মিস ওয়ার্ল্ড ২০২৬
সোনালি আভা থেকে রক্তাভ মাতৃত্ব

ট্রিভিয়া এল মুহোজা
বিশ্বসুন্দরীর মঞ্চে নীল মুকুট, সোনালি জৌলুস আর জীবনের গল্প নিয়ে লিখেছেন অলকানন্দা রায়
বিশ্বসুন্দরীর মঞ্চে এবারের মুকুট পরলেন ডোমিনিকান রিপাবলিকের জোহেইরি মোলা দোমিঙ্গেস। ৫ সেপ্টেম্বর ৭৩তম মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতার গ্র্যান্ড ফিনালেতে তার মাথায় মুকুট পরিয়ে দেন গতবারের মিস ওয়ার্ল্ড থাইল্যান্ডের ওপাল সুচাতা চুয়াংস্রি। প্রথম রানারআপ হয়েছেন স্পেনের এলিজাবেথ রেইনেস এবং দ্বিতীয় রানারআপ মালয়েশিয়ার তানুসিয়া চেট্টি।
১৯৫১ সালে লন্ডনে যাত্রা শুরু করা মিস ওয়ার্ল্ড এবার উদযাপন করল ৭৫ বছর। চার সপ্তাহ ধরে ভিয়েতনামের বিভিন্ন শহরে চলে নানা আয়োজন। এতে অংশ নেন ১১১ দেশের প্রতিযোগী। তাদের পেরোতে হয়েছে ‘বিউটি উইথ আ পারপাস’, মাল্টিমিডিয়া, হেড-টু-হেড, টপ মডেল, ট্যালেন্ট, স্পোর্টস ও পিপলস চয়েসসহ বিভিন্ন পর্ব। এসব ধাপ পেরিয়ে ভিয়েতনামের নাহা ট্রাংয়ে সমুদ্রের পাশে বসা জমকালো ফাইনালে শেষ হাসি হাসেন জোহেইরি।
২৪ বছর বয়সী এই তরুণী পেশায় শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী। তিনি ‘ভয়েস অব টুমরো’ নামে একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া শিশুদের ইংরেজি ভাষার শিক্ষা ও সামগ্রিক উন্নয়নে কাজ করে। এই জয়ের মধ্য দিয়ে ৪৪ বছর পর আবারও মিস ওয়ার্ল্ডের মুকুট পেল ডোমিনিকান রিপাবলিক। এর আগে ১৯৮২ সালে দেশটির মারিয়াসেলা আলভারেজ এই খেতাব জিতেছিলেন।
এবারের প্রতিযোগিতার বিশেষত্ব ছিল সামাজিক কাজ ও মানুষের জন্য কাজ করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। ‘বিউটি উইথ আ পারপাস’ তাই হয়ে ওঠে প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এবারের আসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা সামানজার সাঈদও বাকি প্রতিযোগীদের সঙ্গে পাড়ি দেন দীর্ঘ এই সৌন্দর্যযাত্রা। ‘বিউটি উইথ আ পারপাস’ পর্বে সাফল্য পেয়ে তিনি প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে জায়গা করে নেন।
সি-সেকশনের সাত স্তরে ‘দ্য লেয়ার্স অব লাইফ’
এবারের আয়োজনে আলোচনায় ছিল উগান্ডার প্রতিনিধি ট্রিভিয়া এল মুহোজার পোশাক। প্রথম দেখায় চোখে পড়ে স্তরে স্তরে সাজানো গাউন, রঙ ও চোখজুড়ানো নকশা। তবে পোশাকটির আসল সৌন্দর্য তার গল্পে। উগান্ডার ডিজাইনার কিশা আবদাল্লাহর তৈরি গাউনটির নাম ‘দ্য লেয়ার্স অব লাইফ’। নকশাটির অনুপ্রেরণা অন্তঃসত্ত্বা নারীর সি-সেকশনের সময় অস্ত্রোপচারে অতিক্রম করা