টোটো কোম্পানি
উদয়পুর রাজপ্রাসাদে

প্রাসাদে প্রবেশের দরজা। ছবি: লেখক
উদয়পুরের আরেক নাম রোমান্টিক সিটি অব ইন্ডিয়া। রাজস্থানের এ শহর এবং এখানকার রাজপ্রাসাদ নিয়ে লিখেছেন ফাতিমা জাহান
সরোবরের সামনে রাজপ্রাসাদ। সূর্য একটু হেলে পড়লেই পানিতে প্রাসাদের ছায়া পড়ে। এ সরোবর ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি সমৃদ্ধিশালী লোকালয়। উদয়পুর। এ নগরকে ভারতের লেক সিটি বলা হয়। এর রূপে মুগ্ধ হয়ে ব্রিটিশ সেনানায়ক জেমস টড নাম দিয়েছিলেন রোমান্টিক সিটি অব ইন্ডিয়া।
এ লেক সিটি রাজস্থানের মাঝে আমার প্রিয় শহর। মহারাজা উদয় সিং ১৫৫৩ সালে চিত্তোর (রাজস্থানের আরেকটি শহর) থেকে এ নগরে চলে আসেন। বর্তমান রাজপরিবারের সদস্যরা উদয়পুরে মহারাজা উদয় সিং নির্মিত রাজপ্রাসাদে বাস করছেন। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর রাজ্য আর টেকেনি। সামান্য জমি, মূল্যবান পাথরের ব্যবসা আর হোটেল হিসেবে রাজপ্রাসাদকে ভাড়া দিয়ে তাদের চলতে হয়। তবে রাজস্থানের সব প্রাসাদই বেশ ভালো অবস্থায় আছে।
উদয়পুরে আমি উঠেছি রাজপ্রাসাদেরই একটা অংশে। একসময় রাজপ্রাসাদ বিস্তৃত ছিল অনেক দূর অবধি। কারণ রাজ্যের কর্মচারীরাও রাজপ্রাসাদের ভেতরেই আলাদা ভবনে বাস করতেন। এখন শুধু মূল রাজপ্রাসাদটি প্রাসাদ আকারে রয়ে গেছে। বাকি সব সম্পত্তি রাজার পরিবার বিক্রি করে দিয়েছে। লেকের মাঝে ভাসমান একটি প্রাসাদকে পাঁচতারকা হোটেল বানিয়ে রাজপরিবার ভাড়া দিয়েছে। ভারত ও বিদেশের সব সেলিব্রেটি এখানে এসে বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আমার হোটেলটি রাজপ্রাসাদের মূল দেয়াল লাগোয়া। সামনে স্বচ্ছ নীল জলের লেক দেখা যায়, আবার বাঁ দিকে তাকালেই রাজপ্রাসাদ ভেসে ওঠে চোখের সামনে। হোটেলের সাজসজ্জা রাজপ্রাসাদের মতোই।
প্রাসাদের ছাদে রয়েছে ‘বারি মহল’ নামে এক খোলা উদ্যান, যার মাঝে রাজকীয় সুইমিং পুল। মাকরানা মার্বেল পাথরের তৈরি এ মহলে রয়েছে ১১১টি সুসজ্জিত স্তম্ভ। এই উদ্যান থেকে পুরো শহর দেখা যায়
রাজস্থান হলো ভারতের সবচেয়ে রঙিন রাজ্য। এখানকার অধিবাসীরা পোশাকে সবাই রঙিন। খাবারের বৈচিত্র্য আর অতুলনীয় স্বাদ ভোলার নয়। বিশেষ করে মিষ্টি যে কত রকমের হয়, রাজস্থান না এলে বুঝবেন না! স্থানীয়দের আতিথেয়তায় নিজেকে রাজপরিবারের একজন মনে হবে।
