জন্মশতবর্ষ
মহানায়কের স্টাইল মন্ত্র

উত্তম কুমার
ধুতি-পাঞ্জাবির বাঙালিয়ানা, স্যুট-টাইয়ের সাহেবিয়ানা, ব্যাকব্রাশ চুল, চোখে সানগ্লাস, পোশাক ও উপস্থিতির নিজস্ব স্টাইলের অনন্য নাম উত্তম কুমার। ৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৬, এই মহানায়কের জন্মদিন। জন্মশতবর্ষে তার ফ্যাশন নিয়ে লিখেছেন নাহিদ ইসলাম
একজন মানুষকে দেখে বাঙালি বুঝে নিয়েছিল— এভাবেও পুরুষের স্টাইল হতে পারে। ধুতি-পাঞ্জাবিতে যেমন অনায়াসে বাঙালি ভদ্রলোক, তেমনই স্যুট-টাইয়ে একেবারে শহুরে সাহেব। চোখে সানগ্লাস, চুলে ব্যাকব্রাশ, ঠেঁাটের কোণে সিগারেট অথবা একেবারে সাধারণ শার্ট-প্যান্ট। সবকিছুকেই নিজের করে নিতে পারতেন উত্তম কুমার। এই মহানায়কের স্টাইলের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল, পোশাক কখনো তাকে ছাপিয়ে যেত না; বরং তার ব্যক্তিত্বই পোশাককে আলাদা করে তুলত।
ফিটিংই প্রথম কথা
উত্তম কুমারের স্টাইলের অন্যতম রহস্য ছিল নিখুঁত ফিটিং। বিশেষ করে স্যুটের ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুঁতখুঁতে। তার কাঁধ, গলা, স্যুটের ঝুল সবকিছুই ঠিকঠাক হতে হতো। কলকাতার বরকত আলি অ্যান্ড ব্রাদার্সে তার স্যুট ও শার্ট তৈরি হতো বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘নায়ক’ সিনেমার বিখ্যাত স্যুটটিও সেখানকার তৈরি বলে জানা গেছে। এ খুঁতখুঁতে স্বভাবটাই তার পোশাকে এনে দিত পরিপাটি, অভিজাত একটা ছাপ। স্যুট হোক বা সাধারণ শার্ট; পোশাকটি শরীরের সঙ্গে কীভাবে বসছে, সেটিই হয়ে উঠত তার স্টাইলের মূল কথা।
ধুতি-পাঞ্জাবিতে চিরচেনা বাঙালি
উত্তম কুমারের ফ্যাশনকে শুধু স্যুট-টাই দিয়ে বোঝা যাবে না। তার ধুতি-পাঞ্জাবির লুকই বরং বাঙালি পুরুষের পোশাককে নতুন আকর্ষণ দিয়েছিল। কোঁচানো ধুতি, কলারওয়ালা রঙিন পাঞ্জাবি-এ সাজ তার সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে, তা পরবর্তীকালে জনপ্রিয় ফ্যাশনেও জায়গা করে নেয়। গবেষণামূলক একটি লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, তার ধুতি-পাঞ্জাবির ধরন বাজারের পোশাকেও অনুসরণ করা হতো। এ বাঙালিয়ানা কখনোই তার ব্যক্তিত্বকে সেকেলে করে তোলেনি। বরং ধুতির ভাঁজ, পাঞ্জাবির কলার আর তার স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল একেবারে নিজস্ব উত্তম-সিলুয়েট
শার্ট-প্যান্টেও স্টাইল
উত্তমের ক্যাজুয়াল সাজেরও আলাদা জনপ্রিয়তা ছিল। শার্টের হাতা গুটিয়ে নেওয়া, ওপরের এক-দুটি বোতাম খোলা রাখা, সঙ্গে প্যান্ট— এ অনায়াস ভঙ্গিটিও হয়ে উঠেছিল তার পরিচিত স্টাইল। ‘হারানো সুর’-এর মতো সিনেমার দৃশ্যেও ব্যাকব্রাশ করা চুল, টুইলস শার্ট ও ক্যাজুয়াল প্যান্টের এমন লুক দেখা যায়। পরে ‘অমানুষ’ সিনেমার পর তার ডোরাকাটা শার্টের ধরনও এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে, সেটিকে ‘অমানুষ প্রিন্ট’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে এক গবেষণায়। অর্থাৎ, উত্তমের ফ্যাশন শুধু পর্দায় দেখা হতো না; দর্শক সেটি নিজেদের জীবনেও নিয়ে যেতে চাইত।
চুলে ব্যাকব্রাশ, চোখে সানগ্লাস
চুলের স্টাইলেও উত্তম ছিলেন স্বতন্ত্র। ব্যাকব্রাশ করা চুল তার লুকের অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল। আর সানগ্লাস? সেটি যেন উত্তম-স্টাইলের আলাদা এক অধ্যায়। কালো স্যুট, সানগ্লাস, টাই, সিগারেট ও আত্মবিশ্বাসী শরীরী ভাষা আজও বাংলা সিনেমার সবচেয়ে স্মরণীয় পুরুষালি লুকগুলোর একটি।
চরিত্র বদলেছে, স্টাইলও বদলেছে
উত্তমের ফ্যাশনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি একই ধরনের নায়ক হয়ে থাকেননি। চরিত্র অনুযায়ী বদলে নিয়েছেন পোশাক ও উপস্থিতি। ‘সপ্তপদী’তে কখনো সাদা ধুতি-পাঞ্জাবিতে তিনি পরিচিত বাঙালি যুবক, আবার মোটরসাইকেল, জ্যাকেট ও উড়ন্ত টাইয়ে হয়ে উঠেছেন অনেক বেশি আধুনিক। ‘নায়ক’ সিনেমায় তিনি শহুরে, আত্মবিশ্বাসী সুপারস্টার। অ্যান্টনি ফিরিঙ্গীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন সাজে পর্দায় এসেছেন। চিড়িয়াখানায় আবার তার লুক বদলে গেছে চরিত্রের প্রয়োজনেই। এ বৈচিত্র্যই প্রমাণ করে, উত্তমের স্টাইল ছিল শুধু পোশাক পরার বিষয় নয়; চরিত্রকে পোশাকের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষমতাও তার ছিল।
মহানায়কের আসল মন্ত্র
উত্তম কুমারের স্টাইলের রহস্য আসলে কোনো নির্দিষ্ট পোশাকে নয়। তিনি বুঝতেন, পোশাক সুন্দর হওয়ার চেয়ে নিজের সঙ্গে মানানসই হওয়া বেশি জরুরি। ধুতি-পাঞ্জাবি, শার্ট-প্যান্ট কিংবা স্যুট— সবকিছুকেই তিনি নিজের শরীরী ভাষা, চুলের স্টাইল, হাঁটাচলা ও অভিব্যক্তির সঙ্গে মিলিয়ে নিতেন। তাই তার স্টাইল কখনো পুরনো দিনের ফ্যাশন হয়ে থাকেনি। এখনো সমান অনুকরণীয়।








