‘হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করতে বিএনপি নেতার নির্দেশ’ বক্তব্যটি কি সঠিক?

ছবি: আগামীর সময়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে নতুন করে তীব্র বিভ্রান্তি ও সাম্প্রদায়িক উদ্বেগ তৈরির চেষ্টা চলছে। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছে— চট্টগ্রামের এক বিএনপি নেতা প্রকাশ্যে তার কর্মীদের নির্দেশ দিচ্ছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে এবং এ কাজে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছেন। পোস্টগুলোর ক্যাপশনে সনাতন ধর্মাবলম্বীর সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই দাবির কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। মূলত, প্রায় ১০ বছর আগের এক আওয়ামী লীগ নেতার বক্তব্যকে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক উদ্দেশে বিকৃত দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।
ভাইরাল দাবি ও প্রেক্ষাপট
গত ২২ মে ‘Voice of BD Hindus’ নামের একটি ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি প্রথম পোস্ট করা হয়। পোস্টের ইংরেজি ক্যাপশনে দাবি করা হয়, এটি চট্টগ্রামের এক বিএনপি নেতার সাম্প্রতিক বক্তব্য, যেখানে তিনি হিন্দুদের ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করতে কর্মীদের নির্দেশ দিচ্ছেন এবং বিশেষ করে হিন্দু নারীদের লক্ষ্যবস্তু করার কথাও বলছেন। মুহূর্তের মধ্যেই একই ভিডিও ও দাবি ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওটির প্রায় ২৯ সেকেন্ডের একটি অংশে দেখা যায়, টুপি পরিহিত এক ব্যক্তি উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে বলছেন— তারা বিভিন্ন দেশে গিয়ে দাওয়াতি কাজ করলেও এখনো কোনো হিন্দুকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে পারেননি। তিনি উদাহরণ হিসেবে সাঈদীর নাম উল্লেখ করে বলেছেন, তিনি বহু হিন্দুকে মুসলমান করেছেন। একই সঙ্গে তিনি অন্তত একজন বা দু’জনকে ধর্মান্তরিত করার আহ্বান জানান এবং এ ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
অনুসন্ধান ও আসল ঘটনা
রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে ভিডিওটির প্রকৃত উৎস খুঁজে বের করে আগামীর সময়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনার নয়, বরং ২০১৬ সালের। ২০১৬ সালের ২৭ আগস্ট আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ঢাকা ট্রিবিউন’-এর অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিও প্রতিবেদনের সঙ্গে বর্তমান ভাইরাল ভিডিওটির হুবহু মিল পাওয়া যায়। সেই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল— ‘হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করার পক্ষে চট্টগ্রামের ইউপি চেয়ারম্যান।’ ভাইরাল ভিডিওটির প্রথম ২৯ সেকেন্ড মূলত ওই প্রতিবেদনেরই অংশ।
বক্তব্য প্রদানকারীর প্রকৃত পরিচয় ও উৎস
প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড ব্যবহার করে অনুসন্ধানের মাধ্যমে ঢাকা ট্রিবিউনের মূল ওয়েবসাইট এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘Scroll.in’-এ প্রকাশিত তৎকালীন বিস্তারিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই সংবাদ সূত্রগুলো নিশ্চিত করে যে, ভিডিওতে থাকা ব্যক্তি কোনো বিএনপি নেতা নন; বরং তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার নারায়ণহাট ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, তিনি সে সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১২ আগস্ট তাবলীগ জামায়াতের একটি প্রতিনিধি দল নারায়ণহাট পরিদর্শনে গেলে ইউপি চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ তাদের উদ্দেশে এই মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘তাবলীগের সদস্যরা একজন হিন্দুকেও ধর্মান্তরিত করতে পারেননি। একটা বা দুইটা করুন, আমি আপনাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।’ তার এই বক্তব্য সেসময় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
সামগ্রিক তথ্য-প্রমাণ ও গণমাধ্যমের আর্কাইভ বিশ্লেষণ শেষে এটি শতভাগ স্পষ্ট যে, আলোচিত ভিডিওটি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা নয় এবং এর সঙ্গে বিএনপির কোনো নেতার সম্পর্কও নেই। মূলত, ২০১৬ সালের একজন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার বক্তব্যকে প্রসঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক উদ্দেশে বর্তমান সময়ের ঘটনা এবং বিএনপি নেতার বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত এই দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।









