আধোআলো ছায়াতে কিছু ভালোবাসাতে

ছবি-জেমিনি
দিদির বড্ড কোলঘেঁষা ছোট্ট বোনটি। মাত্র চার বছরের ব্যবধান হলেও দিদি যেন মায়েরই আরেক রূপ। এতটাই কোলেকাঁখে করে ন্যাওটা বোনটি থাকত যে দিদি ইশকুলে যাওয়ার সময় বোনও থাকত তার পাশে। একদিন ইশকুলের দিদিমণি বললেন, এসব তো চলবে না। এক খরচে ইশকুল দুজনকে পড়াতে পারবে না। বড় বোন ক্ষেপে গিয়ে সেই যে ইশকুল ছাড়লেন, আর কক্ষনো ওমুখো হননি। যথারীতি ছোটোবোনের বেলাতেও মা সরস্বতীর বিদ্যাকৃপা বেশিদূর আগুয়ান হয়নি।
তা, পড়ার ইশকুলের আর কী দরকার,আসল ইশকুল তো গানের। বাবা যেমন গানের মানুষ, তেমনিই ভাইবোনেরা সব্বাইই। সাথে নাটকেরও। বাবা তো একাধারে মঞ্চাভিনেতা, নাট্যসঙ্গীতজ্ঞ, শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী। কিন্তু, খুব বেশি আর্থিকভাবে সফল তিনি হতে পারেননি। অকালেই প্রয়াত হন তিনি পাঁচটি সন্তান ও বিধবা দ্বিতীয় স্ত্রীকে রেখে, মাত্র ৪১ বছর বয়েসে।
সংসারের হাল ধরেন বড় বোন। ১৩ বছর বয়েসেই গান শুরু করেন মারাঠি চলচ্চিত্রাঙ্গনে। ছোটোবোনটিও ১০ বছর বয়েসে গান শুরু করলেন সিনেমাজগতে, সেও মারাঠি গান দিয়ে। এরপর দুজনেই এলেন গানের ডালি নিয়ে তখনকার বোম্বে ফিল্মলাইনে। কিন্তু বড় বোনের দাপট ও প্রভাব এতটাই বেশি ছিল যে ছোটো কোনঠাসা অনুভব করলেন। একটা সময় এমনও গেছে যে দুবোনের বাড়িতে একজন গৃহকর্মী ছিলেন যাঁর মূল কাজ ছিল বড়জনের কোন কোন দুর্ধর্ষ গান রেকর্ড হল তার খবর ছোটোজনের কাছে এনে হাজির করা।
এই করে করে সুরকারদের মধ্যেও সেই বিভাজন ছড়িয়ে পড়ে কিছুটা। একজন সুরকার, ও পি নায়ার, বলেছিলেন, ওকে আমার রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছিল এটা বোঝাতে যে তোমার গলাও মন্দ নয়। তোমারও প্রতিভা আছে। ছোটো হলেও তিনি এটা দিব্যি বুঝেছিলেন যে তাঁকে আলাদা হতেই হবে। তাই প্রাণপণ চেষ্টা করে নিজের গলার আর গায়কীর পরিবর্তন ঘটালেন যেন তাঁকে কেউ দিদির ছোটোবোন নয়, তাঁর নিজের নামেই চেনে।
একটা সময় বড়বোনের সাথে একজন সুখ্যাত গায়কের সাথে বিবাদের সুবাদে কিছু সুরকারের তালিকা থেকে বাদ পড়েন তিনি। এতে কপাল খুলে যায় ছোটোজনের। তাঁকেই নেওয়া হয় অনেক চলচ্চিত্রের গানের জন্যে। সমস্যা হলো, তাঁর তাল- ও বাদ্যপ্রধান গান জনপ্রিয় হওয়ায় তিনি ওরকমই গানের জন্যেই প্রযোজক ও সুরকারদের প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠেন। ডিস্কো, পপ, ক্যাবারে, নেশাতুর, সাইকাডেলিক, ইঙ্গিতপূর্ণ গানের তিনিই হয়ে ওঠেন মধ্যমণি।
ওটা একেবারেই সত্যি নয়। দুজন বেণীকরা গায়িকা দেখানো, কয়েকটা ঘটনা নেওয়া আর সেটা টেনেবাড়িয়ে তিন ঘণ্টার করাটা সময়ের যে কী একটা অপচয়
কিন্তু, প্রতিভা কি আর আবেদনময়তার খোলসে আটকে রাখা যায়? গজল ও ঠুমরির পথ ধরে তিনি জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। এবং, সেই সাথে অমরতারও। সরস্বতী এখানে তাঁর আশীর্বাদ উজাড় করে দিয়েছিলেন বৈকি।
