আসুন কান পেতে শুনি

হাফেজ আলহাজ মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলছেন ‘গোল্ড ক্লাব’-এর পরিচালক দন্ত্যস রওশন
প্রবীণদের নিয়ে কখনো তেমন আলোচনা হয়নি। এর আগে এ ধরনের কোনো আয়োজনও হয়নি। আমাদের কথা আপনারা ভেবেছেন, সেজন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাই— এমনটাই আক্ষেপভরা কণ্ঠে বলছিলেন একজন প্রবীণ। বলছি আগামীর সময়-এর গোল্ড ক্লাবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কথা।
গত ৮ মে গাইবান্ধা জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় এ আয়োজন। শুরুতেই দর্শক সারিতে বসা প্রবীণদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছিলাম। তাদের উচ্ছ্বাস দেখে আপ্লুত হলাম। চারদিকে শুধু প্রবীণ মানুষ। একজন প্রবীণ মন্তব্য করলেন, ‘আমরা আমরাই তো।’ এমন আয়োজনে তারা সত্যিই আনন্দিত। তরুণ সমবয়সীরা একত্র হলে যেমন চারদিকে প্রাণের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি প্রবীণরাও উচ্ছ্বাস ছড়ালেন। একজন স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘এ ধরনের কোনো আয়োজনে আগে কখনো অংশ নিয়েছি বলে মনে পড়ে না।’
আমন্ত্রিতদের অধিকাংশের বয়স ছিল সত্তরের ওপরে। সবার চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। উপস্থিত ছিলেন ১৫৩ জন প্রবীণ। অনুষ্ঠানের শুরুর দিকে আগামীর সময়ের সম্পাদক মোস্তফা মামুনের ভিডিও বার্তা শুনে তারা গোল্ড ক্লাব সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করেন। বললাম, ‘আমরা প্রবীণদের আজীবন সম্মানের আসনে রাখতে চাই। আপনাদের পাশে থাকতে চাই।’
তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে তাদের মঞ্চে আমন্ত্রণ জানালাম। একে একে তারা উঠে এলেন মঞ্চে। তারুণ্যের উচ্ছ্বাস বুকে নিয়ে প্রবীণরা মঞ্চে দাঁড়ালেন। বললাম, ‘এই মঞ্চ আপনাদের। আমরা কোনো কথা বলব না। গোল্ড ক্লাবের মঞ্চ শুধু আপনাদের জন্যই।’
মঞ্চে সবার স্থান সংকুলান হলো না। প্রবীণদের আশাতীত উপস্থিতি আমাদের মনে আশার সঞ্চার করল।
বললাম, ‘আমাদের মাঝে এমন একজন আছেন, যার বয়স ৮৯ বছর। তিনি এখন গোল্ড ক্লাবের উদ্বোধন ঘোষণা করবেন।’
সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন তীব্র প্রতিবাদ করে উঠলেন, ‘আরে, কী বলেন! আমাদের মাঝে তো ১০০ বছরের একজন আছেন। উদ্বোধন তিনিই করবেন।’
করতালিতে মুখর হয়ে উঠল মিলনায়তন। পেছনের সারি থেকে তাকে সামনে নিয়ে আসা হলো। কী পবিত্র তার চেহারা! মুখে লেগে আছে মধুর হাসি।
তিনি হাফেজ আলহাজ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম। তার বাম হাতে একটি লাল গোলাপ। বহুমাত্রিক ফাউন্ডেশনের তরুণ বন্ধুরা প্রত্যেক প্রবীণের হাতে একটি করে লাল গোলাপ তুলে দিয়েছিল। আমি তার ডান হাতে মাইক্রোফোন তুলে দিলাম। হাসিমুখে তিনি বললেন, ‘আল্লাহ আপনাদের ওপর রহম করুন। আপনারা যে কাজে নেমেছেন, আল্লাহ যেন সেই কাজে সফলতা দান করেন।’
উদ্বোধন ঘোষণার পর করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠল গাইবান্ধা জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তন।
মঞ্চ সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। বললাম, ‘আজ আপনারাই সব। আপনারাই এই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, আপনারাই বিশেষ অতিথি। অন্য কেউ নয়। আপনাদের যার যা বলার আছে, চলে আসুন গোল্ড ক্লাবের মঞ্চে।’
একে একে মঞ্চে উঠে এলেন তারা। আবেগঘন কথামালায় উজাড় করে দিলেন হৃদয়ের নির্যাস। কী বলেছেন সেদিন? আসুন, আমাদের সেই প্রবীণদের কথা কান পেতে শুনি। আশপাশের প্রবীণদের কথা শোনার চেষ্টা করি।
