মুখের গড়ন বুঝে মেকআপ

মডেল: কায়ছারুন্নাহার কলি, সাজ: রেড বাই আফরোজা পারভীন, ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
মেকআপ করার ক্ষেত্রে মুখের গড়নকে প্রাধান্য দিলে নিজস্ব ছন্দে মুখ হয়ে ওঠে মুখর, আরও মায়াময় ও সুন্দর। কেমন করে? জানাচ্ছেন ভাবনা রহমান
মুখের সৌন্দর্য তার নিখুঁত মাপজোখে নয়, বরং নিজস্ব রেখায়। কারও কপাল একটু চওড়া, চোয়াল দৃঢ়; কারও মুখ লম্বাটে, কারও আবার গালের গোল অংশই মুখটাকে দেয় শিশিরভেজা কোমলতা। মেকআপের কাজ সেই স্বাভাবিক রেখাগুলো মুছে ফেলা নয়; বরং আলো-ছায়ার খেলায় মুখের সৌন্দর্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলা। তাই সবার মুখে একইভাবে কনট্যুর, ব্লাশ বা হাইলাইটার প্রয়োগ করলে কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য নাও আসতে পারে। মুখের গড়ন বুঝে মেকআপ করলে সাজ হয়ে ওঠে অনেক বেশি স্বাভাবিক, পরিমিত ও ব্যক্তিত্বময়— জানালেন অরা বিউটি লাউঞ্জের স্বত্বাধিকারী ও রূপবিষেজ্ঞ নিশাত আদনান তারিক।
গড়ন চেনা
আয়নার সামনে চুল পেছনে সরিয়ে মুখের সবচেয়ে চওড়া অংশ, কপাল, গালের হাড় ও চোয়ালের রেখা খেয়াল করুন। মুখের প্রস্থের তুলনায় দৈর্ঘ্য কতটা বেশি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে মুখের গড়নকে গোল, ডিম্বাকৃতি, চৌকো, লম্বাটে, হৃদয়াকৃতি ও হীরাকৃতি— এভাবে বোঝানো হয়। বাস্তবে একটি মুখ একাধিক গড়নের বৈশিষ্ট্য বহন করতে পারে। তাই নির্দিষ্ট ছকে নিজেকে আটকে না রেখে মুখের রেখাগুলো বুঝে নেওয়াই প্রথম ধাপ।
গোল মুখে
এমন মুখে গাল ও মুখের পাশের অংশে স্বাভাবিক গোলাই বেশি থাকে। এখানে মেকআপের লক্ষ্য মুখকে সরু দেখানো নয়; বরং রেখায় সামান্য পরিবর্তন আনা। কনট্যুর ব্যবহার করলে গালের মাঝখানে না এনে কানের কাছ থেকে গালের হাড়ের নিচ বরাবর হালকা করে টানুন। কপালের দুই পাশ ও চোয়ালের প্রান্তেও অল্প কনট্যুর দেওয়া যেতে পারে। ব্লাশ গালের একেবারে গোল অংশে না দিয়ে সামান্য ওপরের দিকে, কানের দিক থেকে গালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ছড়িয়ে দিলে মুখে লম্বাটে ভাব আসে। হাইলাইটার বসতে পারে গালের ওপরের অংশে, নাকের মাঝ বরাবর অল্প এবং ঠেঁাটের ওপরের অংশে। চোখের সাজে বাইরের কোণ সামান্য ওপরে তুলে দেওয়া আইলাইনার মুখের সামগ্রিক ভারসাম্য সুন্দর রাখে।
ডিম্বাকৃতি মুখে
এমন মুখকে অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ গড়ন হিসেবে ধরা হয়। তাই এখানে অতিরিক্ত কনট্যুরের প্রয়োজন নেই। ফাউন্ডেশন ত্বকের সঙ্গে মিশিয়ে সমান করে নিতে পারেন। গালের ওপরের অংশে ব্লাশ দিয়ে তা সামান্য কানের দিকে ব্লেন্ড করুন। কনট্যুর ব্যবহার করলে গালের হাড়ের নিচে খুব হালকা ছায়া তৈরি করাই যথেষ্ট। নাক, কপাল বা চোয়ালের রেখাকে খুব বেশি বদলে দেওয়ার দরকার নেই। এ গড়নে চোখ ও ঠেঁাট দুটির যেকোনো একটিকে সাজের মূল আকর্ষণ করা যায়। দিনের সাজে নরম চোখ ও স্বাভাবিক ঠেঁাট যেমন মানায়, তেমনি সন্ধ্যার আয়োজনে গাঢ় ঠেঁাটও সুন্দর দেখায়।
