ত্বকেরও চাই ছুটি

মডেল: আশনা হাবিব ভাবনা; সাজ: শামীম; ছবি: মঞ্জু আলম
আরও উজ্জ্বল ত্বক, নিখুঁত টেক্সচার, দাগহীন আর কম বয়সী দেখানোর প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রূপচর্চায় বাড়তে থাকে প্রসাধনীর সংখ্যাও। এর বিপরীতে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে স্কিন ফাস্টিং ধারণাটি। লিখেছেন প্রিয়াঞ্জলি রুহি
আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের মুখটা কেমন মলিন লাগে! অথচ যত্নের কমতি নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ক্লিনজার, টোনার, সিরাম, ময়েশ্চারাইজার, সানস্ক্রিন ব্যবহারের পালা শুরু হয়। রাতে ফের একের পর এক রেটিনল, ভিটামিন-সি, স্ক্র্যাব, ফেস মাস্ক... কত কী। ত্বকের যত্ন নিতে নিতে কখন যে রূপচর্চা একটি লম্বা তালিকায় পরিণত হয়, অনেকে তা খেয়াল করেন না। এতকিছুর পরও অস্বস্তি পিছু ছাড়ে না! মুখে টান লাগে, জ্বালা করে, হঠাৎ দু-একটা ব্রণ উঁকি দেয়। ত্বক দেখায় নিস্তেজ। তখন মনে হয়, হয়তো আরও একটা সিরাম দরকার। অথচ এমন মুহূর্তে ত্বকের প্রয়োজন নতুন কিছুর সংযোজন নয়, বরং একটু বিরতি। এ ভাবনা থেকেই সৌন্দর্যচর্চায় জনপ্রিয়তা পেয়েছে স্কিন ফাস্টিং বা ত্বকের উপবাস। অভিনব শোনালেও ধারণাটি বেশ সহজ। ত্বকের ওপর থেকে কিছুদিনের জন্য বাড়তি প্রসাধনীর চাপ কমিয়ে দেওয়া। অর্থাৎ, ত্বকে আরও কী ব্যবহার করব, সেই ভাবনার বদলে কিছুদিন কী ব্যবহার না করলেও চলবে, সেটি পরখ করা।
ত্বকের উপবাস
স্কিন ফাস্টিংকে অনেকে ত্বকের ডিটক্স ভাবেন। কিন্তু প্রসাধনীর ব্যবহার বন্ধ করলেই ত্বক থেকে বিষাক্ত পদার্থ বেরিয়ে যাবে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ত্বককে কিছুটা সময় নিজের মতো থাকতে দিয়ে নানারকম প্রসাধনসামগ্রী ব্যবহার একেবারে বন্ধ করে দিতে হবে, এমনটাও নয়। বরং এ প্রবণতার সবচেয়ে বাস্তব দিক হলো অতিরিক্ত যত্ন নেওয়া থেকে একটু সরে এসে ত্বককে সহজ রুটিনে ফিরিয়ে আনা।
এ প্রবণতার সবচেয়ে বাস্তব দিক হলো অতিরিক্ত যত্ন নেওয়া থেকে একটু সরে এসে ত্বককে সহজ রুটিনে ফিরিয়ে আনা
জাপানি সৌন্দর্যচর্চার সঙ্গে স্কিন ফাস্টিংয়ের ধারণাটির সংযোগ বেশ পুরনো। সে দেশের পারসোনাল কেয়ার ব্র্যান্ড মিরাই ক্লিনিক্যাল ২০১১ সালের দিকে ধারণাটি সামনে আনে। তাদের পদ্ধতি সপ্তাহে এক রাত ময়েশ্চারাইজার না মেখে ত্বককে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছিল। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিউটি দুনিয়ায় এর নানা ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ে। তবে এটি কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত কিংবা সর্বজনীন নয়। তাই ত্বকের উপবাস মানে সব প্রসাধনী একসঙ্গে সরিয়ে ফেলা নয়; বরং প্রয়োজন বুঝে রুটিনকে কিছুদিন সহজ ও শিথিল করে আনা।
ক্লান্তির কারণ
