গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামোর নামে ছড়াচ্ছে ভুয়া তালিকা

ছবি: আগামীর সময়
গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামো প্রকাশের দাবি করে গ্রেডভিত্তিক বেতনের একটি তালিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রচারিত ছবিতে গেজেট অনুযায়ী শ্রমিকদের নতুন বেতন নির্ধারণের তথ্য রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নতুন বেতন কাঠামোর তালিকাটি ভুয়া। প্রকৃতপক্ষে, গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হলেও এখনো বোর্ডের কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি।
কী ছবি ছড়াচ্ছে?
ফেসবুকের ‘The Statement’ নামের একটি পেজ থেকে আজ মঙ্গলবার ছবিটি পোস্ট করা হয়। পোস্টটির ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামোর তালিকা প্রকাশ। গেজেট অনুযায়ী গ্রেডভিত্তিক নতুন বেতনের হিসাব।’
ছবিতে দেখা যায়, গত ১ নভেম্বর মজুরি বোর্ড গঠনের পরপরই ‘গার্মেন্টস শ্রমিকদের গেজেট’ শিরোনামে নতুন বেতনের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নামও উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ছবিটি ১৯ বার শেয়ার করা হয়েছে এবং এতে ৫৬টি প্রতিক্রিয়া পড়েছে।
যাচাইয়ে যা মিলেছে
ছবিটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে এটিকে সত্য বলে মনে করলেও কেউ কেউ এর সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এমনকি ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলেও মন্তব্য করেছেন কয়েকজন।
এচাড়াও ছবি থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে এআই শনাক্তকরণ টুলসে যাচাই করা হলে নিশ্চিত করেছে যে এটি এআই দিয়ে তৈরি।
অনুসন্ধানে প্রথম আলোর গত ১ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে সরকার রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এই বোর্ড আলোচনা করে একটি খসড়া মজুরি কাঠামো শ্রম মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। পরে মন্ত্রণালয় তা চূড়ান্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করলে সেই অনুযায়ী বাড়তি মজুরি পাবেন পোশাকশ্রমিকেরা।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে কত দিনের মধ্যে মজুরি নিয়ে আলোচনা শেষ করতে হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। তবে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী, কোনো শিল্প খাতের মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য সরকার থেকে নির্দেশ পাওয়ার পর ছয় মাসের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামোর সুপারিশ করার বিধান রয়েছে। তবে বোর্ডের অনুরোধে এ সময় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার মজুরি বোর্ড গঠনের পর বোর্ডের চেয়ারম্যান সভা আহ্বান করেন। ওই সভায় শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে মজুরি প্রস্তাব জমা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। প্রস্তাব জমা পড়ার পর বোর্ডের সদস্যরা তা নিয়ে আলোচনা করেন। প্রয়োজনে এক বা একাধিক শিল্পাঞ্চল পরিদর্শনও করেন তাঁরা। আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যের ভিত্তিতে নতুন মজুরি কাঠামোর খসড়া তৈরি করা হয়। এরপর ওই খসড়ার ওপর আপত্তি বা সুপারিশ নেওয়া হয়। সবশেষে চূড়ান্ত খসড়া শ্রম মন্ত্রণালয়ে পাঠায় নিম্নতম মজুরি বোর্ড।
এদিকে, এ বিষয়ে বিভিন্ন কী-ওয়ার্ড ব্যবহার করে অনুসন্ধান করেও গণমাধ্যমে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামোর তালিকা প্রকাশের কোনো সংবাদ বা তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেজেও এ-সংক্রান্ত কোনো পোস্ট পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তালিকাটি ভুয়া। এ বিষয়ে এখনো কোনো সভাও অনুষ্ঠিত হয়নি।
এদিকে, সদ্য গঠিত মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের স্থায়ী সদস্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুবও আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, তালিকাটি ভুয়া। তিনি বলেন, গত ১ নভেম্বর মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তালিকাটিও একই দিন প্রকাশের দাবি করা হচ্ছে। মজুরি বোর্ড থেকে এখনো কোনো সভা আহ্বান করা হয়নি। তাহলে সভা ছাড়াই কীভাবে নতুন বেতন কাঠামোর তালিকা প্রকাশ করা হয়?
তিনি আরও বলেন, প্রথমে মজুরি বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হতে হবে। এরপর আলোচনা ও সুপারিশের ভিত্তিতে প্রাথমিক বা খসড়া প্রস্তাব তৈরি হবে। এসব প্রক্রিয়া শেষে তালিকা প্রকাশের বিষয়টি আসে। মালিকপক্ষ আলোচনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। সভায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হলে আলোচনা সাপেক্ষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অতএব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামোর তালিকা প্রকাশের যে দাবি করা হয়েছে, তা সঠিক নয়।





