৮১-তে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়: কবিতার কণ্ঠে, অভিনয়ের আলোয়

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় । ছবি: ফেসবুক
বাংলা ভাষায় কিছু কণ্ঠ আছে, যেগুলো শোনা মানেই শব্দের ভেতরে আবিষ্কার করা আরেকটি পৃথিবী। জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠ তেমনই। তার উচ্চারণে কবিতা শুধু আবৃত্তি হয়ে ওঠে না, হয়ে ওঠে দৃশ্য, অনুভূতি, প্রতিবাদ, প্রেম আর মানুষের অন্তর্জগতের ভাষা। আজ (২৮ জুলাই) ৮১ বছরে পা রাখলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত আবৃত্তিকার, অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে আবৃত্তি, নাটক, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলা ভাষার এক অনন্য দূত। বয়সের ক্যালেন্ডার তাকে ৮১-তে পৌঁছে দিলেও তার কণ্ঠের দীপ্তি কিংবা শিল্পবোধে খুব একটা পড়েনি বয়সের ছাপ।
জন্মদিন নিয়ে তার অনুভূতি জানতে চাইলে আগামীর সময়কে হেসে বললেন, ‘জন্মের ওপর তো আমার কোনো হাত নেই। এটি আমার বাবা-মায়ের সিদ্ধান্ত। তাই জন্মদিন নিয়ে আমার নিজস্ব কোনো অনুভূতি নেই।’
এই সহজ অথচ দার্শনিক উত্তর যেন তার দীর্ঘ জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। প্রচারের আলো থেকে বরাবরই দূরে থেকেছেন, কাজকেই দেখেছেন বড় করে।
জন্মদিন কেমন কাটবে? উত্তরে বললেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে বাসাতেই বন্ধু, অনুজ আর শুভানুধ্যায়ীরা আসে। আড্ডা হয়, খাওয়া-দাওয়া হয়। এই আনন্দ নিয়েই তো বেঁচে থাকা।’
৮১ বছর বয়সেও কাজের প্রতি তার আগ্রহ অটুট। বর্তমান ব্যস্ততা নিয়ে এই গুণীজন বলেন, ‘পুরোদস্তুর লেখালেখি করছি। এটা নিয়েই দিব্যি সময় কেটে যাচ্ছে।’
নতুন অভিনয়ের বিষয়ে আগামীর সময়কে জানালেন, ঢাকার বাইরে যেতে হবে বলে দুটি-তিনটি নাটকের কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। আর একটি সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন শুধু চিত্রনাটক পছন্দ হয়নি বলে।
এই উত্তরই বলে দেয়, জনপ্রিয়তার চেয়ে শিল্পের মানকেই এখনও বেশি গুরুত্ব দেন তিনি।
যেখানে কবিতাই হয়ে উঠেছিল পরিচয়
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের সাংস্কৃতিক যাত্রা শুরু ছাত্রজীবনে। ১৯৬৯ সালে ভ্লাদিমির লেনিনের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে কলকাতার রঞ্জি ইনডোর স্টেডিয়ামে কিংবদন্তি আবৃত্তিকার কাজী সব্যসাচীর সঙ্গে যৌথ ও একক আবৃত্তি করে তিনি প্রথম বড় পরিসরে আলোচনায় আসেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
বাংলাদেশে আবৃত্তিকে শুধু মঞ্চনির্ভর শিল্প নয়, একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, নির্মলেন্দু গুণ, শামসুর রাহমান কিংবা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা নতুন আবেগে ধরা দিয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে। ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্কটল্যান্ড, কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একক আবৃত্তির আসরে বাংলা কবিতাকে পৌঁছে দিয়েছেন প্রবাসী বাঙালিদের হৃদয়ে।
অভিনয়ের পর্দায়ও সমান উজ্জ্বল
শুধু আবৃত্তি নয়, চলচ্চিত্রেও জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় রেখে গেছেন স্বতন্ত্র স্বাক্ষর। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘আদম সুরত’, ‘নদীর নাম মধুমতী’, ‘কিত্তনখোলা’, ‘মাটির ময়না’, ‘আধিয়ার’, ‘অন্তর্যাত্রা’, ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ ও ‘মেঘমল্লার’। বিশেষ করে তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রে তার অভিনয় স্থায়ী ছাপ ফেলেছে দর্শকের মনে। সংলাপের চেয়ে দৃষ্টির ভাষা, অঙ্গভঙ্গির সংযম আর চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা তাকে আলাদা করেছে সমসাময়িক অনেক অভিনেতার কাছ থেকে।
ঐতিহ্যের ভেতরেই বেড়ে ওঠা
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুরে জন্ম নেওয়া জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় এমন এক পরিবারে বড় হয়েছেন, যেখানে শিল্প ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তার বাবা কালীকানন্দ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন দক্ষ আবৃত্তিকার। পরিবারের ছিল নিজস্ব নাট্যদল। যাত্রা ও নাটকের মহড়ার মধ্যেই কেটেছে তার শৈশব। খুব ছোটবেলায় একটি পালাগানে বিবেকের সহচর বালকের চরিত্রে প্রথম মঞ্চে ওঠেন তিনি। এরপর গান, তবলা, আবৃত্তি ও অভিনয়, সবই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে তার জীবনের অংশ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্পন্ন করেন ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক। ছাত্রজীবনে যুক্ত ছিলেন বামপন্থী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গেও।
সম্মাননার চেয়েও বড় উত্তরাধিকার
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি পেয়েছেন একুশে পদক, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটকে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার স্বীকৃতি, গোলাম মোস্তফা স্মৃতি পুরস্কার, নরেন বিশ্বাস পদক, শিল্পকলা পদকসহ অসংখ্য সম্মাননা। তবে তার সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত কোনো পদক নয়। তার কণ্ঠ শুনে অসংখ্য তরুণ আবৃত্তি শিখেছে। তার অভিনয় দেখে নতুন প্রজন্ম সংযমী অভিনয়ের ভাষা চিনেছে। বাংলা ভাষার সৌন্দর্য, উচ্চারণের শুদ্ধতা আর কবিতার গভীরতাকে তিনি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন শিল্পের সর্বোচ্চ মর্যাদায়।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় শুধু একজন শিল্পীর নাম নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। সময়ের প্রবাহে অনেক কণ্ঠ হারিয়ে যায়, অনেক মুখ মুছে যায়। কিন্তু কিছু কণ্ঠ ইতিহাস হয়ে থাকে। ৮১ বছরেও জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে যখন কবিতা উচ্চারিত হয়, তখন মনে হয় বাংলা ভাষা যেন নিজেই নিজের জন্মদিন উদযাপন করছে।






