ্গে সমন্বয়, বাজেট ব্যবস্থাপনা, ক্লায়েন্টের চাহিদা বোঝা এবং নকশা বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব জড়িত। স্থপতির কাজের পরিধি অনেক বিস্তৃত, যেখানে সামাজিক প্রভাবও তাৎপর্যপূর্ণ
ওয়াসিক ঈদাফ, অংশীদার ও প্রধান স্থপতি, অন্য আর্কিটেক্টস, বাংলাদেশ
কোথায় হতে পারে ক্যারিয়ার
স্থাপত্যে ক্যারিয়ার অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। সরকারি খাতে স্থাপত্য অধিদপ্তর, রাজউক, এলজিইডি, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিটি করপোরেশনে স্থপতিদের কাজের সুযোগ রয়েছে। বেসরকারি খাতে স্থাপত্য ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও তাদের চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি বিসিএস, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণার সুযোগও আছে। উদ্যোক্তা হিসেবে নিজস্ব আর্কিটেকচার বা ডিজাইন ফার্ম গড়ে তোলার পাশাপাশি বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও স্থপতিদের জন্য রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা।
বহুমুখী দক্ষতা ও বহুমাত্রিক ক্যারিয়ার
একজন স্থপতির কাজ শুধু ভবনের নকশায় সীমাবদ্ধ নয়; ইন্টেরিয়র ডিজাইন, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, আরবান প্ল্যানিং, ফার্নিচার ও প্রোডাক্ট ডিজাইনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ফটোগ্রাফি, সিনেমাটোগ্রাফি, গ্রাফিকস ডিজাইন, গবেষণা ও শিক্ষাদানেও স্থপতিরা দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন।
অনুপ্রেরণার গল্প
নারায়ণগঞ্জ নগর ভবনের অন্যতম স্থপতি ওয়াসিক ঈদাফ। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে স্থাপত্যে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি ‘ভিটি স্থাপতি’তে কাজ করার সময় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নকশায় যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে ‘অন্য আর্কিটেক্টস’-এর অংশীদার ও প্রধান স্থপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ওয়াসিক বলেন, ‘ক্যারিয়ারের শুরুতে অভিজ্ঞ কোনো সিনিয়র স্থপতির অধীনে কাজ করা প্রয়োজন। এতে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি রেসিডেনসিয়াল, কমার্শিয়াল, ল্যান্ডস্কেপ কিংবা ইন্টেরিয়র ডিজাইনের মতো বিভিন্ন ধরনের প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে ক্যারিয়ারকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে।’
‘বর্তমানে আর্কিটেক্টদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে কাজের বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভিজ্যুয়ালাইজেশন কিংবা ওয়ার্কিং ড্রয়িংয়ের মতো অনেক কাজ বাংলাদেশ থেকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য করা সম্ভব’, বলেন তিনি।
এই পেশায় দীর্ঘ মেয়াদে সফল হতে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের পরামর্শ তার।
একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জিং ও সৃজনশীল পেশা হিসেবে স্থাপত্যের আবেদন বরাবরই শীর্ষে। শুধু স্বপ্নে ভর না দিয়ে, শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে ক্যারিয়ারের প্রতিটি ধাপে তাই নিজেকে দক্ষভাবে গড়ে তোলার এবং সেই দক্ষতার প্রমাণ দেওয়ার বিকল্প নেই বললেই চলে।




