সাধারণ উপকরণেই সালামের অসাধারণ সমাধান

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
ঢাকার বিষাক্ত বাতাসকে কীভাবে সাধারণ মানুষের নিঃশ্বাসের যোগ্য করা যায়, সেই চিন্তায় তার ল্যাবরেটরির বাতি জ্বালিয়ে রাখেন মধ্যরাত অবধি। নাম তার অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম। তার এই দীর্ঘ যাত্রার শুরু হয়েছিল নব্বইয়ের দশকের শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের গবেষণাগারে। স্নাতকোত্তরের থিসিসেই তিনি কাজ করেছিলেন পরিবেশ থেকে ক্ষতিকর ভারী ধাতু বা টক্সিক ধাতু অপসারণ নিয়ে। গবেষণার শুরুটা ছিল অনেকটা নীরবে। কিন্তু ২০০৩ সালে ঢাকা শহরের বায়ুদূষণের রাসায়নিক উপাদান নিয়ে করা তার একটি গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ‘টেরাক এনভায়রনমেন্ট’ জার্নালে প্রকাশিত সেই কাজটিতেই প্রথম উঠে আসে ঢাকার বাতাসের রাসায়নিক ক্যারেক্টারাইজেশন, যা আজ পর্যন্ত ৩০০ বারের বেশি সাইটেশন বা উদ্ধৃতি পেয়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি জমান ইউরোপে। কানাডার ডালহৌসি ইউনিভার্সিটিতে পোস্ট-ডক সম্পন্ন করেন। কানাডায় তার গবেষণার বিষয় ছিল আরও জটিল, সেখানে ‘ক্লাউড চেম্বার’ বা কৃত্রিম মেঘ তৈরির প্রকোষ্ঠে তিনি পরীক্ষা করেছেন কীভাবে বায়ুদূষণ বরফকণা ও বৃষ্টির ওপর প্রভাব ফেলে। বিদেশের চাকচিক্যময় জীবন আর হাতছানি ছেড়ে তিনি ফিরে আসেন প্রিয় জন্মভূমিতে। কারণ, নিজ দেশের বাতাসকে বিষমুক্ত করার এক দুর্নিবার তাগিদ অনুভব করেছিলেন তিনি।
ড. সালামের গবেষণার সবচেয়ে আলোচিত দিক হচ্ছে অতি সাধারণ জিনিস দিয়ে অসাধারণ সমস্যার সমাধান করা। তিনি ও তার গবেষক দল উদ্ভাবন করেছে সাধারণ ডিমের খোসা ব্যবহার করে বাতাস থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও বিষাক্ত সিসা শোধনের এক অভিনব প্রযুক্তি। ডিমের খোসার ক্যালসিয়াম কার্বনেট ও অক্সাইডকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় কাজে লাগিয়ে এই পিউরিফিকেশন সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে। সিসাদূষণ বাংলাদেশের জন্য একটি ভয়াবহ সমস্যা। আর এই সহজলভ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিল্পকারখানার চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়া শোধন করা সম্ভব। তিনি স্বপ্ন দেখেন, দেশের বড় বড় কারখানার ধোঁয়া নির্গমনের পথে ‘এক্সজস্ট ফিল্টার’ বসিয়ে বিষাক্ত বাতাসকে নির্মল করা হবে।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার সঙ্গে বাংলাদেশের বৈজ্ঞানিক সেতুবন্ধ তৈরিতে ড. সালামের ভূমিকা অগ্রগণ্য। ২০১৩ সালে তার একক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে প্রথম ‘অ্যারোনেট’ রোবট স্থাপিত হয়। এখন সুইডেনের স্টকহোম ইউনিভার্সিটি, জাপানের সি-ইনস্টিটিউট ও যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটির সহযোগিতায় বঙ্গোপসাগরের কূলে তার তত্ত্বাবধানে একটি অত্যাধুনিক মানমন্দির পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে ২ হাজার ২০০ স্কয়ার ফুটের একটি ভবনের ওপর স্থাপিত ৪২ ফুট উঁচু টাওয়ার থেকে দিন-রাত বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় ও কঠিন কণা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি (শিক্ষা) হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। প্রশাসনিক শত ব্যস্ততার মধ্যেও সপ্তাহে একটি দিন কাটান গবেষণাগার ও ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে। তিনি চান, তার শিক্ষার্থীরা যেন কেবল তত্ত্বীয় জ্ঞানে সীমাবদ্ধ না থাকে; তারা যেন হাতে-কলমে গবেষণা করে।




