ইশারায় চলবে হুইলচেয়ার

হাতের ইশারা, ভয়েস কমান্ড, ঘাড়ের নড়াচড়া, মুখভঙ্গি, টাচস্ক্রিন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এই হুইলচেয়ার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। লিখেছেন মিরাজুল ইসলাম
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী আজমাইন ইনকিয়াদ হক ও ফাইরুজ জাহিন খান উদ্ভাবন করেছেন ইশারার হুইলচেয়ার। আজমাইন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিনের ২৩ ব্যাচের ছাত্র; ফাইরুজ পড়েন একই ব্যাচে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায়। রোবোটিকস ও প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ থেকে শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের চলাচল সহজ করতে কিছু করার চিন্তা করেছিলেন তারা। ২০২৫ সালের মার্চে ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন হাব প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার সময় সেই ভাবনা প্রকল্পে রূপ নেয়। প্রকল্পটি নির্বাচিত হওয়ার পর একজন সুপারভাইজার ও একজন মেন্টর তাদের সঙ্গে কাজ করেন। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা তৈরি করেছেন ‘স্মার্ট হুইলচেয়ার’। এটি হাতের ইশারা, ভয়েস কমান্ড, ঘাড়ের নড়াচড়া, মুখভঙ্গি, টাচস্ক্রিন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রায় ছয় মাসের পরিশ্রমের পর খুলনা অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন হাব প্রোগ্রাম প্রতিযোগিতায় প্রকল্পটি প্রথম স্থান অর্জন করে। পুরস্কার হিসেবে তারা পান ৫৫ হাজার টাকার প্রি-সিড মানি।
আজমাইন জানালেন, যাদের হাত নেই বা যারা হাতের স্বাভাবিক ব্যবহার করতে পারেন না, তাদের পক্ষে প্রচলিত জয়স্টিকনির্ভর হুইলচেয়ার পরিচালনা করা কঠিন। পাওয়ার হুইলচেয়ারের দামও অনেক বেশি। তাই তুলনামূলক কম খরচে প্রযুক্তিনির্ভর হুইলচেয়ার তৈরির উদ্যোগ নেন তারা। হুইলচেয়ারটির প্রযুক্তিগত কাজের বড় অংশ করছেন আজমাইন। কোডিং, সেন্সরসহ কারিগরি বিষয় দেখছেন তিনি। ফাইরুজ দেখছেন মিডিয়া ও যোগাযোগের বিষয়গুলো।
হুইলচেয়ারে থাকা সেন্সর সামনে কোনো বাধা শনাক্ত করলে সেটি আর এগোবে না
উদ্ভাবকরা জানিয়েছেন, ব্যবহারকারীর শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী হুইলচেয়ারের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কাস্টমাইজ করা যাবে। হুইলচেয়ারে থাকা সেন্সর সামনে কোনো বাধা শনাক্ত করলে সেটি আর এগোবে না। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। হুইলচেয়ারটি ব্যাটারিচালিত। একবার চার্জ দিলে প্রায় ১২ ঘণ্টা চলতে পারে। এটি সর্বোচ্চ ১২০ কেজি ওজন বহন করতে সক্ষম। তৈরিতে দেশীয়ভাবে সংগ্রহ বা তৈরি করা সামগ্রী, সফটওয়্যার ও সেন্সর ব্যবহার করা হয়েছে। এমন একটি হুইলচেয়ার তৈরিতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে অর্থসংস্থান ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পরীক্ষার সময় কয়েকটি সার্কিট ও যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়েছে। ৪০ বারের বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বর্তমান মডেলটি তৈরি হয়েছে। এই প্রকল্প বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাফল্য পেয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে হাল্ট প্রাইজে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ১৮ হাজার টাকা, ইউআইএইচপির (ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন হাব প্রোগ্রাম) জাতীয় পর্যায়ে এক লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ ব্যক্তিগত পর্যায়ে দ্বিতীয় হয়ে আরও এক লাখ টাকা পেয়েছেন এর উদ্যোক্তারা। সব মিলিয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা থেকে পেয়েছেন ২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা।
হুইলচেয়ারটি আরও উন্নত করে বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনতে চান আজমাইন ও ফাইরুজ। বড় পরিসরে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের জন্য প্রায় ১০ কোটি টাকা ফান্ড প্রয়োজন হতে পারে বলে জানান তারা।
বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরও আটটি প্রকল্প নির্বাচিত হয়। এর মধ্যে ‘নিও সেভার’ একটি রিয়েল টাইম মোবাইল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাম্বুলেন্স সেবা সমন্বয়ের উদ্যোগ। ফেলে দেওয়া খেজুরের বীজ ব্যবহার করে ক্যাফেইনমুক্ত কফি ও লো-গ্লাইসেমিক চকলেট তৈরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবনী প্রজেক্ট টিম ‘ব্লিস সিহাত’ একটি প্রকল্পে কাজ করেছে। ইন্টারনেট ছাড়াই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করতে পারে ‘এআইচালিত ইসিজি’। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের সহায়তায় রয়েছে এআই স্মার্ট গ্লাস ‘ট্রু-সাইট’, যা আশপাশের দৃশ্যকে অডিও নির্দেশনায় রূপান্তর করে। দুর্ঘটনা, সহিংসতা ও গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্তে রয়েছে ‘ইন্টেলিজেন্ট ক্যাম্পাস সিকিউরিটি’। বিদ্যুৎসাশ্রয়ী প্রযুক্তির ‘হাই-ভোল্টেজ এনার্জি-এফিশিয়েন্ট থ্রিডি প্রিন্টার’, প্রকৃতি সংরক্ষণ ও স্থানীয় অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া ‘ইকোলিংক ও ইকোজেন সুন্দরবন’ এবং উপকূলীয় কৃষিজমি রক্ষায় মাটি পুনরুদ্ধার ও স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তিনির্ভর ‘আরবান আর্থ’ও নির্বাচিত হয়েছে।



