উদযাপন
বন্ধুত্বের শত্রু উদাসীনতা

মডেল: অ্যাঞ্জেলা ডি’কস্টা, দীপ রোহান ও মৌ ইসলাম মীম। সাজ: অরা বিউটি লাউঞ্জ ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
জাতিসংঘের ঘোষণা অনুসারে ৩০ জুলাই আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবস। তবে বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশে আগস্টের প্রথম রবিবার এ দিবস পালিত হয়। বন্ধুত্বের তাৎপর্য খুঁজেছেন অলকানন্দা রায়
সব সম্পর্কেরই একটি ভাষা আছে। বন্ধুত্বের ভাষা, ‘আমি আছি।’ রাত ৩টায় শহরের রাস্তাগুলো অদ্ভুত নির্জন হয়ে ওঠে। দোকানের শাটার নেমে যায়, সিগন্যালের লাল বাতিটাও যেন অলস হয়ে জ্বলে! এমন রাতে কেউ যদি দরজায় কড়া নাড়ে, প্রথমেই মনে হয়, নিশ্চয়ই কোনো বিপদ। সেদিনও তাই হয়েছিল। দরজা খুলতেই দেখা গেল, একজন দাঁড়িয়ে আছেন। কিছু বলছেন না। চোখ দুটো লাল, মুখ শুকনো। মনে হচ্ছিল, অনেক দূর হেঁটে এসেছেন। ভেতরে ঢুকে এক গ্লাস পানি খেলেন। তারপর মাথা নিচু করে বললেন, ‘আজ খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে।’
কেউ তাকে জিজ্ঞেস করল না, ‘কী হয়েছে?’ কেউ বলল না, ‘এত রাতে কেন?’ শুধু বারান্দার বাতিটা জ্বলে উঠল। দুটো চায়ের কাপ এলো। তারপর রাতটা ধীরে ধীরে ভোর হয়ে গেল। পরে জানা গেল, আগন্তুক ব্যক্তি চাকরি হারিয়েছেন কিংবা তার প্রেম ভেঙেছে। তার বাবার খুব কঠিন অসুখ ধরা পড়েছে; কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেদিন এসবের কোনো সমাধান হয়নি। তবু তিনি যখন ফিরছিলেন, তার মুখে আগের চেয়ে একটু বেশি আলো ছিল।
কখনো কখনো মানুষ শুধু এমন একটা দরজা খেঁাজে, যেখানে কড়া নাড়তে সংকোচ হয় না। হয়তো বন্ধুত্বের মূল্য সেখানেই। কারণ মানুষ সবসময় সমাধান খেঁাজে না; অনেক সময় শুধু একজন শ্রোতা চায়। হয়তো এ কারণেই বন্ধুত্বে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় গুণটি কথা বলা নয়, শোনা। বন্ধু মানে সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়; বরং মতের অমিলের পরও হাতটা ছেড়ে না দেওয়া। তর্ক হতে পারে, অভিমানও; কিন্তু সম্পর্কের ওপর অহংকারকে বসতে না দেওয়াই বন্ধুত্বের পরিণত রূপ।
বন্ধু মানে সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়; বরং মতের অমিলের পরও হাতটা ছেড়ে না দেওয়া। তর্ক হতে পারে, অভিমানও; কিন্তু সম্পর্কের ওপর অহংকারকে বসতে না দেওয়াই বন্ধুত্বের পরিণত রূপ
অনেকেই বন্ধুত্ব নিয়ে বড় বড় বুলি আওড়ান। বেস্ট ফ্রেন্ড, সোলমেট, ডুড, বেস্টি, বাডি— কত নাম! অথচ সবচেয়ে বড় পরিচয়টা খুব সাধারণ। বন্ধু সেই মানুষ, যার সামনে নিজের ভাঙাচোরা সংস্করণটাও লুকিয়ে রাখতে হয় না।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন, মানসিক সুস্থতার জন্য জীবনে একজন নির্ভরযোগ্য মানুষের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন একজন, যার কাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করলেও সম্মান কমে যাবে না। যার কাছে কান্না মানে দুর্বলতা নয়; বরং বিশ্বাস ও আস্থা। বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সুখে নয়, দুঃসময়ে। আনন্দের টেবিলে অনেক চেয়ার ভরে যায়; কিন্তু হাসপাতালের করিডর, থানার বারান্দা কিংবা মাঝরাতের ফোনকল— সেখানেই বোঝা যায়, কারা প্রকৃত বন্ধু। তবে বন্ধুত্ব শুধু বিপদের গল্পও নয়। বন্ধু সেই মানুষ, যিনি আপনার সাফল্যে হাততালি দেন, আবার প্রয়োজন হলে বলেন, ‘এখানে তুই ভুল করছিস।’ যিনি আপনাকে খুশি রাখার জন্য মিথ্যা বলেন না; বরং সম্পর্ক হারানোর ঝুঁকি নিয়েও সত্যিটা জানিয়ে দেন।
আজকের পৃথিবীতে সবাই কোনো না কোনোভাবে ব্যস্ত; কিন্তু ব্যস্ততা কখনো বন্ধুত্বের শত্রু নয়। শত্রু হলো উদাসীনতা। ৫ মিনিট সময় না পাওয়া নয়, ৫ মিনিট সময় দিতে না চাওয়া। বন্ধুত্বে নিয়মিত কথা বলার চেয়ে জরুরি হলো সবসময় মনে রাখা। অনেক সম্পর্ক শব্দে বাঁচে। বন্ধুত্ব বাঁচে আস্থায়। মাসখানেক কথা না হলেও যে সম্পর্কের ভেতর অস্বস্তি জমে না, সেটাই পরিণত বন্ধুত্ব। কারণ সেখানে হিসাব থাকে না; থাকে ভরসা। একজন ভালো বন্ধু কখনো আপনার জীবনের নায়ক হতে চান না। তিনি শুধু কঠিন দৃশ্যগুলোতে ফ্রেমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। আপনি পড়ে গেলে তিনি হাত বাড়িয়ে দেন। আপনি জিতলে তিনি একটু দূরে দাঁড়িয়ে হাসেন। আর আপনি হারলে চুপচাপ পাশে বসে থাকেন তিনি।
ভাগ্যবান সেই মানুষ, যার জীবনে এমন কেউ আছে। যাকে ফোন করে বলা যায়, ‘কিছু হয়নি... শুধু তোর সঙ্গে একটু বসতে ইচ্ছে করছে।’ বন্ধু দিবসে তাই উপহারের তালিকা নয়, মানুষের তালিকাটা একবার দেখুন। এমন কাউকে কি অনেক দিন ফোন করা হয়নি? এমন কেউ কি আছে, যার অভিমানটুকু আপনি বুঝেও এড়িয়ে গেছেন? হয়তো আজই সেই দূরত্ব মুছে দেওয়ার দিন। সব সম্পর্কের শেষ ঠিকানা এক হয় না। কেউ মাঝপথে হারিয়ে যায়, কেউ সময়ের ভিড়ে ফিকে হয়ে ওঠে; কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, ঋতু বদলায়, শহর বদলায়, জীবন বদলায়, তবু তারা থেকে যান। তারাই ডেকে বলেন, ‘ভয় পাস না, আমি আছি।’ হয়তো এই পাঁচ শব্দই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বন্ধুত্বের গল্প রচনা করে।