এস. এম. আমজাদ হোসেন দীপ্তি বলেছেন, ‘আমি এই অনুষ্ঠানে এসে অভিভূত। তরুণের শক্তি আর প্রবীণের যুক্তি— এই দুটির সমন্বয়েই দেশের মুক্তি।’
প্রফেসর মুকুল বলেছেন, ‘ক্লাবের সুন্দর নামকরণের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই। যারা এখানে আছেন তারা গোল্ড। আশা করি ভবিষ্যতে ডায়মন্ড হয়ে যাবেন।
আলী আকবর মিয়া বলেছেন, ‘বয়স্ক মানুষদের আমন্ত্রণ জানিয়ে সম্মান জানানোর জন্য আমি অভিভূত।’
মো. আব্দুল হালিম আকন্দ বলেছেন, ‘আমি গ্রামগঞ্জে ঘুরে অনেক প্রবীণের দুঃখ-কষ্ট দেখেছি। গোল্ড ক্লাব শুধু গাইবান্ধা জেলায় নয়, ইউনিয়ন পর্যায়েও ছড়িয়ে দিতে হবে। আপনারা যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, এর চেয়ে ভালো কাজ আর হতে পারে না।’
মো. শাজাহান খন্দকার বলেছেন, ‘বৃদ্ধ বাবা-মায়ের খবর অনেক সন্তানই রাখে না। আমরা আর সমাদৃত নই। সমাজে আমরা গোল্ড নই, বরং বোল্ড হয়ে যাচ্ছি। আমাদের যথাযথ সম্মান করা হচ্ছে না।’
সংগীতশিল্পী জাফরিন আলম বলেছেন, ‘এই প্রথম প্রবীণদের নিয়ে এ ধরনের আয়োজন দেখলাম। আমাদের কেউ খোঁজ নেয় না। আমরা যারা প্রবীণ, পরস্পরকে যেন ভুলে না যাই। আমাদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হোক, আড্ডা হোক, গল্প হোক।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল আলম বলেছেন, ‘অনেক বয়স্ক মানুষ চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। সন্তানরাও খোঁজ নিচ্ছে না। আপনাদের মাধ্যমে সরকারের কাছে দাবি জানাই, প্রবীণদের জন্য বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করা হোক।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুর রশিদ আখনি বলেছেন, ‘ঘরে মা মৃত পড়ে থাকেন, সন্তান তা জানে না। আমাদের ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনিদের এমন শিক্ষা দিতে হবে, যাতে এ ধরনের ঘটনা আর কখনো না ঘটে।’
মোসাম্মৎ সুফিয়া বেগম বলেছেন, ‘প্রবীণদের নিয়ে কেউ কখনো আলোচনা করেনি। এর আগে গাইবান্ধায় এমন আয়োজনও হয়নি। আপনারা যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আপনারা যেন সফল হন।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা মাকসুদুর রহমান শাহান বলেছেন, ‘প্রবীণদের কথা ও ব্যথা বলার সুযোগ দেওয়ার জন্য আগামীর সময়ের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আমরা যদি নিজেরাই উদ্যোগ নিই এবং জাকাতের অর্থ আমাদের মধ্যেই বণ্টন করি, তাহলে সন্তানদের যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে না।
প্রফেসর খলিলুর রহমান বলেছেন, হাসপাতালগুলোয় একটি প্রবীণ কর্নার থাকা উচিত, যাতে রাস্তায় কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লেও সেখানে চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন।’
মনসুর আলী বলেছেন, ‘প্রবীণরা শুধু অধিকারবঞ্চিতই হচ্ছেন না, তারা সমাজে নানাভাবে অসম্মান ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। অনেক সময় ঠাট্টা-বিদ্রূপেরও শিকার হতে হচ্ছেন।’
আখতারুজ্জামান ফারুকী ঢাকায় এক বৃদ্ধা মায়ের ঘরে মৃত পড়ে থাকার ঘটনা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘ব্যথাভারাক্রান্ত চিত্তে দিন কাটাচ্ছি। তবে এই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পেয়ে আমার কষ্ট কিছুটা কমেছে। আগামীর সময়ের এই আয়োজনে আমি আশার একটি ক্ষীণ আলো দেখতে পাচ্ছি।’
পরিচালক
কিডস ক্লাব, ক্যারিয়ার ক্লাব ও গোল্ড ক্লাব