উদয়পুরের প্রথম দর্শনীয় স্থান রাজপ্রাসাদ। নাশতা সেরে চললাম সেটি দেখতে। রাজপ্রাসাদ তো আসলে পাশেই। একটু ঘুরে শুধু সদর দরজা অবধি হেঁটে যেতে হয়। মহারাজা উদয় সিংয়ের নামে এ নগরের নামকরণ। মহারাজা চিত্তোর থেকে এসেই নিজ পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রাসাদ নির্মাণ করেন। সেটিই এ উদয়পুর সিটি প্যালেস। এ প্রাসাদ নির্মাণের জন্য সবচেয়ে দামি পাথর, সোনা, রুপা, কাচ, কাঠ ব্যবহার করা আর সবচেয়ে নামকরা শিল্পীদের ডেকে আনা হয়েছিল। পরবর্তীকালে মহারাজা উদয় সিংয়ের বংশধররা প্রাসাদের অল্প কিছু অংশ পরিবর্তন, পরিমার্জন করেন।
প্রাসাদের মূল তোরণ পার হতেই দেখা মেলে বড় তোরণ ‘ত্রিপোলি দরজা’র। অফ-হোয়াইট রঙের কারুকাজ করা এ দরজা দিয়ে রাজা হাতিতে চড়ে প্রবেশের সময় দুপাশ থেকে নাকাড়া বাজানো হতো। এটি পেরিয়ে খানিকটা হাঁটলেই মূল প্রাসাদ। বাইরে থেকে দেখতে সাধারণ মনে হলেও এর ওপরের তলার বারান্দায় ছাতার মতো বিশেষ ‘ছাতরি’ ডিজাইন ও ভেতরে সূক্ষ্ম কারুকাজ রয়েছে। উঁচু ও অলংকৃত প্রবেশদ্বারে রাজা এবং ফুল-লতাপাতার ছবি আঁকা। ভেতরে বিশাল আঙিনা পেরিয়ে মিউজিয়াম অংশে ঢুকলে রাজস্থানি যোদ্ধাদের যুদ্ধাস্ত্র, বর্ম এবং সোনা দিয়ে কারুকাজ করা তলোয়ার, পিস্তল ও বন্দুকের বিশাল সংগ্রহ দেখা যায়।
আরাভালি পর্বত ও সরোবর দিয়ে ঘেরা উদয়পুরকে আক্রমণ করা কঠিন ছিল বলেই রাজা উদয় সিং এটিকে বেছে নিয়েছিলেন। সিঁড়ি বেয়ে পরের মহলে গেলে কষ্টিপাথরের প্রাচীন দেবদেবী ও ‘নয় চৌকি মহলে’ রাজার সংবর্ধনাস্থল দেখা যায়। প্রাসাদের ছাদে রয়েছে ‘বারি মহল’ নামে এক খোলা উদ্যান, যার মাঝে রাজকীয় সুইমিং পুল। মাকরানা মার্বেল পাথরের তৈরি এ মহলে রয়েছে ১১১টি সুসজ্জিত স্তম্ভ। এই উদ্যান থেকে পুরো শহর দেখা যায়। শত্রুর আক্রমণ রুখতে এখানকার নামার সিঁড়িগুলো সরু এবং এতে বন্ধ হয়ে যাওয়া গুপ্ত পথও রয়েছে।
নিচের তলায় রাজার শোবার ঘর ‘শিশমহল’ বা কাচের মহল অবস্থিত। অসংখ্য আয়নার টুকরো ও লাল কাচে তৈরি এ মহলের গম্বুজ আকৃতির সিলিং এক চমৎকার পরিবেশ তৈরি করে। এর সঙ্গে থাকা তিনটি কক্ষে রয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও রঙিন ‘মিনিয়েচার পেইন্টিং’, যাতে রাজা-রানীর জীবনযাত্রা ফুটে উঠেছে। পরের নকশাদার টাইলসে ঘেরা কক্ষটি লাইব্রেরি, যার দুর্লভ বইগুলো এখন রাজপরিবারের বাসস্থানে সংরক্ষিত।
এরপর ‘মোতি মহল’, যার রঙিন কাচঘেরা বারান্দা থেকে রাজপরিবারের নারীরা নিচের ‘দিওয়ান এ আম’-এর নাচ-গান ও দরবারি কার্যক্রম দেখতেন। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো ‘দিওয়ান এ খাস’, যেখানে বিদেশি অতিথি ও মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক হতো। এর নিচের অংশে কাচের টুকরো দিয়ে তৈরি চমৎকার ময়ূর রয়েছে, যা ‘মোর চওক’ নামে পরিচিত।