ত্বকের নিজস্ব সুরক্ষাব্যবস্থা আছে। একে বলা হয় স্কিন ব্যারিয়ার। আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং বাইরের নানা ধরনের বিরূপ প্রভাব থেকে ত্বককে রক্ষা করার কাজে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিদিন খুব বেশি ক্লিনজিং, ঘন ঘন স্ক্র্যাব বা এক্সফোলিয়েশন কিংবা একসঙ্গে অনেক ধরনের শক্তিশালী প্রসাধনী পণ্য ব্যবহার করলে এ সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তখন ত্বকে দেখা দেয় শুষ্কতা, খসখসে ভাব, লালচে ভাব কিংবা জ্বালাপোড়া। বিশেষ করে রেটিনল, এএইচএ, বিএইচএ বা অন্য কোনো এক্সফোলিয়েটিং উপাদান অতিরিক্ত ব্যবহার করলে এমন অস্বস্তির ঝুঁকি বাড়ে। আমাদের দেশের গরম-আর্দ্র আবহাওয়ায় এ বিষয়গুলো আরও খারাপ লাগার উদ্রেক ঘটায়। বাইরে বের হলেই ঘাম, ধুলোবালি, যানবাহনের ধোঁয়া; ঘরে ফিরে দীর্ঘ সময় এসির শুষ্ক বাতাস— এতকিছুর সঙ্গে আবার যদি ত্বকের ওপর একের পর এক প্রসাধনীর স্তর যোগ হতে থাকে, সংবেদনশীল ত্বকে অস্বস্তি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তখন ত্বককে আরও কিছু দিয়ে মেরামত করার চেষ্টা না করে রূপচর্চার রুটিন একটু বদলে নেওয়া ভালো।
স্কিন ফাস্টিংয়ের পদ্ধতি
প্রথমেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ত্বক খেয়াল করে দেখুন। যদি ত্বক স্বাভাবিক থাকে, তাহলে সব প্রসাধনী বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু যদি মনে হয় অনেক পণ্য একসঙ্গে ব্যবহারের পর ত্বক জ্বালা করছে, লাল হয়ে যাচ্ছে, অস্বাভাবিক শুষ্ক লাগছে বা টান ধরছে, তাহলে কয়েক দিনের জন্য রুটিন বদলে নিন। সকালে মৃদু ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে প্রয়োজনে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে পারেন। বাইরে বের হলে সানস্ক্রিন মাখতে ভুলবেন না যেন। রাতে আবার মৃদু ক্লিনজিং, এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার করা সম্ভব।
স্কিন ফাস্টিংকে অনেকে ত্বকের ডিটক্স ভাবেন। কিন্তু প্রসাধনীর ব্যবহার বন্ধ করলেই ত্বক থেকে বিষাক্ত পদার্থ বেরিয়ে যাবে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ত্বককে কিছুটা সময় নিজের মতো থাকতে দিয়ে নানারকম প্রসাধনসামগ্রী ব্যবহার একেবারে বন্ধ করে দিতে হবে, এমনটাও নয়
এ সময়ে রেটিনল, এএইচএ বা বিএইচএ, স্ক্র্যাব, পিলিং বা একাধিক সিরাম থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়া যেতে পারে। ত্বক স্বাভাবিক হলে পরে প্রয়োজন বুঝে ধীরে ধীরে ফের ব্যবহার করতে পারবেন। তবে ময়েশ্চারাইজার সবার জন্য বাদ দেওয়া ঠিক নয়। ত্বক শুষ্ক হলে এর প্রয়োগ প্রয়োজন। কেননা, ময়েশ্চারাইজার বন্ধ করলে ত্বক নিজে থেকে প্রয়োজনীয় তেল তৈরি করার সুযোগ পাবে— এমন ধারণার শক্ত কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
সবকিছুকে ছুটি নয়
ত্বকে অস্বস্তি হচ্ছে বুঝেই এক রাতে দশটা প্রোডাক্ট ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়াও খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ পরে কোনটি ত্বকের সমস্যা তৈরি করছিল, তা বোঝা কঠিন হবে। এজন্য ধীরে ধীরে পণ্য কমানো ভালো। ধরা যাক, রাতে রেটিনল, এএইচএ ও সিরাম— তিনটিই ব্যবহার করছেন। ত্বকে যদি কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, তাহলে এ পণ্যগুলো থেকে বিরতি নিয়ে কিছুদিন শুধু মৌলিক যত্নে অভ্যস্ত হতে পারেন। পরে সময়মতো একটি করে পুরনো পণ্য ফিরিয়ে আনুন। এতে আপনার ত্বক কোন উপাদান পছন্দ করছে আর কোনটি করছে না, তা সহজেই বোঝা সম্ভব হবে।