মেকআপের কাজ মুখের স্বাভাবিক রেখাগুলো মুছে ফেলা নয়; বরং আলো-ছায়ার খেলায় সৌন্দর্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলা। তাই সবার মুখে একইভাবে কনট্যুর, ব্লাশ বা হাইলাইটার প্রয়োগ করলে কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য নাও আসতে পারে
চৌকো মুখে
এমন মুখে কপাল, গালের হাড় ও চোয়ালের প্রস্থ কাছাকাছি হতে পারে। চোয়ালের রেখা তুলনামূলক স্পষ্ট হওয়ায় মেকআপে একটু কোমল আবহ আনা যায়। চোয়ালের দুই কোণ ও কপালের পাশের অংশে খুব হালকা কনট্যুর দিন। ব্লাশ গালের ওপরের দিকে গোল করে না দিয়ে তির্যকভাবে বসিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। এতে মুখের রেখা কোমল দেখাবে। চোখের সাজে গোল বা কোমলভাবে ব্লেন্ড করা আইশ্যাডো সুন্দর মানায়। ভ্রু একেবারে তীক্ষ্ণ করে আঁকার বদলে স্বাভাবিক বাঁক রাখলে মুখের দৃঢ় রেখার সঙ্গে কোমলতার ভারসাম্য তৈরি হবে।
লম্বাটে মুখে
এমন চেহারায় মুখের দৈর্ঘ্য তুলনামূলক বেশি। তাই মেকআপের মাধ্যমে ওপর-নিচের দৈর্ঘ্যের বদলে দুই পাশের প্রস্থকে দৃশ্যত ভারসাম্য দেওয়া যেতে পারে। কপালের ওপরের অংশ ও চিবুকের নিচে অল্প কনট্যুর ব্যবহার করতে পারেন। গালের ব্লাশ খুব ওপরে তুলে না দিয়ে গালের মাঝামাঝি অংশে খানিকটা আড়াআড়ি করে বসালে মুখে প্রস্থের অনুভূতি আসে। হাইলাইটারও অতিরিক্ত লম্বা করে নাকের ওপর বা কপালে টেনে দেওয়া ঠিক নয়। চোখের সাজে আড়াআড়িভাবে ব্লেন্ড করা আইশ্যাডো এবং সামান্য ছড়ানো আইলাইনার মুখের সামগ্রিক অনুপাত সুন্দর রাখতে পারে। চুলের সাজেও মুখের দুই পাশে ভলিউম থাকলে লম্বাটেভাবে কিছুটা ভারসাম্য আসে।
হৃদয়াকৃতি মুখে
হৃদয়াকৃতি মুখে কপাল তুলনামূলক চওড়া এবং চিবুকের দিকে মুখ সরু হয়ে আসে। তাই কপালের দুই পাশে হালকা ছায়া তৈরি করে নিচের অংশে একটু উজ্জ্বলতা আনা যেতে পারে। গালের হাড়ের নিচে খুব সামান্য কনট্যুর দিন। ব্লাশ গালের মাঝামাঝি থেকে বাইরের দিকে ছড়িয়ে দিলে মুখে স্বাভাবিক ভারসাম্য মেলে। চিবুকের একেবারে ডগায় বেশি হাইলাইটার না দিয়ে লাইট রাখুন। ঠেঁাটে একটু বেশি গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। মাঝারি বা উজ্জ্বল রঙের লিপস্টিক মুখের নিচের অংশ ভারী দেখায়। চোখের সাজ খুব বেশি ভারী না করেও সুন্দর ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব।
হীরাকৃতি মুখে
এমন মুখে গালের হাড় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে আর কপাল ও চিবুক তুলনামূলক সরু হয়ে থাকে। তাই গালের হাড়কে আরও প্রকট করার চেয়ে তার চারপাশের রেখা কোমল রাখা ভালো। কনট্যুরের ব্যবহার সীমিত রাখুন। বরং গালের ওপরের অংশের একটু নিচে ব্লাশ দিয়ে তা বাইরের দিকে মিশিয়ে দিতে পারেন। কপাল ও চিবুকের মাঝামাঝি অংশে হালকা হাইলাইট দিলে সুন্দর দেখাবে। চোখের সাজে স্মোকি বা সামান্য গোল করে ব্লেন্ড করা শ্যাডো সুন্দর মানাবে। ঠেঁাটে স্বাভাবিক রেখা রেখে সাজালে মুখের স্বতন্ত্র গড়ন আরও সুন্দরভাবে ফুটে উঠবে।
