সিলুয়েটের নতুন খেলা

মডেল: আয়েশা লিন্ডা; পোশাক: টুয়েলভ; সাজ: অরা বিউটি লাউঞ্জ; ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
পোশাক এবার শরীরের গড়ন অনুসরণ করার চেয়ে নিজের মতো করে জায়গা করে নিচ্ছে। লম্বা শার্ট, ঢিলেঢালা টপ, টিউনিক কিংবা প্রশস্ত প্যান্টে স্বস্তির সঙ্গে যোগ হচ্ছে আধুনিকতার ছোঁয়া। এসব পোশাকের সামগ্রিক গড়ন বা সিলুয়েট নিয়ে লিখেছেন সায়মন
‘ফ্যাশনে পরিবর্তন সবসময় রঙ কিংবা নকশায় আসে না’— বললেন টুয়েলভের প্রধান ডিজাইনার মাশিয়াত জাহান। তার মতে, কখনো শুধু পোশাকের কাট, দৈর্ঘ্য কিংবা ভলিউম বদলেই চেনা পোশাক পেয়ে যায় নতুন চেহারা। এখনকার ফ্যাশনেও সেই পরিবর্তন স্পষ্ট। শরীরের সঙ্গে আঁটসাঁট হয়ে থাকার বদলে পোশাক যেন একটু বেশি জায়গা নিচ্ছে। কোথাও লম্বা হয়ে, কোথাও ছড়িয়ে, কোথাও আবার অসম রেখায়। যেন গড়ন বদলালেই বদলে যায় স্টাইল। তাই শার্ট, টপ, টিউনিক বা কাফতান— পরিচিত সব পোশাকই নিত্যনতুন সিলুয়েটে হাজির হচ্ছে, সঙ্গে থাকছে প্রশস্ত প্যান্ট কিংবা সহজ-সরল বটম। সব মিলিয়ে স্টাইলে তৈরি হচ্ছে এমন স্টেটমেন্ট, যেখানে স্বস্তি আর নান্দনিকতা পাশাপাশি হাঁটে।
লম্বা শার্টে নতুন রেখা
শার্টের চেনা দৈর্ঘ্য এখন আর শেষ কথা নয়। কোমর পেরিয়ে হাঁটু পর্যন্ত নেমে আসা লম্বা শার্ট, হাই-লো হেম কিংবা সামনের তুলনায় পেছনে বাড়তি দৈর্ঘ্য— এসব কাট পোশাকটিকে দিচ্ছে নতুন চরিত্র।
ওভারসাইজড মানেই পোশাকটি গায়ে ঝুলে থাকবে, এমন নয়। ভালো কাট ও কাপড়ের সঠিক মেলবন্ধন থাকলে ঢিলেঢালা পোশাকও যথেষ্ট পরিপাটি ও চমৎকার দেখায়
বিশেষ করে একরঙা লম্বা শার্টে কাটটি সহজেই চোখে পড়ে। আবার ফুলেল বা জ্যামিতিক প্রিন্ট থাকলে লম্বা রেখার সঙ্গে নকশাও তৈরি করে আলাদা ভিজ্যুয়াল ছন্দ। শার্ট তখন আর শুধু একটি আলাদা পোশাক নয়, পুরো পারিপাট্যের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
ওভারসাইজড, তবে এলোমেলো নয়
ওভারসাইজড পোশাকের জনপ্রিয়তা মূলত স্বস্তি থেকে এলেও এখন এর নিজস্ব ফ্যাশন ভাষা তৈরি হয়েছে। বাড়তি কাপড়, নেমে আসা কাঁধ, প্রশস্ত হাতা কিংবা ঢিলেঢালা গড়ন— সব মিলিয়ে তৈরি হয় একটি আরামদায়ক ভিন্নমাত্রা। তবে ওভারসাইজড মানেই পোশাকটি গায়ে ঝুলে থাকবে, এমন নয়। ভালো কাট ও কাপড়ের সঠিক মেলবন্ধন থাকলে ঢিলেঢালা পোশাকও যথেষ্ট পরিপাটি ও চমৎকার দেখায়। বরং শরীরের রেখাকে পুরোপুরি অনুসরণ না করেই যে স্টাইলিশ হওয়া যায়, ওভারসাইজড সিলুয়েট তারই উদাহরণ।
টিউনিকের নতুন অবয়ব
টিউনিকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় দীর্ঘদিনের। কিন্তু আধুনিক কাটে টিউনিকও বদলে যাচ্ছে। লম্বা ও সরল রেখার পাশাপাশি কোথাও যুক্ত হচ্ছে বাড়তি ফ্লেয়ার, কোথাও অসম হেমলাইন, আবার কোথাও ওপরের অংশ অপেক্ষাকৃত ছিমছাম রেখে নিচের দিকে তৈরি করা হচ্ছে ভলিউম। এর সঙ্গে প্রশস্ত প্যান্ট রাখলে পোশাকে আসে একটি নিরবচ্ছিন্ন ফ্লো। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কাপড়ের চলন একসঙ্গে কাজ করে বলে পুরো স্টাইল দেখায় সাবলীল ও অধুনা।