সাতটি অ্যানাটমিক্যাল স্তর। ত্বক, চর্বি, ফ্যাসিয়া, রেক্টাস মাংসপেশি, পেরিটোনিয়াম, জরায়ুর পেশি ও অ্যামনিওটিক স্যাক— এই স্তরগুলোর ধারণাকে পোশাকের বিভিন্ন স্তর, রঙ ও টেক্সচারের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। সাদা, হলুদ, গোলাপি ও লালের নানা শেডে তৈরি পোশাকটি তাই নিছক গ্ল্যামারাস গাউন নয়। প্রতিটি স্তর যেন সন্তান জন্মদানের শারীরিক যাত্রার আলাদা অধ্যায়। নতুন মা হওয়ার অভিজ্ঞতাও ডিজাইনারের ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার লক্ষ্য ছিল সি-সেকশনের মতো একটি চিকিৎসাবিষয়ক অভিজ্ঞতাকে কতুরের ভাষায় এনে মাতৃত্ব, নারীত্ব এবং জীবনের জন্মকে উদযাপন করা।
সোনালি জৌলুসে ‘দ্য কুইন অব গোল্ড’
মিস ওয়ার্ল্ড ২০২৬ জোহেইরি মোলার ‘দ্য কুইন অব গোল্ড’ যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ফ্যাশন গল্প। এখানে চিকিৎসা বা সামাজিক বার্তার বদলে মূল সুর রাজকীয়তা, কারুকাজ ও জৌলুস। ডিজাইনার জিয়ান্নিনা আজার তৈরি পোশাকটি সোনালি সিল্কের ওপর ঘন হ্যান্ড এমব্রয়ডারি, আরাবেস্ক নকশা, স্বরোভস্কি ক্রিস্টাল ও গোল্ড লিফের কাজ দিয়ে সাজানো। অফ-শোল্ডার গড়ন, সাহসী নেকলাইন এবং পেছনে নেমে যাওয়া কেপ পোশাকটিকে দিয়েছে রাজকীয় আভিজাত্য। মঞ্চের আলোয় সোনালি অলংকরণ হয়ে উঠেছিল আরও ঝলমলে। এই পোশাকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, সোনার ব্যবহারকে শুধু ঝলক হিসেবে না রেখে পুরো লুকের মূল উপাদান করে তোলা। গাউন জুড়ে থাকা অলংকরণ, আলোয় সিল্কের ঝিলিক এবং কেপের চলন— সব মিলিয়ে জোহেইরি যখন মঞ্চে হাঁটছিলেন, তাকে আধুনিক সম্রাজ্ঞীর মতোই মনে হচ্ছিল। এই পোশাকেই তিনি ‘আমেরিকাস অ্যান্ড ক্যারিবিয়ান টপ মডেল’ জয় করেন এবং সরাসরি জায়গা করে নেন টপ ৪০-এ। একই সঙ্গে পোশাকটি ‘ওয়ার্ল্ড ডিজাইনার অ্যাওয়ার্ড’-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিল।
এবারের আসরের প্রতিযোগীদের আফ্রিকা, আমেরিকা ও ক্যারিবীয়, ইউরোপ এবং এশিয়া ও ওশেনিয়া— এই চারটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। চলতি বছরের মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সামানজার সাঈদ ‘বিউটি উইথ আ পারপাস’ পর্বে নিজ মহাদেশে প্রাথমিকভাবে সেরা ছয়ে থাকলেও ফাইনালের সেরা ৪০-এ জায়গা পাননি। তাকে দেখা গেছে ফ্যাশন ব্র্যান্ড ক্যানভাসের স্বত্বাধিকারী তন্বী কবিরের নকশা করা বাংলাদেশি আবহের পোশাকে। আগামী বছর ২০২৭ সালের মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতার আয়োজন করবে তানজানিয়া।







