তামিল সিনেমার ‘মা’ সেন্টিমেন্টের ময়নাতদন্ত

তামিল সিনেমা মানেই টানটান উত্তেজনা, অ্যাকশন আর তার সাথে উপরি পাওনা হিসেবে থাকে ‘আম্মা সেন্টিমেন্ট’। কিন্তু খেয়াল করে দেখেছেন কি, দক্ষিণী এই সিনেমায় মা মানেই যেন ত্যাগের এক জীবন্ত মূর্তি? কেন প্রতিটি সিনেমাতেই মা-কে শেষমেশ ‘শহীদ’ হতে হয়? সম্প্রতি ওটিটিতে মুক্তি পাওয়া তামান্নার ‘আরানমানাই ৪’ থেকে শুরু করে পুরনো দিনের ‘পরাশক্তি’ সবখানেই গল্পটা প্রায় একই রকম।
তামিল সিনেমার এই চিরচেনা ছক নিয়েই আজকের বিশেষ বিশ্লেষণ।
সবশেষ মুক্তি পাওয়া ‘আরানমানাই ৪’ সিনেমায় তামান্নাকে দেখা যায় এক রাজকীয় মায়ের চরিত্রে। সন্তানদের খাওয়ানো, গোসল করানো আর আদর করার সব দৃশ্যই যেন একদম নিখুঁত। কিন্তু গল্পের শেষে দেখা গেল, স্বামীর শরীরে ভূত ঢুকলে সন্তানদের বাঁচাতে তামান্না হাসিমুখে নিজের জীবন দিয়ে দিলেন। ব্যস, তিনি হয়ে গেলেন ‘শহীদ’। অথচ তার স্বামী দিব্যি মাটির নিচে শান্তিতে ঘুমানোর সুযোগ পেলেন। প্রশ্ন হলো, তামিল সিনেমায় মা-দের কেন সবসময় এভাবে ‘অন কিউ’ অর্থাৎ ডাক দিলেই কোরবানি দিতে হয়?
আমাদের ছোটবেলা থেকে দেখা প্রিয় সব ‘মা’ চরিত্রগুলোর কথা ভাবুন। সারন্যা পোনভান্নান যখন পর্দায় আসেন, আমরা জানি তিনি ছেলেদের নিয়ে সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা করবেন আর হাসাহাসি করবেন। আবার রাধিকা শরৎকুমার বা নাদিয়ার মতো কড়া ধাতের মায়েরা যখন আসেন, তারাও কিন্তু ত্যাগের বাইরে নন। ‘ভেলাইয়িল্লা পাত্তাধারি’ সিনেমায় সারন্যা ছিলেন হার্টের রোগী। তার মৃত্যুতে ছেলে ধানুশ যতটা না কেঁদেছে, তার চেয়ে বেশি কাজে লেগেছে মায়ের অঙ্গ প্রতিস্থাপন। মায়ের মৃত্যুর ফলেই ছেলে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়। অর্থাৎ, ছেলের ক্যারিয়ার গড়তে মায়ের মরাই যেন নিয়তি।
সিনিয়র সাংবাদিক কবিতা মুরলীধরনের মতে, এই ‘মম গিল্ট’ বা মায়েদের মনে অপরাধবোধ ঢুকিয়ে দেওয়ার খেলাটা শুরু হয়েছে সেই ৫০ এর দশকে। ১৯৫২ সালের ‘পরাশক্তি’ সিনেমার সেই বিখ্যাত সংলাপ ‘একজন বিধবার ইডলি দোকান দেওয়া ছাড়া আর কী-ই বা করার আছে?’ সিনেমাগুলোতে দেখা যায়, মায়েরা দারিদ্র্যের কারণে আত্মহত্যা করতে গেলে তাদের কাঠগড়ায় দাড় করানো হয়। আবার সুপারস্টারদের সিনেমায় দেখা যায়, বিয়ের আগে নায়িকার এক পোশাক, আর বিয়ের পর মা হওয়ার সাথে সাথেই পোশাক বদলে যায়। যেন মা মানেই তাকে ত্যাগের প্রতিচ্ছবি হতে হবে। এমনকি ‘মান্নান’ সিনেমায় বিজয়াশান্তির মতো বড় বিজনেস ওম্যানকেও শেষে রান্নাঘরে পাঠিয়ে তবেই সফল নারীর তকমা দেওয়া হয়েছে।
