জুয়েলারি ব্যবসায়ীর নিখোঁজ ঘটনাকে ‘ সাম্প্রদায়িক নির্যাতন’ বলে প্রচার

ছবি: আগামীর সময়
সম্প্রতি একটি পরিবারের ছবি সম্বলিত ফটোকার্ড ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিভ্রান্তিকর দাবি প্রচার করা হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে, ‘বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত ও লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতার অংশ হিসেবে চাঁদপুর থেকে আরও একটি হিন্দু পরিবার নিখোঁজ হয়েছে’। কোনো প্রকার প্রমাণ ছাড়াই পোস্টে আরও দাবি করা হয়, এটি নাকি মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত হিন্দুদের লক্ষ্য করে চালিত ‘নৃশংস নির্যাতনের ছাপে কম পরিসরের কিন্তু বড় প্রভাবের হত্যাকাণ্ড’।
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রচারিত দাবিটি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও স্থানীয় পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিবারটির নিখোঁজ হওয়ার সাথে কোনো ধরনের ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সম্পৃক্ততা নেই। মূলত আর্থিক বিরোধ এবং সম্ভাব্য ঋণ পরিশোধ থেকে বাঁচার চেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত।
কী দাবি করা হচ্ছে?
গত ২৬ আগস্ট বেশ কয়েকটি এক্স অ্যাকাউন্টে ফটোকার্ডটি আপলোড করা হয়। ফটোকার্ডটিতে চার সদস্যের একটি পরিবারকে দুর্গা পূজামণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে দেখা যাচ্ছে।
সামাজিক মাধ্যম এক্স-এর ‘@salah_shoai’ নামক একটি অ্যাকাউন্ট থেকে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটি ১ হাজারের বেশি বার শেয়ার হয় এবং এতে প্রায় ২ হাজার প্রতিক্রিয়া পড়ে। পরবর্তীতে আরও কিছু পেজ ও আইডি থেকেও একই বার্তা ছড়িয়ে পড়ে।
ফটোকার্ডের ক্যাপশনে লেখা হয়— ‘বাংলাদেশে আরও একটি হিন্দু পরিবার নিখোঁজ হয়েছে। তারা মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত হিন্দুদের লক্ষ্য বানিয়ে আক্রমণ চালাচ্ছে। এটি নৃশংস নির্যাতনের ছাপযুক্ত কম পরিসরের কিন্তু বড় প্রভাবের হত্যাকাণ্ড। বাংলাদেশ বিষয়ে নিজেদের নীতিতে নরেন্দ্র মোদী ও ড. এস জয়শঙ্কর পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। ইউনূস এ নিয়ে কিছু পরোয়া করেননি, তারেক রহমানও করেননি। চিম্ময় প্রভু এখনও কারাগারে আছেন, যিনি ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে উঁচু মন্দির নির্মাণ করেছিলেন তিনিও কারাবন্দী। তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার বদলে, দিল্লি ঢাকাকে চরম অর্থনৈতিক সংকট সামলে উঠতে সাহায্য করছে। এমনকি এই মুহূর্তেও অনেক সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নিশ্চিত থাকুন, এই সংকট কেটে গেলে তারা আরও দ্বিগুণ শক্তিতে ভারতকে লাথি মারবে।’
আসল ঘটনা কী?
ফটোকার্ডটির সত্যতা যাচাইয়ে প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন এবং আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি চাঁদপুর শহরের অখণ্ড মার্কেটের 'এসকে শিল্পালয়' নামক একটি জুয়েলারি ও বন্ধকী স্বর্ণের দোকানের মালিক পিন্টু দাসকে কেন্দ্র করে। ২০২৬ সালের ২০ আগস্ট পিন্টু দাস, তাঁর স্ত্রী রিমি দাস এবং দুই ছেলে প্রিয়ম ও রূপমকে নিয়ে শহরের ভাড়া বাসা থেকে নিখোঁজ হন।
স্থানীয় পুলিশের তদন্ত এবং সংবাদের প্রতিবেদনে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, পরিবারটির নিখোঁজ হওয়ার পেছনে রয়েছে বিশাল অংকের আর্থিক বিরোধ। গচ্ছিত ও বন্ধক রাখা স্বর্ণালঙ্কার ফেরত পেতে এসে পিন্টু দাসের দোকান ও বাসা তালাবদ্ধ পেয়ে রাসেল খান, জাহিদুল ইসলাম এবং শুভঙ্কর মজুমদার সহ একাধিক গ্রাহক চাঁদপুর সদর মডেল থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন। এমনকি স্থানীয় বাসিন্দা উপমা দে সহ নিকটাত্মীয়রা নিশ্চিত করেছেন যে, পিন্টু দাস স্থানীয় গ্রাহক এবং একাধিক ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থার (এনজিও) নিকট দেনাগ্রস্ত ছিলেন।
চাঁদপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফয়েজ আহমেদ এবং উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফেরদৌস জানিয়েছেন, পাওনাদারদের এড়াতে পরিবারটি আত্মগোপনে গেছে কি না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা তদন্ত করে দেখছে। পরিবারটির আত্মীয়স্বজনদের পক্ষ থেকে অপহরণ, কোনো অপরাধমূলক চক্রান্ত বা সাম্প্রদায়িক টার্গেটের অভিযোগ তুলে কোনো মামলা বা অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।
অতএব, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত দাবিটি বিভ্রান্তিকর। পোস্টে উল্লেখিত "হত্যাকাণ্ড" এবং "নৃশংস নির্যাতন"-এর দাবিগুলোর কোনো প্রমাণ নেই; এখন পর্যন্ত কোনো লাশও উদ্ধার হয়নি এবং কোনো সহিংসতার আলামত মেলেনি।