কনট্যুর কিন্তু গাঢ় দাগ নয়
মুখের গড়ন অনুযায়ী মেকআপ করতে গিয়ে সবচেয়ে ভুল হয় কনট্যুর ব্যবহারে। কনট্যুরের উদ্দেশ্য মুখে স্পষ্ট বাদামি দাগ আঁকা নয়; ত্বকের স্বাভাবিক ছায়ার মতো করে গভীরতা তৈরি করা। তাই নিজের ত্বকের রঙের চেয়ে খুব বেশি গাঢ় পণ্য ব্যবহার না করাই ভালো। ক্রিম বা পাউডার— যেটিই ব্যবহার করুন, শেষে ভালোভাবে ব্লেন্ড করতে হবে। দিনের আলোয় কনট্যুর বেশি বোঝা গেলে তা ভালো দেখায় না। আয়নার সামনে যেমন দেখাচ্ছে, প্রাকৃতিক আলোতেও যেন তেমনই স্বাভাবিক লাগে, সেটিই মেকআপের সঠিক মাপকাঠি।
ব্লাশেও লুক বদল
একই ব্লাশ, একই রঙ; তবু কোথায় প্রয়োগ করা হচ্ছে, তার ওপর বদলে যেতে পারে মুখের অভিব্যক্তি। গালের মাঝামাঝি ব্লাশ দিলে আসে কোমল ও সতেজ আবহ। ওপরের দিকে ও বাইরের দিকে টানলে মুখে কিছুটা উত্তোলিত ভাব আসে। লম্বাটে মুখে সামান্য আড়াআড়ি প্রয়োগ প্রস্থের ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। তবে মুখের গড়নই শেষ কথা নয়। ত্বকের ধরন, বয়স, পোশাক, চুলের সাজ এবং দিনের আলো— সবকিছুর সঙ্গে মিলিয়ে ব্লাশের তীব্রতা ঠিক করা ভালো।
ভ্রু বদলে অভিব্যক্তি বদল
মুখের গড়ন বুঝে সাজতে গেলে ভ্রুকে আলাদা করে গুরুত্ব দিতে হয়। খুব সরু ভ্রু যেমন মুখের স্বাভাবিক ভারসাম্য বদলে দিতে পারে, তেমনি অতিরিক্ত মোটা বা খুব তীক্ষ্ণ ভ্রুও সাজকে কৃত্রিম করে তুলতে পারে। তাই ভ্রুর স্বাভাবিক আকৃতি অনুসরণ করা নিরাপদ। গোল মুখে সামান্য উঁচু বাঁক এনে দিতে পারে পরিবর্তন। লম্বাটে মুখে খুব উঁচু বাঁক না রেখে তুলনামূলক নরম রেখা রাখা যেতে পারে। চৌকো মুখে অতিরিক্ত ধারালো ভ্রুর বদলে কোমল বাঁক মুখের দৃঢ় রেখায় মসৃণতা এনে দেয়।
ঠোঁটে ভারসাম্য
মুখের গড়নের সঙ্গে ঠোঁটের সাজও সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি। হৃদয়াকৃতি মুখে ঠোঁটকে সাজের কেন্দ্র করা সম্ভব। লম্বাটে মুখে মাঝারি থেকে উজ্জ্বল ঠোঁটের রঙ মুখের ওপর-নিচের ভারসাম্য তৈরি করে। গোল মুখে খুব বেশি ওভারড্র করার বদলে ঠোঁটের স্বাভাবিক রেখা ফুটিয়ে তোলা সুন্দর। লিপলাইনার ব্যবহার করলে ঠেঁাটের প্রাকৃতিক রেখার সামান্য বাইরে গিয়ে আঁকার বদলে রেখাটিকে পরিষ্কার করলেই বেশি স্বাভাবিক দেখায়।
মেকআপের নিয়ম
মুখের গড়ন জানা দরকার, তবে সেটিকে বদলে ফেলার জন্য নয়। কনট্যুর দিয়ে চোয়াল মুছে ফেলা, নাককে অস্বাভাবিক সরু করা কিংবা হাইলাইটারে মুখের প্রতিটি অংশ উজ্জ্বল করে তোলা— এসবের চেয়ে প্রয়োজন সূক্ষ্ম ব্যবহার জানা। একই মুখে সকালের অফিস, দুপুরের আড্ডা কিংবা রাতের অনুষ্ঠানের সাজ অভিন্ন হবে না। দিনের মেকআপে হালকা বেস, কোমল ব্লাশ ও স্বাভাবিক ভ্রু যথেষ্ট হতে পারে; তবে সন্ধ্যার আয়োজনে চোখ বা ঠেঁাটের কোনো একটি অংশকে একটু বেশি গুরুত্ব দেওয়া ভালো।