সুপারস্টার বিজয় যখন ‘বারিসু’ সিনেমায় তার মাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘মা, তুমি নিজের পছন্দের খাবার কেন খেতে পারো না?’ তখন মনে হয় পরিবর্তন আসছে। কিন্তু হালিথা শামীমের মতো পরিচালকরা বলছেন, এই এক-আধাটা সংলাপ আসলে লোক দেখানো। অধিকাংশ সময় মা চরিত্রগুলো হয় নায়কের ‘কুল মম’ নয়তো নায়িকার ‘বোকা মা’। তামিল সিনেমায় নায়িকার মা-কে তো আরও বেশি বুদ্ধিহীন দেখানো হয়, কারণ সেখানে বাবা থাকেন কড়া মেজাজি। হালিথা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরাও সিনেমা দেখে দেখে বড় হয়েছি যেখানে মা মানেই হলো একটা সিলমোহর দেওয়া পরিচয়, যার নিজস্ব কোনো ইচ্ছা থাকতে নেই।’
তামিল সিনেমার এক অদ্ভুত নিয়ম হলো অনুপস্থিত বাবা। বাবা যদি সন্তানদের ফেলে রেখে বাইরে গিয়ে মদ খায় বা আড্ডা দেয়, সমাজ তাকে খুব একটা গালি দেয় না। কিন্তু মণি রত্নমের ‘থালাপাথি’ সিনেমায় মা যদি তার সন্তানকে পরিস্থিতির চাপে ফেলে চলে যায়, সেই মায়ের আর ক্ষমা নেই। সূর্য (রজনীকান্ত) সারাজীবন সেই ত্যাগের জ্বালায় ভোগে। কবিতা মুরলীধরণ প্রশ্ন তুলেছেন, আমরা যখন একজন ‘অকেজো বাবা’কে মেনে নিতে পারি, তখন একজন ‘অপূর্ণ মা’কে কেন মেনে নিতে পারি না?
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী লক্ষ্মী প্রিয়া চন্দ্রমৌলি বলছেন এক ধ্রুব সত্য ‘সমাজে বাবা যা-ই করুক আমরা বলি ‘বাবা তো এমনই হয়’, কিন্তু মা একটু এদিক-ওদিক হলেই তাকে ‘খারাপ মা’ বানিয়ে দেওয়া হয়।’ তামিল সিনেমায় মা কে সবসময় দেবীর আসনে বা পেডেস্টালের ওপর বসিয়ে রাখা হয়। এর কারণ হলো মা কে সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে দেখার ভয়। চলচ্চিত্র নির্মাতা ব্রহ্মা জানান, সিনেমার চিত্রনাট্যে ইমোশন ঢোকাতে মা হলো সবচেয়ে নিরাপদ বাজি। যেন ঘরের দেয়াল সাজাতে ল্যাম্পশেড কিনতে গেলে মানুষ যেমন সবচেয়ে সাধারণটা কেনে, তেমনি দর্শককে কাঁদাতে মায়েরা হলেন সবচেয়ে সহজ মাধ্যম।
সবশেষে একটি বড় প্রশ্ন তুলেছেন হালিথা, পর্দার মায়েদের কেন ডিপ্রেশন বা মেনোপজের মতো বাস্তব সমস্যা নিয়ে কথা বলতে দেখা যায় না? বাণিজ্যিক সিনেমায় মা মানেই হাসিমুখে সব সহ্য করা এক জননী। হালিথা বলছেন, ‘যদি কোনো সুপারহিট সিনেমায় নায়ক তার মাকে মেনোপজ বা মেজাজ পরিবর্তনের কারণ নিয়ে দু-একটা সহানুভূতিশীল কথা বলত, তবে সমাজের চিত্রটা বদলে যেতে পারত।’
সত্যিই তো, পর্দার মায়েদের তো এমন একজন ছেলেই প্রাপ্য যে তাকে কেবল ‘ত্যাগের প্রতিমূর্তি’ না ভেবে একজন সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে সম্মান করবে।
তামিল সিনেমার এই ‘মা সেন্টিমেন্ট’ কি কেবলই ব্যবসার হাতিয়ার, নাকি আমাদের সমাজের গভীর সঙ্কীর্ণতার প্রতিফলন? সময় এসেছে পর্দায় মায়েদের কেবল শহীদ হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে দেখার।