তবে সুরকারের সাথে বাঁধা তাঁর সবসেরা জোট পৌঁছেছিল বৈবাহিকতার তুঙ্গে। রাহুল দেববর্মণকে বিয়ে করেন তাঁরচে ছবছরের বড় হয়েও। আমৃত্যু এই বাঁধন ছিন্ন হয় রাহুলের অকালপ্রয়াণে। কিছু অভিযোগও শোনা যায় পরে তাঁর শ্বাশুড়ি মীরা দেববর্মণের দেখভাল করা নিয়ে। এবং, রাহুলের পাওনাগণ্ডা আদায় নিয়ে। বেশ কিছু অভিযোগেরই তিনি জবাব দিয়েছেন গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। পুলকবাবু আত্মজীবনীতে লিখে গেছেন। বারান্তরে সেসব নিয়ে লেখার ইচ্ছে আছে।
রাহুলের সাথে তাঁর সম্পর্ক প্রভাব ফেলে তাঁর গায়নরীতিতেও। সত্তরের দশক থেকে তাঁর গানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে পাশ্চাত্য প্রভাব। রাহুলের গানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে প্রাচী ও প্রতীচী। পরীক্ষামূলক অর্কেস্ট্রেশন, লাতিনো-আফ্রো-ক্যারিবীয় বাদনরীতি ও সুর, জ্যাজ, রক, পপ সব ধারা থেকেই তিনি অক্লান্তভাবে ঋণ করে গেছেন দুহাতে, ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর অমর শিল্পে। তাই তাঁর সেই দ্বিতীয় স্ত্রীও, সেই প্রতিভাদীপ্ত শিল্পী, তাঁর গলার অনন্য সীমানা ও বৈচিত্র্যে যথাযোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন স্বামীরত্নটিকে। দুজনের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় আমরা হিন্দি ভাষায় তো বটেই, বাংলাতেও পেয়েছি অমর কিছু সুর ও গান।
দিদির সাথে তাঁর আপাতবিরোধ তীব্রতর হয় তাঁর প্রথম বিয়ের সময়, কারণ তিনি তখন মাত্র ষোড়শী আর প্রেমপাত্র ৩১-এর, তাও দিদির ব্যক্তিগত সহকারী। সেই বিয়ে বছর দশেক পরে ভেঙে যায়। তখন তিনি দুই সন্তানের মা, অন্তঃসত্ত্বা তিনি তৃতীয় সন্তান নিয়ে। এসে উঠেছেন বোনের কাছেই। রাহুলের সাথে তাঁর গাঁটছড়া এরও কুড়ি বছর পরে। কিন্তু, দিদির সাথে বাঁধন শক্ত থেকেই গেছে নানা ঘাতপ্রতিঘাতে। যদিচ, দিদি গান গাওয়ার সময় খাতা রাখতেন ডান হাতে আর তিনি বাঁয়ে যেন তিনি না-দেখেন দিদির চলন, তাও বোনের রক্ত কথা বলেছে বারংবার। দুজনের দ্বৈতসঙ্গীতও আছে একাধিক। দুজনের টানাপোড়েনের ছায়া নিয়ে চলচ্চিত্রও আছে, যদিও ছোটোবোন একদমই পছন্দ করেননি সেটা। বলেছিলেন, “ওটা একেবারেই সত্যি নয়। দুজন বেণীকরা গায়িকা দেখানো, কয়েকটা ঘটনা নেওয়া আর সেটা টেনেবাড়িয়ে তিন ঘণ্টার করাটা সময়ের যে কী একটা অপচয়।” খোদ পরিচালকই অবশ্য জানিয়েছেন, এটার পেছনে বিখ্যাত দুবোনের অতিসামান্য অনুপ্রেরণা থাকলেও আসলে গল্পটা আলাদাই।
বড়বোনের ছোটোজন না-হলে কি তিনি আরও বিখ্যাত হতে পারতেন, নাকি সেকারণেই তিনি খ্যাতিমান বেশি হলেন? এই তর্ক সম্ভবত চলমান থাকবেই। কিন্তু, দিদির স্নেহধন্য তিনি ছিলেন আমৃত্যু। একবার কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন, “লোকজন গালগপ্পো বানায় আর ঝামেলা বাধাতে ওস্তাদ তারা, কিন্তু জলের চেয়ে রক্ত ঘন। আমার মনে পড়ে, মাঝেমধ্যে গানের কোনো অনুষ্ঠানে গেলে ইন্ডাস্ট্রির লোকজন এসে আমায় অগ্রাহ্য করে শুধু দিদির সাথেই কথা বলত, যেন দিদির প্রতি তারা কতটা অনুগত সেটা দেখানো জরুরি। পরে, দিদি আর আমি এই নিয়ে দারুণ হাসাহাসি করতাম।”
