উত্তম কুমারকে কেন সিনেমায় নিতেন না সত্যজিৎ রায়?

উত্তম কুমার ও সত্যজিৎ রায়। ছবি: সংগৃহীত
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র সত্যজিৎ রায় ও মহানায়ক উত্তম কুমার। সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় উত্তম কুমার ‘নায়ক’ ও ‘চিড়িয়াখানা’—এই দুটি কালজয়ী চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, প্রথম সারির এই অভিনেতা ও পরিচালকের জুটি কেন মাত্র দুটি সিনেমাতেই সীমাবদ্ধ থাকল? কেন সত্যজিৎ রায় পরবর্তীতে উত্তম কুমারকে নিয়ে আর কাজ করতে চাননি?
সত্যজিতের পরিচালনায় মাত্র দু’টি সিনেমাতে অভিনয় করাটা মহানায়ক উত্তম কুমারের পক্ষে মেনে নেওয়া কিছুটা কঠিনই ছিল। সিনেমা জগতের শীর্ষ স্থানটি নিজের দখলে থাকা সত্ত্বেও, বিশ্ববরেণ্য এই পরিচালকের সৃষ্টিতে তার উপস্থিতি কেন এত সীমিত—তা নিয়ে মনের গহীনে এক অনুচ্চারিত অভিমান জমছিল তার।
‘নায়ক’ আর ‘চিড়িয়াখানা’ ছবির পর সত্য়জিৎ আর কোনও সিনেমাতেই উত্তম কুমারকে বেছে নেননি। তখন সত্যজিতের প্রায় ছবিতেই সুযোগ পাচ্ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। অবশেষে কোনো আড়াল বা দ্বিধা না রেখেই একদিন সত্যজিৎ রায়ের মুখোমুখি হয়ে নিজের সেই অভিমানের কথা সোজা জানিয়ে দিয়েছিলেন উত্তম কুমার। কিন্তু তার উত্তরে সত্যজিৎ যেটা বলেছিলেন তা হতবাক করেছিল মহানায়ককে।
ঘটনাটা ১৯৭৮ সালের। তখন স্টুডিওপাড়ায় বারবার লোডশেডিং হচ্ছিল। এই ঝামেলার একটা ব্যাবস্থা করতেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্যে উত্তম কুমারকে সাথে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন সত্যজিৎ রায়। পথেই আচমকা এক সোজা প্রশ্ন ছুঁড়ে বসলেন উত্তম— ‘আচ্ছা মানিকদা, আপনি যে আমাকে আর নতুন কোনো সিনেমায় নিচ্ছেন না, কারণটা কী বলুন তো?’
উত্তমের মুখে হঠাৎ এমন প্রশ্ন শুনে সত্যজিৎ রায় তো প্রথমে কিছুটা থমকে গেলেন। এরপর একটু চিন্তা করে বললেন, ‘দেখো উত্তম, তোমার বয়সটা এখন এমন হয়েছে, যে তুমি না বুড়ো, না যুবক। আরেকটু বুড়ো হও তুমি, তারপর না হয় তোমাকে নিয়ে আবার নতুন করে ভাবা যাবে।’
সত্যজিতের মুখে এমন কথা শুনে থামার পাত্র ছিলেন না উত্তম কুমারও। চটজলদি রসিকতা মেশানো গাম্ভীর্যে জবাবে বললেন, ‘থাক মানিকদা, বৃদ্ধ বয়সের চরিত্রে আর অভিনয় করতে হবে না। ওসব বরং সৌমিত্রই করুক!’
আসলে উত্তম কুমার ছিলেন এক বিশাল বাণিজ্যিক তারকা ও রোমান্টিক ম্যাটিনি আইডল। সত্যজিতের বাস্তবমুখী ও সাধারণ চরিত্রগুলোতে তার এই অতি-পরিচিত স্টারডম মেলাতে সমস্যা হতো; দর্শক হয়তো তাকে সাধারণ কোনো রূপে সহজে মেনে নিতে পারত না।
আবার, সত্যজিতের সিনেমার বুদ্ধিবৃত্তিক আবহ ও মধ্যবিত্ত চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্ব ফুটিয়ে তুলতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন প্রথম পছন্দ। সত্যজিতের নির্মিত ধারার সঙ্গে সৌমিত্রের অভিনয়শৈলী সবচেয়ে নিখুঁতভাবে মিলে যেত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সত্যজিতের বেশির ভাগ চলচ্চিত্রে সৌমিত্রকে দেখা গেছে।
সত্যজিতের সঙ্গে এই কথোপকথনের ঠিক দুই বছর পরেই মারা যান উত্তম কুমার। অনেকেই মনে করেন, মহানায়ক যেন আগেভাগেই টের পেয়েছিলেন তার মৃত্যুর পরোয়ানা! আর সে কারণেই হয়তো সত্যজিৎকে বলা সেই কথার মতোই—বাস্তবেও তাকে আর বুড়ো বয়সের কোনো চরিত্রে অভিনয় করতে হয়নি।