ত্বকে অস্বস্তি হচ্ছে বুঝেই এক রাতে দশটা প্রোডাক্ট ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়াও খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ পরে কোনটি ত্বকের সমস্যা তৈরি করছিল, তা বোঝা কঠিন হবে। এজন্য ধীরে ধীরে পণ্য কমানো ভালো
ত্বক চেনা
রূপচর্চার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্ভবত কোনো ক্রিম বা সিরাম নয়; বরং নিজের ত্বককে বুঝতে পারা। মুখ ধোয়ার পর খুব টানটান লাগে? নতুন কোনো সিরাম ব্যবহারের পর জ্বালা করে? ছোট ছোট দানা বা ফুসকুড়ি উঠছে? প্রতিদিন এক্সফোলিয়েট করার পর ত্বক আরও শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে? একটু খেয়াল রাখুন। এসব সমস্যার সমাধান কিন্তু নতুন কোনো প্রসাধনী নয়। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এ সময়ে অন্যের রুটিন দেখে নিজের ত্বকের জন্য একই পণ্য কেনার প্রবণতা ঠিক নয়। কারও দশ ধাপের রুটিন তার ত্বকের জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে; আপনার জন্যও সেটি জুতসই— এমনটা ভাবার কারণ নেই। সুন্দর ত্বকের জন্য অনেক রকম প্রসাধনের প্রয়োজন, এ ধারণার বদলে বরং ভাবুন আপনার ত্বকে সত্যিই কী দরকার।
কৈশোরের রুটিন
বিউটি ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রভাবে অল্প বয়সীদের মধ্যেও নানা ধরনের প্রসাধনী ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অথচ কিশোর বয়সে ত্বকের জন্য সবসময় এতকিছু প্রয়োজন হয় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এ সময়ে অন্যের রুটিন দেখে নিজের ত্বকের জন্য একই পণ্য কেনার প্রবণতা ঠিক নয়
মৃদু ফেসওয়াশ, ত্বকের প্রয়োজন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার এবং নিয়মিত সানস্ক্রিন— এতেই তাদের ত্বক ভালো থাকে। অন্যদিকে ব্রণ বা অন্য কোনো ত্বকসমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে ভুলবেন না।
সানস্ক্রিনের নেই ছুটি
স্কিন ফাস্টিং করলেও দিনের বেলায় বাইরে বের হওয়ার সময় সানস্ক্রিন বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি মাত্রার এবং ব্রড-স্পেকট্রাম যুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার করা ভালো। এ ছাড়া তীব্র রোদে ছাতা, টুপি বা শরীর ঢাকা পোশাকও সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি থেকে সুরক্ষায় কাজে আসে।
কখন দরকার (বক্স আইটেম)
মুখে হঠাৎ জ্বালাপোড়া, পরিচিত প্রসাধনী ব্যবহারে অস্বস্তি, ত্বক খুব শুষ্ক হয়ে টানটান লাগা, খসখসে হয়ে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক রকমের লাল দেখানো— এসব লক্ষণকে উপেক্ষা করে আরও নতুন পণ্য যোগ করবেন না। এমন পরিস্থিতিতে বরং বিউটি রুটিন থামিয়ে দিন। তবে ত্বকে যদি দীর্ঘদিন ধরে ব্রণ, একজিমা, রোসেসিয়া, র্যাশ বা অন্য কোনো সমস্যা থাকে, কিংবা চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ বা স্কিন কেয়ার ব্যবহার করতে হয়, নিজের মতো করে তা বন্ধ করা যাবে না। সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শই সবচেয়ে জরুরি।








