ভারতে বাংলাদেশি রোগীকে মারধর দাবির ভিডিওটি অন্য ঘটনার

ছবি: আগামীর সময়
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে দাবি করা হচ্ছে—বাংলাদেশি পরিচয়ের কারণে ভারতে এক রোগীকে বেদম মারধর করছেন এক চিকিৎসক। ফেসবুকের একাধিক পেজ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি শেয়ার করা হয়েছে। ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলোর কমেন্ট বক্স পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নেটিজেনদের বড় একটি অংশ তথ্য যাচাই ছাড়াই দাবিটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করছেন।
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রচারিত দাবিটি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। ভিডিওতে প্রদর্শিত ঘটনাটির সাথে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের সম্পর্ক নেই। প্রকৃতপক্ষে, ২০২৩ সালে ভারতের মধ্যপ্রদেশে এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার তথ্য গোপন করার জেরে এক স্থানীয় রোগীকে চিকিৎসকের চড় মারার পুরোনো দৃশ্যকে সাম্প্রতিক ঘটনার দাবিতে অপপ্রচার করা হচ্ছে।
ভাইরাল ভিডিওর আসল উৎস ও মধ্যপ্রদেশের ঘটনা
ভাইরাল ভিডিওটির সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধানে নামলে ভারতীয় গণমাধ্যম ‘LatestLY’-তে ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত খবরের ছবির সাথে ভাইরাল ভিডিওটির দৃশ্যের শতভাগ মিল পাওয়া যায়।
উক্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঘটনাটি ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ইন্দোরের একটি সরকারি হাসপাতালের। সেখানে ৪৫ বছর বয়সী এক এইচআইভি আক্রান্ত রোগীকে মারধরের অভিযোগে এক জুনিয়র চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।
মূল ঘটনাটি ছিল—উজ্জয়িনীর একটি হাসপাতাল থেকে হাড় ভাঙার চিকিৎসার জন্য ওই রোগীকে ইন্দোরে রেফার করা হয়। কিন্তু চিকিৎসা শুরুর আগে রোগী বা তাঁর স্বজনরা চিকিৎসককে তাঁর এইচআইভি সংক্রমণের বিষয়টি জানাননি। পরবর্তীতে বিষয়টি জানতে পেরে উত্তেজিত হয়ে ওই চিকিৎসক স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা অবস্থায় রোগীকে চড় মারেন এবং গালিগালাজ করেন।
ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত চিকিৎসককে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করে এবং তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। অন্যদিকে রোগীর স্বজন অভিযোগ করেন, বাধা দিতে গেলে তাঁকেও মারধর করা হয় এবং পরে তারা মুখ্যমন্ত্রীর হেল্পলাইনে অভিযোগ জানান। ভারতীয় গণমাধ্যম ‘এনডিটিভি’, ‘দৈনিক ভাস্কর’ এবং ‘ইন্ডিয়া টুডে’-র তৎকালীন প্রতিবেদন থেকেও একই তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়। আক্রান্ত সেই রোগী ও তাঁর স্বজনরা ভারতেরই নাগরিক ছিলেন, কোনো বাংলাদেশি ছিলেন না।
সাম্প্রতিক সময়ে বেঙ্গালুরুর পৃথক ঘটনা
সম্প্রতি ভারতে কোনো বাংলাদেশির ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে কি না, তা অনুসন্ধানে চলতি বছরের ২৫ জুলাই প্রকাশিত ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের বেঙ্গালুরুর বেল্লান্দুর এলাকায় নাসরিনা বিলাল ও তাঁর স্বামী মোহাম্মদ বিলাল নামের এক বাংলাদেশি দম্পতিকে মারধরের অভিযোগে এক চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। ডক্টর নাগেন্দ্র নামের ওই চিকিৎসক তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে তাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন।
অভিযুক্ত চিকিৎসক দাবি করেন, এলাকায় অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সন্দেহের বশে তিনি জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। তবে বেঙ্গালুরু পুলিশ স্পষ্ট জানায়—কারো নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। পুলিশ আরও জানায়, ভুক্তভোগী দম্পতি বাংলাদেশের নাগরিক এবং ভারতে তাঁদের অবস্থানের বৈধতা যাচাই করা হচ্ছে। দেশীয় গণমাধ্যমেও এই সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয়।
সামগ্রিক তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে এটি নিশ্চিত যে, ‘বাংলাদেশি পরিচয়ের কারণে ভারতে চিকিৎসকের মারধর’ দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি পুরোপুরি ভিন্ন একটি ঘটনার। ২০২৩ সালে মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে এইচআইভি তথ্য গোপনের জেরে ভারতীয় এক রোগীকে চিকিৎসকের চড় মারার পুরোনো ও অপ্রাসঙ্গিক ভিডিও ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।