দিদির মতোই তিনি অন্তত কুড়িটা ভারতীয় ভাষায় গেয়েছেন গান, হাঁকিয়ে নিয়েছেন গাদাগাদা পুরস্কার। দিদি যদি ত্রিশ হাজার গান গেয়েছেন, তিনি প্রায় বারো হাজার। দিদি তিনটি জাতীয় পুরস্কার পেলে তিনি কুক্ষিগত করেছেন অন্তত দুখানা। স্বদেশে পুজো পেয়ে দুজনে বিদেশেও সম্মান কুড়িয়ে নিয়েছেন। দিদি ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান লিজিয়ঁ দ্যো ন’হ্ পেলে তিনি মনোনয়ন পেয়েছেন অন্তত দুখানা গ্র্যামির, যার প্রথমটি ভারতীয় কোনো গায়কের বেলায় প্রথম। দিদি লন্ডনের সুপ্রসিদ্ধ রয়্যাল আলবার্ট হলে গান গাইছেন, আর তিনি সঙ্গত করছেন আন্তর্জাতিক তারকাদের সাথে, যার একটিতে মনোনয়ন দ্বিতীয় গ্র্যামির। এই পারিবারিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সিবলিং রাইভ্যালরির ইতিবাচকতার ক্লাসিক টেক্সটবুক উদাহরণ।
কেন যেন আমি দুজনের গলা আলাদা করতে পারিনে ভালোভাবে, বিশেষত পঞ্চাশ ষাটের, কিছুটা সত্তরের দশকের গানে। তবে, বয়েস বাড়লেও তাঁর গলা যে দিদির তুলনায় অনেক সতেজ ও সজীব ছিল, তা দৃঢ়নিশ্চয় করে বলতে পারি। দুজনেই গান গেয়ে গেছেন বয়েসবাড়ার পরেও। তবে, বড়দিদির চাইতে বৈচিত্র্য আর আধুনিকত্বে তিনি খানিকটা যে এগিয়ে ছিলেন, সেটার প্রমাণও বিদ্যমান।
গানের পাশাপাশি অসম্ভব ভালোবাসতেন রান্না। কড়াই গোশত আর বিরিয়ানির খ্যাতি ছড়িয়েছিল এতটাই যে অনেকেই আবদার করে তাঁর রান্না খেত, বিশেষত বলিউডে। তিনি নিজেই বলেছেন, গায়ক না-হলে রান্নাই করতেন, হতেন রাঁধুনি। শেষতক, নিজের নামে একাধিক রেস্তোরাঁ খুলেছেন, প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বাবুর্চিদের, এর শাখা ছড়িয়েছে দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে। তাঁর নামাঙ্কিত রেস্তোরাঁ এখনও খোলা আছে। আপনারা চাইলে এর রসাস্বাদন করতে পারেন। সেখানে খাদ্যাস্বাদন করতে করতে হয়তো তাঁর গান ভেসে আসবে আপনাদের কানে। রসনা ও শ্রবণেন্দ্রিয় দুইই পরিতৃপ্ত করতে পারেন একই সাথে।
শুধু, তাঁকে পাবেন না আর।
আমাদের সময়ের কোকিলকণ্ঠী গায়ক আশা ভোঁসলে আমাদের সবাইকে এই ক্লেদাক্ত পৃথিবীতে ছেড়ে ও এই দুনিয়া আরও অন্ধকার করে চলে গেছেন চিরতরে প্রিয়তম দিদি লতার কাছে। দুজনেই জীবনে জড়িয়ে ছিলেন একত্রে। মৃত্যুতেও তাঁদের মিল সাঙ্গ হয়নি। দুজনেই চলে গেছেন ৯২ বছর বয়েসে, দুজনেই যাত্রার দিন হিসেবে বেছে নিয়েছেন রোববার।
প্রিয়সাথী রাহুলের সাথে কি এবার তিনি নতুন সুরে আর প্রেমে মগ্ন থাকবেন অমরাবতীর নন্দনকাননে?
জানা নেই।
জানা আছে, আশা ছিল, ভালোবাসা ছিল, আজ আশা নেই, অনেক কিছুই আর নেই...

