রুয়েটের উদ্যোগ
ঘরে বসেই ক্ষেতের খবর

বারির জামালপুর আঞ্চলিক কেন্দ্রের গবেষণা মাঠে ব্যবহার করা হচ্ছে সিস্টেমসেজ ফার্ম জিনিয়াস অন্বেষণ
সাব্বির আহমেদ ও আফিফ আহমেদ দুজনের বাড়িই লালমনিরহাটে। গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন তারা। দেখেছেন কৃষকের সুখ-দুঃখ। ভেবেছেন, তাদের পাশে কীভাবে দাঁড়ানো যায়? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে তারা তৈরি করেছেন প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি উদ্যোগ ‘সিস্টেমসেজ ফার্ম জিনিয়াস অন্বেষণ’। সাব্বির রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। দল গঠন, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নকাজ পরিচালনা করেন। তার বন্ধু মালয়েশিয়ার সানওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সফটওয়্যার প্রকৌশলী আফিফ আহমেদ তথ্য, পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা করেন। তাদের দলে রুয়েটের রিজভি, ফারিয়া, তন্ময়, অরিত্রিসহ ছয়জন স্থায়ী সদস্য কাজ করেন। অনিয়মিতভাবে আছেন আরও কয়েকজন।
উদ্যোগটির টিম লিডার সাব্বির বললেন, “আমাদের স্টার্টআপটির শুরু ২০২৩ সালের নভেম্বরে। প্রথম তৈরি করেছি ‘স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার মনিটরিং সিস্টেম’। এতে কৃষিজমির পুষ্টি উপাদান, মাটির আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, পিএইচসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা যায়। পরিবেশের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ুচাপ পরিমাপ করা সম্ভব। এসব তথ্য সেন্সর সংগ্রহ করে ক্লাউডভিত্তিক ড্যাশবোর্ডে পাঠায়। তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে পাওয়া ফলাফলের মাধ্যমে কখন, কী পরিমাণ সেচ ও সার প্রয়োগ করতে হবে— মোবাইলের মাধ্যমে কৃষক জানতে পারেন। পরে এই সিস্টেমে যুক্ত করা হয় ‘অটোমেটেড ইরিগেশন সিস্টেম’। এই প্রযুক্তিতে মাটির আর্দ্রতা মেপে সঠিক সময়ে সেচ দেওয়া যায়।”
মাত্র ২০ ওয়াটের সৌর প্যানেল ও ১২ ভোল্টের ব্যাটারিতে সিস্টেমটি চালানো হচ্ছে। ফলে প্রচলিত বিদ্যুৎ নির্ভরতাও নেই। প্রতি তিন মিনিটে মোবাইলে তথ্য দিতে পারে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোনমি অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুল হকের তত্ত্বাবধানে প্রযুক্তিটি মাঠপর্যায়ে নিতে কয়েকবার পাইলটিং করা হয়। রাজশাহীর ২০টির বেশি কৃষিজমিতে পরীক্ষামূলক ব্যবহার করা হয়। এতে ইতিবাচক ফল পাওয়া গিয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) গবেষক এবং বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও রয়েছে দলটির। তারা সেখানে ‘সিস্টেমসেজ ফার্ম জিনিয়াস অন্বেষণ’ প্রযুক্তিটি উপস্থাপন করেন। তারপর বারির জামালপুর আঞ্চলিক কেন্দ্রে সফল বাস্তবায়ন করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন মাঠপর্যায়ে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করেন। তাদের গবেষণাক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। শাহাদাত হোসেন বললেন, ‘এই প্রযুক্তিতে সেন্সরের মাধ্যমে মাটির অম্লতা-ক্ষারত্ব, এনপিকে, আর্দ্রতা, তাপমাত্রাসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত তথ্য পাওয়া সম্ভব। মাত্র ২০ ওয়াটের সৌর প্যানেল ও ১২ ভোল্টের ব্যাটারিতে সিস্টেমটি চালানো হচ্ছে। ফলে প্রচলিত বিদ্যুৎ নির্ভরতাও নেই। প্রতি তিন মিনিটে মোবাইলে তথ্য দিতে পারে। মাটির আর্দ্রতা কমলে রিডিং দেখানো, সেচের প্রয়োজনীয় সংকেত এবং পুষ্টি উপাদান কমলে লাল ইন্ডিকেটর জ্বলে নির্দেশনা দেয়। প্রচলিত নিয়ন্ত্রিত তাপে নমুনা শুকিয়ে আর্দ্রতা নির্ণয়ের পদ্ধতিতে মাটির আর্দ্রতার তথ্য পেতে অন্তত ২৪ ঘণ্টা লাগলেও এর সেন্সর তাৎক্ষণিকভাবে প্রদান করে। সহজে অন্য স্থানে ব্যবহারের সুবিধাও রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, আইওটির কল্যাণে ঘরে বসেই সব জানা সম্ভব হচ্ছে এবং প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় সেন্সরের তথ্যের নির্ভরযোগ্যতাও বেশি।’
২০২৪ সালের জেন-সিটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মালয়েশিয়ার সানওয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও রুয়েটের যৌথ উদ্যোগে এ বিষয়ে তাদের প্রকাশিত গবেষণাপত্র সেরার সম্মাননা লাভ করে। একই বছর বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয় ইনোভেশন হাবে (রুয়েট আইসি-৩) প্রযুক্তিটি সেরা নির্বাচিত হয়। ২০২৫ সালে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে ইয়ুথ স্টার্টআপ সামিটে রানার্সআপ ও ২ লাখ টাকার অনুদান লাভ করে। বারি আয়োজিত কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রতিযোগিতায় রুয়েট অঞ্চলে চ্যাম্পিয়ন এবং জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় রানার্সআপ হয়।