কাফতানের ছোঁয়া
কাফতানের ঢিলেঢালা সৌন্দর্যও নতুন সিলুয়েটের সঙ্গে বেশ মানিয়ে যায়। এর সহজ কাট, প্রশস্ত গড়ন আর শরীরকে আটকে না রাখার বৈশিষ্ট্য আধুনিক ফ্যাশনের স্বস্তিকেন্দ্রিক ভাবনার সঙ্গে মিলে যায়। তবে এখনকার কাফতান ধাঁচের পোশাকে শুধু ঐতিহ্যবাহী নকশা নয়, দেখা যাচ্ছে সমকালীন কাটও। নতুন নেকলাইন, ভিন্ন হাতা, অসম দৈর্ঘ্য কিংবা প্যান্টের সঙ্গে সমন্বয়— সব মিলিয়ে কাফতানও হয়ে উঠছে আরও আধুনিক।
প্রশস্ত বটমের সঙ্গে ছন্দ
ওয়াইড-লেগ প্যান্ট এ সিলুয়েটের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পায়ের সঙ্গে লেগে না থেকে নিচের দিকে প্রশস্ত হয়ে নামা এ কাট পোশাকে আনে স্বাচ্ছন্দ্য ও নান্দনিকতা। লম্বা শার্ট কিংবা টিউনিকের সঙ্গে প্রশস্ত বটম রাখলে তৈরি হয় সাবলীল অবয়ব। তবে এখানে কাটের অনুপাতের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
কাফতানের ঢিলেঢালা সৌন্দর্যও নতুন সিলুয়েটের সঙ্গে বেশ মানিয়ে যায়। এর সহজ কাট, প্রশস্ত গড়ন আর শরীরকে আটকে না রাখার বৈশিষ্ট্য আধুনিক ফ্যাশনের স্বস্তিকেন্দ্রিক ভাবনার সঙ্গে মিলে যায়। তবে এখনকার কাফতান ধাঁচের পোশাকে শুধু ঐতিহ্যবাহী নকশা নয়, দেখা যাচ্ছে সমকালীন কাটও
ওপরের অংশ যতটা ঢিলেঢালা, নিচের অংশেও যদি একই মাত্রায় ভলিউম থাকে, তাহলে পোশাকের গড়নকে আরও সচেতনভাবে বেছে নিতে হয়। কাপড়ের অনুপাত, দৈর্ঘ্য ও কাট— এই তিনের ভারসাম্যই এখানে আসল।
অসম রেখায় আলাদা আকর্ষণ
সিমেট্রিক কাটের বাইরে বেরিয়ে অ্যাসিমেট্রিক্যাল হেমলাইনও এখন পোশাকে তৈরি করছে নতুনত্ব। এক পাশ লম্বা, অন্য পাশ ছোট; সামনে সোজা, পেছনে বাড়তি— এ ধরনের ছোট পরিবর্তনেই সাধারণ পোশাক হয়ে উঠতে পারে আলাদা। বিশেষ করে লম্বা শার্ট বা টপে এই কাট বেশ কার্যকর। হাঁটার সময় পোশাকের বিভিন্ন দৈর্ঘ্য আলাদা করে চোখে পড়ে। ফলে স্থির ছবিতেও তৈরি হয় ভিন্ন ছন্দ।
রঙে রঙে
নতুন সিলুয়েটের সঙ্গে রঙের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। উজ্জ্বল হলুদ, লাইম, গোলাপি কিংবা গাঢ় মেরুন— একেকটি রঙ একই ধরনের কাটকে একেক রকম মেজাজ দেয়। উজ্জ্বল রঙে লম্বা ও ঢিলেঢালা পোশাক আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। অন্যদিকে গভীর রঙে একই সিলুয়েট পেতে পারে একটু পরিশীলিত, চেনা আবহ। ফুলেল প্রিন্ট আবার লম্বা ও চলনশীল পোশাকে যোগ করে স্নিগ্ধতা।
সাজে কম, প্রভাবেই বেশি
এ ধরনের পোশাকের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো, আলাদা করে অনেক কিছু যোগ করার প্রয়োজন নেই। পোশাকের কাট, দৈর্ঘ্য ও কাপড়ের চলনই যখন মূল আকর্ষণ, তখন অ্যাকসেসরিজ হতে পারে খুব সংযত। ছোট কানের দুল, ঘড়ি, মিনিমাল ব্যাগ কিংবা সাধারণ জুতাই যথেষ্ট। বরং অতিরিক্ত গয়না বা স্টাইলিং উপাদান যোগ করলে পোশাকের নিজস্ব সিলুয়েটটাই হারিয়ে যেতে পারে।