‘মানাক মহল’ ছিল রাজার খাবার ঘর, যার রঙিন আয়নার কারণে যেকোনো প্রতিবিম্ব দেয়ালে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ পেরিয়ে এলে পড়ে ‘জেনানা মহল’ বা নারীদের বাসস্থান, যেখানে পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ এবং সুরক্ষায় জেনানা ফৌজ ছিল। এখানে রানীদের পোশাক, আসবাব ও পূজার সামগ্রী সাজানো রয়েছে। জেনানা মহলের পরের বিশাল অংশে উদয়পুরের বিভিন্ন সময়ের প্রাচীন দেবদেবীর ভাস্কর্য সংরক্ষিত আছে।
রাজস্থান বিখ্যাত সংগীত কলার জন্য। এ প্রাসাদে আলাদা বিশাল একটি মহল আছে শুধু বাদ্যযন্ত্র প্রদর্শনীর জন্য। একদম নিচের মহলটি হলো রুপার মহল। রাজা-রানীদের ব্যবহৃত রুপার তৈজসপত্র, পূজার সরঞ্জাম, চিরুনি, সাজগোজের বাক্স, খড়ম, এমনকি চেয়ার, হাতির পিঠের হাওদা, ঘোড়ার গাড়ি ইত্যাদি এখানে সাজানো আছে। এ ছাড়া স্বর্ণ দিয়ে তৈরি নানা ডেকোরেশন পিস, ঘড়ি ইত্যাদিও রাখা আছে অন্য একটি কক্ষে।
এ প্রাসাদ এত বড়, একবার শুধু অনুমতিপ্রাপ্ত কক্ষগুলো ঘুরে দেখতেই পুরো দিন পার হয়ে গেল এবং ওপর-নিচ করে হাঁটতে হলো প্রায় দুই কিলোমিটার।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বিমানে দিল্লি, মুম্বাই বা কলকাতা হয়ে সরাসরি উদয়পুরের মহারানা প্রতাপ বিমানবন্দরে পৌঁছানো যায়। এ ছাড়া ঢাকা থেকে কলকাতায় এসে অনন্যা এক্সপ্রেস বা শালিমার এক্সপ্রেসের মতো ট্রেনে সরাসরি উদয়পুর সিটি রেলওয়ে স্টেশনে যাওয়া সম্ভব।
আরও যা দেখবেন
উদয়পুর শুধু রাজপ্রাসাদ আর লেকের শহর নয়, এর বাইরেও জড়িয়ে আছে সংস্কৃতি, ইতিহাস ও প্রকৃতির মেলবন্ধন। উত্তরে অবস্থিত সাজ্জনগড় মনসুন প্যালেস থেকে পুরো শহরের প্যানোরামিক সূর্যাস্ত দেখতে পাওয়া এক জাদুকরী অভিজ্ঞতা। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য বাগোর কি হাভেলি এক অপূর্ব গন্তব্য; সন্ধ্যায় মেওয়ারি লোকনৃত্য ও পাপেট শো দেখতে এখানে পর্যটকের ভিড় জমে।
আধ্যাত্মিক প্রশান্তির জন্য ১৭ শতকের চমৎকার খোদাই করা জগদীশ মন্দির এবং শহরের সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থিত কার্নি মাতা মন্দির অন্যতম, যেখানে রোপওয়েতে চড়ে যাওয়া যায়। উদয়পুর থেকে কিছুদূরে পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে রয়েছে প্রাচীন যুদ্ধক্ষেত্র ও স্থাপত্য হলদিঘাটি ও কুম্ভলগড় দুর্গ।