স্বস্তির নতুন মাত্রা
ফ্যাশনে স্বস্তি এখন কি শুধুই ব্যবহারিক সুবিধা? তা নয়। এটি নিজেই একটি নান্দনিকতার অংশ। শরীরকে আটকে না রেখে চলাফেরার আরাম ও স্বস্তি দেওয়া পোশাকও যে যথেষ্ট আধুনিক ও আকর্ষণীয় হতে পারে, নতুন সিলুয়েটের জনপ্রিয়তা তারই প্রমাণ। লম্বা শার্ট, ওভারসাইজড টপ, ক্রপটপ, টিউনিক, কাফতান কিংবা ওয়াইড-লেগ প্যান্ট— সবকটিতেই আছে স্বাভাবিক চলনের সুযোগ।
কাপড় শরীরের সঙ্গে আটকে থাকার প্রতিযোগিতা না করে তার চারপাশে তৈরি করছে নিজস্ব পরিসর। ফ্যাশনের এ পরিবর্তন তাই শুধু নতুন কোনো ট্রেন্ডের গল্প নয়। এটি পোশাককে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন। আঁটসাঁট গড়ন থেকে একটু দূরে, লম্বা রেখা ও প্রশস্ত অবয়বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে স্টাইল। আর সেই বদলে চেনা শার্ট, টপ কিংবা টিউনিকও হয়ে উঠছে নতুন করে আকর্ষণীয়। এবার তাই ফ্যাশনের নতুনত্ব শুধু কী পরছেন, তাতে নয়; বরং কীভাবে পোশাকটি নিজের চারপাশে একটি নতুন অবয়ব তৈরি করছে, সেই গল্পেও।
গরমেও আরাম
গরমের আবহাওয়ার জন্যও এ ধরনের পোশাক বেশ আরামদায়ক। বিশেষ করে পাতলা সুতি, লিনেন বা বাতাস চলাচল করে এমন হালকা কাপড়ে তৈরি পোশাক শরীরের সঙ্গে লেগে থাকে না। ফলে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়াতেও চলাফেরায় স্বস্তি থাকে।
মিনিমাল ব্যাগ কিংবা সাধারণ জুতাই যথেষ্ট। বরং অতিরিক্ত গয়না বা স্টাইলিং উপাদান যোগ করলে পোশাকের নিজস্ব সিলুয়েটটাই হারিয়ে যেতে পারে
লম্বা শার্ট, টিউনিক কিংবা কাফতানের মতো পোশাকে বাড়তি জায়গা থাকায় শরীর কিছুটা মুক্ত থাকে, কাপড়ও নড়াচড়ার সঙ্গে সহজে দোল খায়। তবে এ সময় ভারী কাপড়, অতিরিক্ত লেয়ার ও খুব বেশি ভলিউম এড়িয়ে চলাই ভালো। হালকা কাপড়, স্বচ্ছন্দ কাট আর সুন্দর রঙ— এ তিনের মেলবন্ধনেই গরমের দিনে ফ্যাশন হয়ে উঠতে পারে আরামদায়ক ও প্রাণবন্ত।
ফিউশন কাটে নতুনত্ব
শার্টের কাঠামোর সঙ্গে টিউনিকের দৈর্ঘ্য, কুর্তির ছাটের সঙ্গে আধুনিক প্যান্ট কিংবা কাফতানের ঢিলেঢালা গড়নের সঙ্গে নতুন ধরনের কাট। এভাবেই তৈরি হচ্ছে ফিউশন পোশাক। পরিচিত পোশাকের নানা উপাদান একসঙ্গে মিশে তৈরি করছে এমন সিলুয়েট, যা পুরোপুরি ঐতিহ্যবাহীও নয়, আবার পাশ্চাত্য ধাঁচেরও নয়। বরং এই মাঝামাঝি অবস্থান পোশাকগুলোকে করে তুলছে সমকালীন ও স্বতন্ত্র।
কাপড়ের চলনে সৌন্দর্য
মাশিয়াত জাহানের মতে, সিলুয়েটের সৌন্দর্য শুধু কাটে নয়, কাপড়ের চলনেও। নরম ও হালকা কাপড় শরীরের চারপাশে স্বাভাবিকভাবে নেমে এসে তৈরি করে সাবলীল গড়ন। লম্বা শার্টের বাড়তি অংশ, টিউনিকের ছড়িয়ে পড়া কাট কিংবা কাফতানের ঢেউখেলানো গড়ন, হাঁটা বা নড়াচড়ার সঙ্গে তৈরি করে স্বাভাবিক ছন্দ। ফলে পোশাকের সৌন্দর্য শুধু স্থির অবস্থায় নয়, চলার সময়ও ফুটে ওঠে আলাদা আভিজাত্য।










